বৃহস্পতিবার, জুন ২০

‘হাড়ে হাড়ে’ চিনে নিন নিজেকে

ঘরে ঘরে আজকাল পায়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, হাঁটু ব্যথা। ‘ব্যথার পূজা’ সমাপন হল কতটা, তা জানার আগেই পুজো করতে বসে শরীরের ব্যথা জানান দেয়, সে আছে। তাই হাড়ের ব্যথার কারণ ও উপশম খুঁজতে দ্য ওয়াল পৌঁছে গিয়েছিল বিশিষ্ট অর্থোপেডিক চিকিৎসক  ডঃ সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। কী বললেন ডাক্তারবাবু ?

দ্য ওয়াল: হাড়ের সমস্যা কী কী হতে পারে?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: এক কথায় উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। তবে হাড়ের সমস্যাকে আমরা কয়েকটা ভাগে ভাগ করতে পারি।
আঘাতজনিত যেমন হাড়ভাঙা বা ফ্র্যাকচার, শারীরবৃত্তীয় (metobolics) যেমন রিকেট, অস্টিও ম্যালেসিয়া,
সংক্রমণজনিত অস্টিওমায়েলিটিস , নিওপ্লাস্টিক বা টিউমার জাতীয়। সমস্যা বুঝে চিকিৎসায় যেতে হবে।

দ্য ওয়াল: আর্থ্রাইটিস কী? কেন হয়? প্রতিরোধ করা যায় কি? হলে প্রতিকারের পথ কী?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: ল্যাটিন শব্দ Arthros এবং Itis মিলে আর্থ্রাইটিস তৈরী হয়েছে। অর্থস বা Arthros মানে হাড়ের joint আর আইটিস বা Itis মানে প্রদাহ বা inflammation। অর্থাৎ অস্থিসন্ধির প্রদাহকেই বলা হয় আর্থ্রাইটিস। এর অনেক কারণ হতে পারে। সংক্রমণজনিত (infective), ক্ষয়জনিত (degenerative) বা auto immune প্রভৃতি। কারণ অনুযায়ী আলাদা আলাদা প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা। সঠিক সময়ে সংক্রমণ ধরা পড়লে তাকে আয়ত্তে আনা সহজ। ক্ষয়জনিত সমস্যা মূলত হয় ওজন বেশি থাকলে। ওজন কমিয়ে লাইফস্টাইল ঠিক রাখলে দেহের ওজন কমে যাবে, দ্রুত সমস্যাও মিটবে। কিন্তু auto immune arthritis সারানো সম্ভব হয় না। তাই সেটা হলে চিন্তার বিষয়।

দ্য ওয়াল: রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিসটা কী?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়:  এটি একদম আলাদা একটি আর্থ্রাইটিস। উপসর্গও আলাদা। হাড়ের রোগ, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় গলা থেকে। ইনফেকশন বাড়তে থাকে। গলা ব্যথা, ঠান্ডা লাগা দিয়ে শুরু হয়। আস্তে আস্তে গাঁটে গাঁটে ব্যথা বাড়তে থাকে। জয়েন্টগুলো ফুলতে থাকে। সিজন চেঞ্জের সময়ে নিজের যত্ন বাড়িয়ে, রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিস থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।

দ্য ওয়াল: আজকাল প্রতি ৪ জনে ৩ জনেরই হাঁটুব্যথা হচ্ছে কেন? কী করে আটকাবেন একে?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়:  সেই অর্থে আজকাল এটা আটকানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে কষ্ট কম পেতে পারেন। আগে কাপড় কাচা বা বাসন মাজা, ঘর মোছা, পুজো করা, রান্না– এ সবই মাটিতে বসে করতেন বাড়ির মহিলারা। এগুলোয় সমস্যা বাড়ে। আজকাল বেশির ভাগ মহিলাদের এই সমস্যা থাকায় তাদের একটাই পরামর্শ , যা করবেন টুলে বা চেয়ারে বসে করুন। হাঁটুর উপর চাপ কম দিন। একটা বয়সের পর মহিলাদের হরমোনাল চেঞ্জের জন্য শরীর ফুলতে থাকে। চেষ্টা করুন ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে। তা হলে হাঁটুর উপর কম চাপ পড়ে। প্রতিদিন ব্যায়াম করুন। সমস্যা আয়ত্তে থাকবে।

দ্য ওয়াল: হাঁটু রিপ্লেসমেন্ট কী ভাবে হয় এবং সেটা কতটা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাপেক্ষ?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: হাঁটুর উপরের দিকটা ক্ষয় হতে থাকলে এই অপারেশন করা হয়। সেখানে ধাতুর এবং প্লাস্টিকের একটা আস্তরণ বসানো হয়। যা আসল হাঁটুর মতোই কাজ করে। তবে মানসিক ভাবে এটা ভাবতে হবে যে আমি ঠিক আছি। যদি নিজেকে নিয়ে ভাবতে বসেন আমার হাঁটু নকল, তা হলে মুশকিল। সাধারণত হাঁটু রিপ্লেসমেন্ট হলে এক থেকে দু’দিনের মধ্যেই হাঁটা চলা করা যায়, তবে পুরো স্বাভাবিক হতে সময় লাগে এক থেকে দেড় মাস। খরচ এক এক জায়গায় এক এক রকম। তবে অন্তত এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাগে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সব কাজ করতে হবে। খুব বেশি ঝুঁকে কাজ বা হাঁটু মুড়ে কাজ করা চলবে না।

দ্য ওয়াল: কখন হাঁটু রিপ্লেসমেন্ট করা হয়?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: যখন অন্য কোনও উপায়েই হাঁটুর ব্যথা কমানো যায় না, বা একেবারে মানুষ অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছন, তখন এ ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। তবে ডাক্তাররা চেষ্টা করেন, যাতে ওষুধেই সারিয়ে ফেলা যায়।

দ্য ওয়াল: হাঁটু পুরোপুরি স্বাভাবিক হয় কি?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: অবশ্যই। মনের উপর সব কিছু। আমরা নিজেদের যদি বলি আমরা পারব, তা হলে আমাদের কে আটকাবে? তা ছাড়া ১২-১৩ বছরের হাঁটুর জোর কখনওই ৪৫-৫০ এ থাকে না। সেই বাস্তব মেনে নিতেই আমরা operation করি। এবং তাতে ১০০ শতাংশ সাফল্যও আসে।

দ্য ওয়াল: ওজন হাড়ের সমস্যা কতটা বাড়ায়?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: ওজন যে কোনও রোগীরই প্রাথমিক সমস্যা। নজর না দিলে অবস্থার অবনতি হবেই। দেহের উচ্চতা অনুযায়ী ওজনে সামঞ্জস্য না হলে,পুরো ভারটাই বইতে হয় হাঁটুকে। তাই হাঁটুর সমস্যা কমাতে চাইলে বা প্রতিরোধ করতে চাইলে নিয়মিত ব্যয়াম এবং কিছু নিয়ম মেনে চলুন।

ডাক্তারবাবু কী বলছেন শুনুন:

দ্য ওয়াল: ২০৬ টা হাড়ের মধ্যে কোনটা কোনটা ভাঙার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি হয়? কোনটায় সারতে বেশি সময় লাগে?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: কলার বোন বা clavicle , সব চেয়ে বেশী ভঙ্গুর। গলার নীচের এই হাড় দেহের উপরের ভাগে হওয়ায়, যে কোনও অ্যাক্সিডেন্টে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেরে ওঠার বিষয়টা একেবারেই রোগীর উপরে নির্ভর করে। রোগীর শরীর ভিতরে ভিতরে ভাঙা হাড় জোড়া লাগার প্রস্তুতি নেয়। বাইরে থেকে আমরা ওষুধ দিই মাত্র।

দ্য ওয়াল: ক্যালসিয়ামের অভাব কী ভাবে বুঝবেন সাধারণ মানুষ?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: সাধারণ ভাবে মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, তবে ডাক্তার ব্লাডটেস্টের মাধ্যমে সহজেই বুঝতে পারেন।

দ্য ওয়াল: ব্যায়াম হাড়ের জন্য কতটা উপকারী ?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: যে কোনও অবস্থাতেই ব্যায়াম জরুরি। তবে এক এক জনের এক এক রকম সমস্যা থাকে, তাই স্পাইনাল কর্ডের সমস্যা বা কোমরের সমস্যার যে সব ব্যায়াম করা বারণ, সেগুলো ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা না করে করবেন না। হিতে বিপরীত হতে পারে।

দ্য ওয়াল: কোথাও প্রবল যন্ত্রণায় সেটা মাসল পেন না হাড়ের ব্যথা– কী করে বুঝবেন সাধারণ মানুষ?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: এই ব্যথাও সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। যে কোনও ব্যথায় প্রাথমিক ভাবে কোনও পেইন রিলিফ ব্যবহার করার পরে ব্যথা এক দু’দিনে না সারলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে পরামর্শ নিন।

দ্য ওয়াল: হাড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার পরেও আজকাল স্টিল প্লেট বসিয়ে দেওয়া হয়, সেটা শরীরের স্বাভাবিকত্ব নষ্ট করে না?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: একেবারেই না। বরং ক্ষয়ে যাওয়া জায়গাটা বদলে ফেলায় মানুষ বেশি দিন হাঁটা চলা করতে পারেন। নইলে ক্ষয়ে যাওয়া হাঁটু নিয়ে অসাড় হয়ে যান ধীরে ধীরে। অস্ত্রোপচার ঠিক করে করলে মানুষ সহজে বেশি দিন বাঁচতে পারেন।

দ্য ওয়াল: হাড়ের ক্ষয় বাঁচাতে কী কী করণীয়?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: নির্দিষ্ট ওজন ধরে রাখা প্রথম কাজ। লাইফস্টাইল ঠিক রাখতে হবে। কোনও নেশা করলে ছেড়ে দিন। এতে শুধু হাড়ই নয়, বাকি সব কিছুই ঠিক থাকবে।

দ্য ওয়াল: দুধ কতটা কাজে আসে হাড় শক্ত করতে?
ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায়: দুধ সব সময়েই সুষম আহারের তালিকায় নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তবে দুধ খাওয়া সরাসরি যে খুব প্রভাব ফেলে, তা নয়। তবে মেনোপজের পর মহিলাদের হরমোনাল পরিবর্তন হয়। তাই তখন দুধ খাওয়া ভাল।

অতএব সুস্থ থাকতে মেনে চলতে হবে কিছু টিপস্ আর তাতেই আপনি ছুটে বেড়াবেন জীবনের সঙ্গে। দেরি না করে তাই আজ ঝালিয়ে নিন হাঁটুটা।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

Comments are closed.