প্রজ্ঞা না হয় দোষী, কিন্তু বাকিরা?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এক একজন আছে যাদের মাথায় একটা কথা ঢুকে গেলে আর সহজে বেরোতে চায় না। ওই কথাটা বলার জন্য সবাই তাদের নিন্দা করে, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়, তাও আবার বলে। প্রজ্ঞারও হয়েছে তাই। ভোপাল থেকে নির্বাচিত বিজেপি এমপি প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর মে মাসে একবার নাথুরাম গডসেকে দেশপ্রেমিক আখ্যা দিয়েছিলেন। গান্ধীঘাতককে নিয়ে তাঁর মন্তব্যে দেশ জুড়ে তোলপাড় হয়েছিল প্রত্যাশিতভাবেই। তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ওই মন্তব্যের জন্য তিনি অন্তত প্রজ্ঞাকে ক্ষমা করতে পারবেন না।

২৭ নভেম্বর তিনি আরও একবার ওই কথাটি বললেন। এবার একেবারে গণতন্ত্রের পীঠস্থান লোকসভায় দাঁড়িয়ে। সেদিন ডিএমকে-র সাংসদ এ রাজা এসপিজি আইনের সংশোধনী নিয়ে বক্তব্য পেশ করছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, খুনিরা অনেকসময় দীর্ঘদিন ধরে কারও ওপরে রাগ পুষে রাখে। তারপর সুযোগ পেলেই তাকে হত্যা করে। এই প্রসঙ্গে তিনি গডসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে স্বীকার করেছিল, বাপুজির প্রতি দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সে বিদ্বেষ পোষণ করে এসেছে।

এ রাজা এই কথাটি বলামাত্র প্রজ্ঞা অনেকটা ঝোঁকের মাথায় মন্তব্য করেন, “গডসে তো দেশভক্ত। তাঁর নাম এখানে টেনে আনছেন কেন?” অমনি শুরু হয়ে যায় হট্টগোল। বিরোধীরা সমস্বরে দাবি করেন, প্রজ্ঞাকে ক্ষমা চাইতে হবে।

যে বিকারগ্রস্ত লোকটি জাতির পিতাকে হত্যা করেছিল, তাকে দেশপ্রেমিক বলা নিশ্চয় খুব নিন্দনীয় কাজ। কিন্তু যাঁরা এই সুযোগে হল্লা শুরু করলেন, তাঁরাও কি একবার আয়নায় নিজেদের মুখ দেখেছেন। যাঁরা এত রাগ দেখাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরা গান্ধীজির আদর্শ কতদূর মেনে চলেন? এই প্রশ্নটির জবাব খুঁজতে গেলে অনেক কথা এসে পড়বে।

গান্ধীজির অহিংসার আদর্শ প্রচার করে গিয়েছেন। তিনি নিজে যে দলটির সদস্য ছিলেন, সেই কংগ্রেসের মধ্যে কতজন এখন অহিংসায় বিশ্বাস করেন সন্দেহ। আজ থেকে প্রায় বছর ৫০ আগে, পশ্চিমবঙ্গে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমলে কংগ্রেসের একশ্রেণির কর্মী যা করে বেড়িয়েছেন, তাকে আর যাই হোক ঠিক অহিংস কার্যকলাপ বলা যায় না। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তারপরে দিল্লিতে ও দেশের নানা প্রান্তে শিখ নিধনে মেতে উঠেছিল একশ্রেণির লোক। উত্তেজিত জনতাকে খুন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কংগ্রেসী নেতার নাম ছিল। তাঁদের অনেকেরই শাস্তি হয়নি। দিব্যি এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, প্রজ্ঞাকে এখনই সংসদ থেকে বহিষ্কার করা উচিত। কারণ তিনি গান্ধীজির চেয়ে গডসেকে বড় দেশভক্ত মনে করেন। বৃন্দা কারাতের দল নিজেদের গান্ধীবাদী বলে না বটে, কিন্তু গান্ধীজিকে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে স্বীকার করে। দোসরা অক্টোবর তাঁর মূর্তিতে মালা দেয়। তা বলে এই দলটি অহিংসায় বিশ্বাসী তার অতি বড় সমর্থকও একথা বলবে না।

অনেকে বলেন, সিপিএম আগে ভাল ছিল, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে নাকি খারাপ হয়ে গিয়েছে। তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, এই দলটি পাকাপাকিভাবে ক্ষমতায় আসার আগেই সাঁইবাড়ির ঘটনা ঘটিয়েছিল। তখন ১৯৭০ সাল। সিপিএম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শরিক। রাজ্যজুড়ে অশান্তি। রাজ্যপাল সরকার ফেলে দিলেন। সেই রাগে দলের ক্যাডাররা বর্ধমানে সাঁই পদবীধারী এক ধনী পরিবারের বাড়িতে ঢুকে কয়েকজনকে খুন করে। ছেলেদের রক্ত ভাতে মেখে তাদের মাকে খাওয়াতে যায়।

১৯৭৭ সালে পাকাপাকিভাবে ক্ষমতায় আসার দেড় বছরের মধ্যে তারা ঘটিয়েছিল মরিচঝাঁপির গণহত্যা। তাদের দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসন শেষ হয় সিঙ্গুরে তাপসী মালিকের হত্যা, নন্দীগ্রাম ও নেতাইয়ের গণহত্যা দিয়ে।

আমাদের দেশে রাজনীতি আর হিংসা অনেকাংশে সমার্থক। প্রায় প্রতিটি দল গুন্ডা পোষে, তাদের প্রমোটারি, সিন্ডিকেট ও তোলাবাজিতে ছাড়পত্র দেয়। তার বিনিময়ে অপরাধীরা দলের হয়ে ভোটে ভাড়া খাটে। অনেক সময় বিরোধী দলের সমর্থকদের ভয় দেখিয়ে বুথ থেকে দূরে রাখে।

শুধু নেতাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষ আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরও আছে।

গান্ধীজি অহিংসার সঙ্গে আর একটি জিনিস শিখিয়েছিলেন। তার নাম অসহযোগ। অত্যাচারীর সঙ্গে কোনও সহযোগিতা নয়। তাকে মুখের ওপরে শান্তভাবে জানিয়ে দিতে হবে, আমি তোমার কাজ সমর্থন করছি না। তোমার কথা শুনে চলব না।

এরকম বললে ভীষণ বিপদ হতে পারে। প্রাণ যাওয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু গান্ধীজি বলেছেন, আদর্শের জন্য প্রয়োজনে শান্তচিত্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হও।

কিন্তু আমরা কী করি? যাদের দুষ্কৃতী বলে জানি, অনেকসময় তাদেরই ভোট দিয়ে আসি। তাদের সামান্য প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিং-এ শামিল হই। ধর্মতলায় মেট্রো চ্যানেল কিংবা ব্রিগেড ভরিয়ে তুলি।

আসলে, গান্ধীজিকে আমরা বহুদিন আগেই দেশ থেকে নির্বাসন দিয়েছি। মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে বহুকাল আগে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন যিশু। আধুনিক যুগে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ভাগ্যেও নতুন কিছু ঘটেনি।

প্রজ্ঞা ইতিমধ্যে সংসদে দু’বার ক্ষমা চেয়েছেন। হয়তো আবার চাইবেন। ক্ষমা চাইবার মতো অপরাধই তিনি করেছেন। কিন্তু আমাদেরও একবার জাতির পিতাকে স্মরণ করা উচিত। তাঁর কাছে মনে মনে বলা উচিত, ‘ক্ষমা করো’।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More