দীপান্বিতা অমাবস্যায় শুরু হয় দশ মহাবিদ্যার পুজো, জানুন কোন দেবীর পুজো কেন হয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: তন্ত্র সাধনায় যাঁরা অনেক উচ্চ মার্গে পৌঁছাতে পারেন তাঁরাই নাকি আয়ত্ত করতে পারেন এই বিদ্যা, অনেক শবসাধক হয়ে ওঠেন পিশাচসিদ্ধ। আবছায়ায় নামিয়ে আনতে পারেন পিশাচদের। সেই পিশাচরাই বলে দিতে পারেন ভূত-ভবিষ্যতের লিখন। যেমন ভৈরবী-বিদ্যা সম্পূর্ণ আয়ত্ব করলে সাধক নাকি ধরতে পারেন অন্য মানুষের অবিকল রূপ, এমনকি গলার স্বরও যায় বদলে। আবার তিনি ফিরতে পারেন আগের রূপে। দেবরাজ ইন্দ্র কি তবে এমন মন্ত্রগুণেই ঋষি গৌতমের রূপ ধরেছিলেন, যার জন্য অভিশপ্ত পাথরে পরিণত হন দেবী অহল্যা? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া  কঠিন।

    আজ দীপান্বিতা অমাবস্যা। আজ রাতেই শুরু হবে দশমহাবিদ্যার পুজো। কালীপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণের শ্রীরাজমালায় বলা হয়েছে:

    কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী। ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধূমাবতী তথা।। বগলা সিদ্ধিবাদ্যা চ মাতঙ্গী কমলাত্মিকা। এতা দশ মহাবিদ্যাঃ সিদ্ধিবিদ্যাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।। চামু্ণ্ডাতন্ত্র

    সহজ কথায় দশ মহাবিদ্যা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গিনী ও কমলা।  তবে অন্য মতও আছে।  তন্ত্রসার মতে দশের বেশি মহাবিদ্যা আছেন, তাঁরা হলেন কালী, নীলা, মহাদুর্গা, ত্বরিতা, ছিন্নমস্তা, বাগবাদিনী, অন্নপূর্ণা, প্রত্যঙ্গিরা, কামাখ্যা, বাসলী, বালা, মাতঙ্গী ও শৈলবাসিনী।

    আমাদের বাংলায় দশ মহাবিদ্যার পুজোই হয়। অমাবস্যায় শুরু হয়ে নবমীতে শেষ।

    কালী: দেবী কালিকা বা কালীর উপাসনায় অন্ধকার থেকে আলোকের পথে পৌঁছানো যায়। তাই দীপান্বিতা অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে আলো দিয়ে সাজানো হয় ঘর। দেবী পাপ হরণ করেন। তাঁকে মহাকালীও বলা হয়। দেবী মুণ্ডমালিকায় সজ্জিতা, ছিন্ন হাত দিয়ে তৈরি তাঁর কটিবস্ত্র। তিনি দেবাদিদেবের উপরে দণ্ডায়মান।

    তারা: দশ মহাবিদ্যার দ্বিতীয় দেবী হলেন তারা। তারা নামেই বোঝা যায় তিনি আলোর পথ দেখান। দেবীর পরণে রক্তবস্ত্র। সমুদ্রমন্থনে যখন হলাহল বিষ ওঠে সেই বিষ কণ্ঠে ধারণ করে মহাদেব নীলকণ্ঠ হয়ে সংজ্ঞা হারান। তখন দেবী তারা তাঁকে স্তন্যপান করিয়ে জ্ঞান ফেরান। তাই তারাকে বলা হয় নীল সরস্বতী।

    ষোড়শী: তৃতীয় মহাবিদ্যা হলেন ষোড়শী, তাঁকে ত্রিপুরাসুন্দরীও বলা হয়। দেবী পদ্মাসনা। তিনি সুন্দরী, তিনি ক্ষমতা ও শুভ চিন্তার অধিষ্ঠাত্রী। তিনি ভাবনার বিকাশ ঘটান। তিনি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের অধিষ্ঠাত্রী।

    ভুবনেশ্বরী: চতুর্থ মহাবিদ্যা হলেন ভুবনেশ্বরী। তিনি আদিশক্তি রূপেও পূজিতা হন। তিনি শক্তির আদি রূপ। বিশ্বের সৃষ্টিকর্ত্রী তিনিই। তিনিই পুরো জগতের শাসনকর্ত্রী। তাঁর উপাসনায় জাগতিক সব বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।  ভুবনেশ্বরীর তন্ত্রসাধনা যাঁরা করেন, সেই সাধকরা চৌষট্টি যোগিনীশর উপাসনাও করেন। বছরের যে কোনও মাসের প্রথম সোমবার তাঁর সাধনা শুরু করার পক্ষে প্রসস্ত। পঞ্চভূত নিয়ন্ত্রিত হয় তাঁরই ইচ্ছায়।

    ভৈরবী: পঞ্চম মহাবিদ্যা হলেন ভৈরবী। তিনি ত্রিপুরাভৈরবী ও কালভৈরবী নামেও পূজিতা হন। অনেকে তাঁকে কালভৈরবের স্ত্রীমূর্তি রূপে কল্পনা করেন। তিনি বিনাশের দেবী। তাঁর একচোখে নষ্ট হয় যা কিছু মন্দ, তার সবই। বিনাশের পরেই নতুন করে সৃষ্টি। দেবীর উপাসনায় মনের মধ্যে থাকা অশুভ শক্তির বিনাশ হয় বলে বিশ্বাস।

    ছিন্নমস্তা: ষষ্ঠ মহাবিদ্যা দেবী ছিন্নমস্তা নিজের মস্তক ছেদন করে সেই রক্ত নিজেই পান করছেন। সাধকদের বিশ্বাস, একা ছিন্নমস্তার সাধনাতেই সমস্ত সাধনার ফল লাভ করা যায়। ছিন্নমস্তার সাধনা সবচেয়ে কঠিন, তাই এই সাধনায় সফল হলে যে কোনও অভীষ্ট লাভ করা সম্ভব বলে মনে করেন সাধকরা। উপাসককে যে কোনও পাপ থেকে মুক্ত করেন দেবী ছিন্নমস্তা। তিনি একই সঙ্গে সৃষ্টি ও ধ্বংসের প্রতীক। ত্রিযোগিনী রূপে রক্তের তিন ধারা তিনি পান করছেন। তিনি দাঁড়িয়ে কামদেব ও তাঁর স্ত্রীর শয়ানমূর্তির উপরে। নীচে কামদেব, তাঁর উপরে শায়িত রতি এবং রতির উপরে দেবী  দণ্ডায়মান।

    ধূমাবতী: সপ্তম মহাবিদ্যা ধূমাবতীর বিধবার বেশ, শ্মশানে তাঁর বাস। অনেক সময়ে তাঁর বাহন হিসাবে কাককে দেখা যায়। মহাপ্রলয়ের পরে দেবী ধূমাবতীর সৃষ্টি। তিনি নিজে যেন অশুভের প্রতীক। একাকিত্ব কাটাতে ও অভীষ্ঠ লাভে দেবীর উপাসনা করা হয়।

    বগলা: শত্রুর বিনাশ করতে অষ্টম মহাবিদ্যা বগলামুখীর উপাসনা করা হয়। তাঁকে বগলামুখীও বলা হয়। বল্গা শব্দের অর্থ রাশ, তা থেকেই বগলা। তাই দেবীর উপাসনা করলে শত্রুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় বলে বিশ্বাস ভক্তদের। বগলামুখী হলেন নারীশক্তির প্রতীক। তাঁকে কল্যাণী নামেও পূজা করা হয়।

    মাতঙ্গিনী: দেবী সরস্বতীর তান্ত্রিক রূপই হল নবম মহাবিদ্যা মাতঙ্গিনী।  অশুভ শক্তির বিনাশে তাঁর উপাসনা করা হয়।  দেবী রক্তবস্ত্র পরিহিতা, তাঁর সব অলঙ্কারও লাল।  তিনি গুঞ্জাফলের বীজের মালা পরিহিতা। তিনি বসে কখনও স্বর্ণাসনে, কখনও শবের উপরে। চতুর্ভূজা দেবীর এক হাতে অস্ত্র, এক হাতে বীণা, এক হাতে করোটি। তিনি ষোড়শী, তিনি চণ্ডালিনী, তিনি উচ্ছিষ্টভোজী।

    কমলা: দশম মহাবিদ্যা হলেন দেবী কমলা। তাঁর গায়ের রং সোনালি, তার বাহন সাদা হাতি, সঙ্গে অমৃতকুম্ভ। তাঁর দুই হাতে পদ্ম, অন্য দুই হাত বরাভয় মুদ্রায়। তিনিই মহাশক্তি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী তিনিই। তিনিই বিশ্বের সব সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি সমৃদ্ধির দেবী।

    পড়ুন দ্য ওয়ালের পুজো ম্যাগাজিনে প্রকাশিত গল্প: সুনা সাঁওতালের কেঁদরার ছো

    সুনা সাঁওতালের কেঁদরার ছো

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More