সৈনিকদের ক্ষত ঢাকতে সেলুকটনের প্যাড বানিয়েছিলেন এই প্রবাদপ্রতিম, পরে সেটাই মহিলাদের স্যানিটারি প্যাড হয়ে গেল

ঘটনাটি ঘটেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর আমেরিকায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ১৭৫৬ সালে শুরু হয়েছিল, ব্রিটিশদের সঙ্গে ফরাসিদের বিখ্যাত ‘সেভেন ইয়ারস ওয়ার’ (১৯৫৬-৬৩)। যুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল আমেরিকার মাটিতেও। আমেরিকার বুকে থাকা ব্রিটিশ জনপদগুলিতে হামলা চালাচ্ছিল ফরাসিরা। এর দু’বছর আগেই আমেরিকার মাটিতে শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ-আমেরিকান ও নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে রক্তাক্ত লড়াই। নেটিভ বা স্থানীয় আমেরিকান গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ছিল শোয়ানি ও চেরোকি ডেলোয়ার আদিবাসীরা।

    আগের বছর, ১৭৫৫ সালের ৯ জুলাই, ফরাসী ও আদিবাসীদের সম্মিলিত সেনাবাহিনীর কাছে শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল ব্রিটিশ-আমেরিকান সেনাবাহিনীর। ফিলাডেলফিয়া থেকে কিছু দূরে থাকা ‘মনাঙ্গাহিলা’ নদীর তীরে হয়েছিল এই ভয়াবহ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন, ব্রিটিশ-আমেরিকান সেনাবাহিনীর প্রচুর সৈন্য ও প্রায় চারশো অসামরিক ব্রিটিশ নরনারী । যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে, প্রাণ হারিয়েছিলেন, ব্রিটিশ জেনারেল এডোয়ার্ড ব্র্যাডকক।

    ১৭৫৫ সালেই পেনসিলভেনিয়ার অ্যাসেম্বলিতে বিল এনেছিলেন, প্রবাদপ্রতিম আবিষ্কারক বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন। অসামরিক ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া গঠনের কথা লেখা ছিল বিলটিতে। যে মিলিশিয়া বাহিনী, ফরাসি ও নেটিভ আমেরিকানদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধে, ব্রিটিশ-আমেরিকান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করবে।

    বিশ্ববিখ্যাত আবিষ্কারক হলেন  মিলিটারি কম্যান্ডার

    ১৭৫৫ সালের নভেম্বর মাসে, ফরাসি ও নেটিভ আমেরিকানরা আক্রমণ করেছিল ‘জেনেডেনহাটেন‘ (বর্তমানে ‘ওয়েসপোর্ট’) নামে একটি জনপদ। প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিলেন। জেনেডেনহাটেন থেকে ব্রিটিশ রিফিউজিদের ভিড় আছড়ে পড়তে শুরু করেছিল ফিলাডেলফিয়া শহরে। পেনসিলভেনিয়ার দিশেহারা গভর্নর রবার্ট মরিস, একটি অকল্পনীয় অনুরোধ করেছিলেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে। সেনাবাহিনীর কম্যান্ডার হিসেবে জেনেডেনহাটেনে গিয়ে, যুদ্ধ পরিচালনা করতে অনুরোধ করেছিলেন। যে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের কোনও মিলিটারি ট্রেনিং ছিল না, শখে কয়েকটি হাঁস শিকার করা ছাড়া জীবনে বন্দুক ধরেননি, সেই বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন পঞ্চাশ বছর বয়েসে হয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ-আমেরিকার এক মিলিটারি কম্যান্ডার।

    বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

    বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের নেতৃত্বে ১৭০ জন সশস্ত্র মিলিশিয়া, ১৯৫৬ সালের ১৫ জানুয়ারি, এগিয়ে চলেছিল জেনেডেনহাটেনের দিকে। দলটিতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী, পদাতিক বাহিনী ও ঘোড়ায় টানা পাঁচটি কনেস্টোগা ওয়াগন। প্রত্যেকটি ওয়াগনে ছিল ছ’টনের রসদ। দলে ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের পঁচিশ বছরের পুত্র উইলিয়াম। বাবা বেঞ্জামিন, তেমন বন্দুক না চালালে কি হবে, পুত্র উইলিয়াম কৈশোরেই বন্দুক হাতে নেমে পড়েছিলেন ‘কিং জর্জ’ যুদ্ধে। অন্যদিকে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের সম্বল ছিল তাঁর ক্ষুরধার মস্তিস্ক। তাঁর তৈরি করা রণকৌশল, অনেক যুদ্ধে জিতিয়ে দিয়েছিল প্রয়াত জেনারেল ব্র্যাডকককে।

    জেনেডেনহাটেন গ্রামে কম্যান্ডার বেঞ্জামিন

    লিহাই নদীর তীর ধরে এগিয়ে চলেছিল বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের বাহিনী। মুষলধারে  বৃষ্টি পড়ছিল। মাঝে মাঝেই ঘিরে ধরছিল ঘন কুয়াশা। খারাপ আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে দুপুরের মধ্যেই নির্বিঘ্নে তাঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন জেনেডেনহাটেনে। একটিও গুলি ছুঁড়তে হয়নি। গ্রামে পৌঁছে দেখেছিলেন নারকীয় দৃশ্য। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সেনা ও গ্রামবাসীদের পচে যাওয়া মৃতদেহ। চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের। তাঁর অধীনে থাকা ক্যাপ্টেন থমাস লয়েডকে বলেছিলেন, সবার আগে শবগুলির সমাধির ব্যবস্থা করতে। বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সমাধি দেওয়ার কাজ। সমাধি দেওয়ার কাজ যখন চলছিল। বাকি মিলিশিয়াদের নিয়ে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ঘিরে রেখেছিলেন গ্রামটিকে। কারণ তাঁদের আসার খবর পেয়ে, শত্রুপক্ষ আবার হানা দিতে পারে।

    পরের দিনই বেঞ্জামিন শুরু করেছিলেন আরেকটি অবিশ্বাস্য কাজ। শত্রুপক্ষকে ঠেকাবার  জন্য, একটি শক্তিশালী দুর্গ  তৈরি করা শুরু করে দিয়েছিলেন। মাত্র দশ দিনের মধ্যেই গ্রামের মাটিতে মাথা তুলেছিল, ১২৫ ফুট লম্বা ও ৫০ ফুট চওড়া দুর্গ, ‘ফোর্ট অ্যালেন’। দুর্গটিকে ঘিরে ছিল ১৮ ফু্ট উঁচু প্রাচীর। দুর্গে বেঞ্জামিন মজুত করেছিলেন প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, ওষুধপত্র ও খাবার। শহর থেকে নিয়ে এসেছিলেন আরও মিলিশিয়া। কয়েকমাসের মধ্যে, গ্রামটির পনেরো মাইল পূর্বে ও পনেরো মাইল পশ্চিমে বানিয়েছিলেন আরও দুটি দুর্গ। শুরু হয়েছিল বিশাল এলাকা জুড়ে কম্যান্ডার বেঞ্জামিন ও তাঁর বাহিনীর টহলদারি। বেঞ্জামিন ডগস্কোয়াডও ব্যবহার করেছিলেন টহলদারিতে কাজে।

    টহলদারির সময় চোরাগোপ্তা আক্রমণ করতে শুরু করেছিল শত্রুপক্ষ। রোজই ফ্র্যাঙ্কলিনের বাহিনীর একজন দু’জন করে সদস্য শত্রুপক্ষের গুলিতে আহত হতে শুরু করেছিলেন। গুলির ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত ও পুঁজ মাখা ব্যান্ডেজ পাল্টাতে পাল্টাতে নাজেহাল হয়ে উঠেছিলেন দুর্গে থাকা চিকিৎসকেরা। একটুও বিশ্রাম পাচ্ছিলেন না তাঁরা। ব্যাপারটির ওপর নজর রাখছিলেন কম্যান্ডার ফ্র্যাঙ্কলিন। একটা কিছু উপায় বের করার কথা ভাবছিলেন, যাতে চিকিৎসকেরা কয়েক ঘন্টা বিশ্রাম পান।

    আবিষ্কার করেছিলেন রক্তশোষক প্যাড

    এভাবেই একদিন যুদ্ধক্ষেত্রে কম্যান্ডার ফ্র্যাঙ্কলিনের মধ্যে জেগে উঠেছিলেন, প্রবাদপ্রতিম আবিষ্কারক বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন। ওষুধের ভাঁড়ার থেকে খুঁজে বের করেছিলেন লিনেন, গজ কাপড় আর উড-পাল্প থেকে তৈরি হওয়া সেলুকটন। আহত যোদ্ধাদের জন্য বানিয়ে ফেলেছিলেন এক ধরনের রক্তশোষক প্যাড। যা গুলির ক্ষতে বেঁধে দিলে, বেশ কয়েক ঘন্টা ক্ষতটিকে দেখভাল করার প্রয়োজন পড়তো না। কিছুক্ষণ ছাড়া ছাড়া ব্যান্ডেজ পাল্টানোর ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন চিকিৎসকেরা।

    জেনডেনহাটেনকে সুরক্ষিত করে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ফিরে এসেছিলেন নিজের বাড়িতে। স্ত্রীকে দেখিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে আবিষ্কার করা সেই রক্তশোষক প্যাড। খুব খুশী হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। আমেরিকার সেনাবাহিনী ব্যবহার করতে শুরু করেছিল বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের তৈরি করা রক্তশোষক প্যাড। ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলি নিজেদের সৈনিকদের জন্য, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের আবিষ্কার করা ‘রক্তশোষক প্যাড’ বানিয়ে নিতে শুরু করেছিল।

    নারীদের চিরসমস্যার সমাধানও করে দিলেন ফ্র্যাঙ্কলিন

    প্রাচীনকাল থেকেই ঋতুস্রাব ধারণ করার জন্য নারীরা বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্য নিতেন। অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পুরোনো কম্বল, বালি, ঘাস থেকে কাঠের গুঁড়ো, কী না ব্যবহার করেছেন নারীরা। গ্রিসের ইতিহাসে পাওয়া যায় ‘হাইপাথিয়া’ নামে এক নারীর নাম। যিনি বাস করতেন চতুর্থ শতাব্দীতে। ঋতুস্রাবের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে, একদিন জানলা দিয়ে রাজপথে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন ঋতুস্রাবের কাপড়। এই অপরাধে শাস্তি হয়েছিল তাঁর।

    আবিষ্কারের পর কেটে গিয়েছিল একশো বছরেও বেশি সময়। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন আবিষ্কৃত রক্তশোষক প্যাডটি যে নারীদের ঋতুস্রাবের ক্ষেত্রেও সাহায্য করতে পারে এটা কারও মাথাতেই আসেনি। নারীদের ঋতুস্রাবের দিনগুলিতে ব্যবহারের জন্য ১৮৮৮ সালে বাজারে এসেছিল ‘সাউদালস টাওয়েল’ নামে কাপড়ের তৈরি তোয়ালে। জনসন অ্যান্ড জনসন ১৮৯৬ সালে বাজারে এনেছিল ‘লিস্টারস টাওয়েল’। দুটি  পণ্যই জনপ্রিয় হয়নি, সেগুলি ব্যবহার  করার ক্ষেত্রে নারীদের অসুবিধা হওয়ায়।

    পথ দেখিয়েছিলেন ফরাসি নার্সেরা

    নারীদের চিরসমস্যা থেকে মুক্তির পথ, প্রায় দেড়শো বছর আগে দেখিয়ে গিয়েছিলেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, এটা প্রথম  অনুধাবন করেছিলেন ফরাসি নার্সেরা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি নার্সদের মাসের পর মাস কাটাতে হতো রণক্ষেত্রের অস্থায়ী হাসপাতালে। দিনে প্রায় চোদ্দ পনেরো ঘন্টা কাজ করতে হত। প্রকৃতির নিয়মেই আসত ঋতুস্রাব। কিন্তু বার বার কাপড় পাল্টানোর ও কাচাকাচিতে নষ্ট হতো প্রচুর সময়। যার প্রভাব পড়তো আহত সৈনিকদের সেবার ক্ষেত্রে।

    এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে, ফরাসি নার্সেরা বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের ফর্ম্যুলায় তৈরি রক্তশোষক প্যাডটি। যা প্রচুর পরিমানে মজুত থাকত অস্থায়ী হাসপাতালগুলিতে। রক্তশোষক প্যাডগুলি ব্যবহার করার পর ফেলে দিলেই চলত ।তাই অল্পদিনেই, রক্তশোষক প্যাডটি প্রিয় হয়ে উঠেছিল ফরাসি নার্সদের কাছে। পরে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর নার্সরাও প্যাডটি ঋতুস্রাবের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। ফ্র্যাঙ্কলিনের প্যাডের সামান্য অদলবদল ঘটিয়ে, ১৯২১ সালে বাজারে এসেছিল আমেরিকার কোটেক্স কোম্পানির স্যানিটারি প্যাড। বাকিটা ইতিহাস। যে ইতিহাসের অন্যতম কারিগর ছিলেন উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ ও মিলিটারি কম্যান্ডার, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More