বৃহস্পতিবার, জুন ২০

অচলায়তনের প্রাচীরে ফাটল ধরিয়ে ডায়ানা এনেছিলেন আলো

চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত

 ১৯৮১ সালের ২৯শে জুলাই, মহাসমারোহে, ইংল্যান্ডের যুবরাজ প্রিন্স চার্লস ও ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত স্পেন্সার পরিবারের কন্যা লেডি ডায়ানা স্পেন্সারের বিবাহ সম্পন্ন হয় লন্ডনের সেন্ট পল ক্যাথিড্রালে।  বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন দেশবিদেশের ৩৫০০ মাননীয় অতিথি এবং তা দেখেছিলেন সারা পৃথিবীর ৭৫০ মিলিয়ন মানুষ, দূরদর্শনের মাধ্যমে। লাজুক, স্মিতভাষী, নম্র স্বভাবের অপরূপ সুন্দরী পুত্রবধূকে রাজপরিবার সানন্দে গ্রহণ করে। যুবরাজের সহধর্মিণী হিসেবে ডায়ানার স্থান হয়  রাণী এলিজাবেথের ঠিক পরেই। এ এক মহাগৌরবের পদ।
ডায়ানার শিশুকাল কেটেছে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে। তাঁর মা  ও বাবার মধ্যে অশান্তিপূর্ণ সম্পর্ক এবং পরে বিবাহবিচ্ছেদ সাত বছরের ছোট মেয়ের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা হয়তো তিনি কোনওদিনই পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। 
প্রিন্স চার্লসের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ায় ২০ বছরের ভীরু মেয়েটি ভেবেছিল এইবার বুঝি সে এক সুস্থ পরিবারের সদস্য হতে পারবে। রাজপরিবারের সদস্য হয়েছিল বটে, কিন্তু সেটি কতখানি সুস্থ, তা আলোচনা সাপেক্ষ। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ডায়ানা বুঝেছিলেন যে তাঁর বৈবাহিক জীবনে আর এক নারীর প্রভাব প্রবল। এর উপর ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ১৩ বছরের ব্যবধান। ডায়ানার নিজের ভাষায়, ‘দেয়ার ওয়াজ থ্রি অফ আস্‌ ইন দিস ম্যারেজ, সো ইট্‌ ওয়াজ এ বিট্‌ ক্রাউডেড্‌’। এই ভিড়ের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠছিলেন তিনি। রাজপরিবারের আঁট গণ্ডীর ভিতরে তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। 
তবে তাঁর বৈবাহিক জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করেছিল তাঁর দুই পুত্র। মনপ্রাণ ঢেলে তিনি এই দুই সন্তানের লালনপালন করতে লাগলেন। নিজের জীবনে প্রেমের অভাব পূর্ণ করতেই হয়তো তিনি মমতা উজাড় করে দিয়েছিলেন দুই পুত্রকে। মা ও ছেলেদের মধ্যে তৈরি হল গভীর প্রেমবন্ধন। প্রথম থেকেই ডায়ানা তাঁর ছেলেদের দেখাশোনা নিজে করতেন, পরিচারিকার মাধ্যমে নয়, যা রাজবাড়ীর প্রথাবিরুদ্ধ। এই তাঁর প্রথম লক্ষণরেখা পার হওয়া। অচলায়তনের আবেগশূন্য আবহাওয়ায়, পৃথিবীর মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে তিনি কিছুতেই তাঁর সন্তানদের বড় করবেন না। আর পাঁচটা বাচ্চার মতো, মানুষের সাথে স্বাভাবিক ভাবে মিশে বড় হবে তাঁর ছেলেরাও। না হলে তারা মানবদরদী হবে কী করে?
মাতৃস্নেহের এই তাগিদই এক ভীরু নারীকে রূপান্তরিত করল এক আত্মবিশ্বাসী, মমতাময়ী রমণীতে। শুরু হল তাঁর জনহিতকর কাজকর্ম। বহু দাতব্য সংগঠনের সাথে যুক্ত হলেন তিনি। ধীরে ধীরে তিনি ছেলেদের নিয়ে যেতে শুরু করলেন এই সংগঠনগুলির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। রাজপুত্রদের শুরু হল সেবাধর্মে দীক্ষা। আর সেই ধর্ম তাঁরা আজও সুষ্ঠু ভাবে পালন করে চলেছেন।   
আশির দশকে এইচআইভি রোগকে ভাবা হত মৃত্যুর শমন। সংক্রমণের পদ্ধতির জন্য রোগটি ঘিরে ছিল লজ্জা ও ঘৃণা। সংক্রামক ব্যাধি বলে রোগীদের ভাগ্যে জুটত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
১৯৮৭ সালে ডায়ানার পৃষ্ঠপোষকতায় লন্ডনের মিডলসেক্স হাসপাতালে শুরু হয় ব্রিটেনের প্রথম এইচআইভি/ এইড‌স চিকিৎসা বিভাগ। কিন্তু তার চেয়েও বড় ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে সেদিন। প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার গণ্ডী ভেঙ্গে, ডায়ানা সেদিন হাসপাতালের এইডস আক্রান্ত রোগীদের সাথে করমর্দন করেন। তাঁর এই মানবিক আচরণ বিশ্বের মানুষের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠিয়েছিল সেদিন – এইডসের রোগীকে ছুঁলে এইডস হয় না। অন্যান্য রোগীদের মতো এঁদেরও অধিকার আছে স্নেহ ও সহানুভূতি পাওয়ার। 
এদিকে তাঁর বৈবাহিক জীবনের অসঙ্গতি বেড়েই চলছিল। কিন্তু রাজপরিবারের সদস্যদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ নিষিদ্ধ। ডায়ানা এই নিয়ম মানতে রাজি নন। আবেগের অভিব্যাক্তি না করতে পারা তো তাঁর কাছে মৃত্যুর সমান। আর তাছাড়া এই মিথ্যাচারিতাই বা কেন? অতঃপর তিনি খোলাখুলি ভাবেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর বৈবাহিক জীবনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেন।
অচলায়তনের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে ধরল ফাটল। ধীরে ধীরে রাজপরিবারের অপ্রীতিভাজন হয়ে উঠলেন তিনি। অবশেষে, ২৮শে অগস্ট ১৯৯৬ সালে হোল আইনগত বিবাহবিচ্ছেদ- ডায়ানা হারালেন তাঁর রাজপদবী। বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন – ‘আই উড লাইক টু বি এ কুইন ইন পিপল্‌স্‌ হার্টস বাট আই ডোন্ট সি মাইসেলফ বিইং কুইন অফ দিস কান্ট্রি’। বিবাহবিচ্ছেদের ঠিক পরের বছর, ১৯৯৭ সালে ঘটল সেই মর্মান্তিক ঘটনা।
আকস্মিক দুর্ঘটনায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন লেডি ডায়ানা। কিন্তু বিশ্বের মানুষের মনে তিনি মানবিকতা রানীরূপে চিরপ্রতিষ্ঠিত।
দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর হোল মাতৃহীন, মমতাহীন। 
কিন্তু অচলায়তনের প্রাচীরের ফাটল দিয়ে বয়ে এলো স্নিগ্ধ হাওয়ার পরশ, এলো আলোর আভা। সেই আলো হাওয়ায় বড় হতে থাকলো ডায়নার দুই পুত্র।………… (ক্রমশ)
লন্ডনবাসী ডঃ চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত পেশায় শিশুচিকিৎসক। সেন্ট মেরি’স হাসপাতালে কর্মরতা। চান্দ্রেয়ীর জন্ম ও শিক্ষা প্রধানত কলকাতায়। পেশায় চিকিৎসক হলেও তাঁর নেশা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি, যার অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। নির্বাক চলচিত্র যুগের অভিনেতা চারু রায়ের দৌহিত্রী তিনি।  তিনি লন্ডনে গড়েছেন এক নাট্যদল, ইস্টার্র্ন থেস্‌পিয়ান্স। যেটি মননশীল মৌলিক নাটক পরিবেশন করে ইংল্যান্ডে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ‘রয়েল ওয়েডিং’ নিয়ে তাঁর রচনা সাগরপারের রূপকথা।

Leave A Reply