সুশান্তের আত্মহনন বিরল নয়, ভারতে ডিপ্রেশন এক মহামারী, পাঁচ লক্ষণ দেখা দিলেই চাই চিকিৎসা

ডিপ্রেশন কী তা জানতে গেলে আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে৷ না, ডিপ্রেসিভ ইলনেস মানে মন খারাপ নয়। DSM-5 বলে একটি নির্ণায়ক তালিকা আছে। তা দেখে আমাদের নির্ণয় করতে হয় কে ডিপ্রেশনের রুগী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মৈনাক পাল, চিকিৎসক

    একজন প্রখ্যাত অভিনেতার মৃত্যুতে সামাজিক মাধ্যম জুড়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে ডিপ্রেশনের সংজ্ঞায়ন ও চিকিৎসাব্যবস্থা শুরু করেছেন। কেউ কেউ ব্যতিক্রমী হয়ে দোষারোপ করছেন, কেউ পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা বলছেন।

    ভারতবর্ষে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ আত্মঘাতী হন। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা হেলাফেলার নয়। কোভিডে কিন্তু এখনও দশ হাজার মানুষও মারা যাননি। এবং এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী ডিপ্রেশন। এবং এ কথাও জেনে রাখুন, আত্মহননের জন্য কেবল ডিপ্রেশন নয়, আরও কয়েকটি মনোরোগ দায়ী।

    ডিপ্রেশন কী তা জানতে গেলে আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে৷ না, ডিপ্রেসিভ ইলনেস মানে মন খারাপ নয়। DSM-5 বলে একটি নির্ণায়ক তালিকা আছে। তা দেখে আমাদের নির্ণয় করতে হয় কে ডিপ্রেশনের রুগী।

    কী বলছে এই DSM-5? আসুন, দেখে নেওয়া যাক।

    নিম্নলিখিত ন’টি লক্ষণের মধ্যে যদি অন্তত পাঁচটি বা তার বেশি লক্ষণ কোনও মানুষের মধ্যে টানা দুই সপ্তাহ বা তার বেশি থাকে, তবে তাঁকে ডিপ্রেসিভ ইলনেসের রোগী বলা যায়।

    ১) প্রায় সারাদিন ধরে দুঃখ ও হতাশার ভাব, যা রোগী নিজে বুঝতে পারে বা তার ঘনিষ্ঠজনেরা লক্ষ করে৷

    ২) প্রায় সমস্ত বিষয়ে ও কাজকর্মে উৎসাহ ও আনন্দের অভাব বোধ করা, যা রোগী বুঝতে পারে বা ঘনিষ্ঠজনেরা লক্ষ করে৷

    ৩) কোনও প্রত্যক্ষ কারণ বা অন্যান্য অসুখ ব্যতিরেকে ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া। একমাসে ওজনের অন্তত ৫% পরিবর্তন।

    ৪) ঘুম না আসা বা সারাদিন ধরে ঝিমুনিভাব।

    ৫) সামান্য কারণে অস্বাভাবিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ বা গুরুতর কারণে উত্তেজনার অভাববোধ, এটি মূলতঃ রোগীর ঘনিষ্ঠজনের দ্বারা পরিলক্ষিত হয়।

    ৬) অস্বাভাবিক ক্লান্তিবোধ।

    ৭) নিজেকে প্রতিনিয়ত অপদার্থ ভাবা এবং অস্বাভাবিক বেশি ও যুক্তিহীন অপরাধবোধ।

    ৮) কোনও বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে বা মনঃসংযোগ করতে অপারগতা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে দুর্বলতা।

    ৯) ঘন ঘন মৃত্যুচেতনা, আত্মহননের ইচ্ছা, আত্মহননের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা, বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে তুলনা করা, আত্মহননের প্রচেষ্টা।

    সামাজিক, পেশাগত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সুষ্ঠু যাপনের পক্ষে যদি উপরোক্ত লক্ষণগুলি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তবে রোগীকে ডিপ্রেসিভ ইলনেসের আওতায় ফেলা যাবে৷ একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে কোনও নেশার দ্রব্য, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্যান্য অসুখের জন্য উপরোক্ত রোগলক্ষণ উপস্থিত হলে তাকে ডিপ্রেশন বলা যাবে না। সিজোফ্রেনিয়া স্পেকট্রাম, ম্যানিক বা হাইপোম্যানিক ডিজঅর্ডার জাতীয় মনোরোগ রোগীর মধ্যে ইতোমধ্যে উপস্থিত থাকলে এই নির্ণায়ক গ্রাহ্য হবে না।

    তো, খুব সোজা ভাষায় এই হল DSM-5 নির্ণায়ক, যা দিয়ে ডিপ্রেশন ধরা যায়।

    পড়ে নিশ্চয়ই এটুকু বুঝছেন যে এরকম কিছু আপনি আপনার মধ্যে খুঁজে পেলে বা আপনার সঙ্গে প্রায় সারাদিন কাটায় এমন কোনও ঘনিষ্ঠজন বুঝতে পারলে আপনার যত শীঘ্র সম্ভব চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। সত্যি কথা বলতে চিকিৎসকের কাছেও ডিপ্রেশন নির্ণয় বেশ কঠিন ব্যাপার; এবং আপনার ও আপনার ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে বেশ খানিকক্ষণ বা বারবার কথা বলে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে অন্যান্য রোগগুলিকে বর্জন পদ্ধতিতে বাদ দিয়ে তবেই ডিপ্রেশনের ডায়াগনসিস সম্ভব। এবং ডায়াগনসিসে আসলে তার চিকিৎসা শুরু হবে। সেই চিকিৎসা তার আকাঙ্ক্ষিত ফল প্রদান করতে খানিকটা সময়ও নেবে; অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক ফলটুকু পেতেও তিনমাস লেগে যায়৷

    আপনি কী করবেন?

    আপনার ঘনিষ্ঠ মানুষটির ডিপ্রেশনের চিকিৎসা চলাকালীন ফল না পাওয়া অবধি তার পাশে পাশে থাকবেন, তাঁকে উৎসাহ দেবেন, তাঁকে ওষুধ খেতে মনে করাবেন, তাঁর উপর নজর রাখবেন। আপনার প্রিয় মানুষটির লিম্ফোসারকোমা অফ ইনটেসটাইন হলে যতটা আতুপুতু করে রাখতেন, ঠিক ততটাই আতুপুতু করে রাখবেন। এটাই আপনার কর্তব্য। মনে রাখবেন, একটা অসুখ সারাতে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী আর রোগীর ঘনিষ্ঠজনের সুষ্ঠু মিথোজীবিতা প্রয়োজন, অন্যথায় সকলই গরল ভেল৷

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More