শহর থেকে ছুটি নিয়ে হিমালয়ে ক্যাফে বেঁধেছেন তরুণী! প্রকৃতির মাঝে পূরণ করছেন বাবার ইচ্ছে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপ, প্রতিযোগিতা, ভিড়, অশান্তি, দূষণ… মনে হয় না মাঝেমাঝে, যে এই দিনগত পাপক্ষয় থেকে বহু দূরে কোথাও চলে যাই? এমন কোথাও, যেখানে এ সব কিছুই ছুঁতে পারবে না! মাঝেমাঝেই রোজকার শহুরে ব্যস্ততা থেকে ছুটি নিয়ে প্রকৃতির কোলে শান্তির নীড় খুঁজতে চেয়ে হাঁসফাঁস করে না মনটা? সকলেরই করে। করারই কথা। তাই তো আমরা ছুটি নিই আমাদের কাজ থেকে, সংসার থেকে। বছরে এক বার-দু’বার বেরিয়ে পড়ি, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর উদ্দেশে। কিন্তু, এই ছুটিই যদি জীবন হতো? প্রকৃতিই যদি সারা জীবনের বাসস্থান হতো? রোজগারের সংস্থান করতে গিয়েও যদি মনের মতো শান্তিতে জীবন কাটানো যেত?

রূপকথা মনে হচ্ছে? এই রূপকথাকেই নিজের জীবনে সাজিয়ে তুলেছেন দিল্লির তরুণী নিত্যা বুধরাজা। আদ্যন্ত শহুরে এই তরুণী আমার-আপনার মনের সুপ্ত ইচ্ছেটাকেই সম্ভব করেছেন নিজের কাজে। কংক্রিটের শহর ছেড়ে বহু দূরে গিয়ে, পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপের কোলে বাসা বেঁধেছেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে। অবশ্য শুধু বাসা বাঁধা নয়, বলা ভাল, ক্যাফে বেঁধেছেন তিনি। দিল্লি থেকে উত্তরাখণ্ডের সাত্তাল এলাকায় গিয়ে, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছেন ছোট্ট ব্যবসা। সমস্ত শহুরে সুবিধা এবং ব্যস্ততা থেকে ছুটি নিয়েছেন স্বেচ্ছায়। তা-ও হয়ে গেল আজ পাঁচ বছর!

নিত্যা অবশ্য তাঁর এই সিদ্ধান্তের কৃতিত্ব দিচ্ছেন তাঁর বাবাকে। নিত্যা বলছিলেন “পাহাড়ের প্রতি বাবার অদ্ভুত এক আবেগ ছিল। বাবা সব সময় চাইতেন, পাহাড়ের কোলে এক টুকরো জমি কিনে, স্থানীয় পাহাড়ি মানুষদের সঙ্গে ইচ্ছেমতো জীবন কাটাবেন। চাকরি-সংসারের জাঁতাকলে সেটা হয়ে ওঠেনি কখনও। কিন্তু বাবার সেই ইচ্ছেটা অদ্ভুত ভাবে চারিয়ে গিয়েছিল আমার মধ্যে।”

তবে সে ইচ্ছে চারিয়ে গেলেও, প্রথম দিকে তা সুপ্তই ছিল। আর পাঁচ জন তরুণীর মতোই পড়াশোনা শেষ করে তথাকথিত কেরিয়ারে মন দিয়েছিলেন নিত্যা। দিল্লির এই তরুণী শুরু করেছিলেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ। “সবই ঠিক ছিল। কাজও বাড়ছিল। বাড়ছিল কেরিয়ার গ্রাফও। কিন্তু একটাই জিনিস নিয়ে অসুবিধা হতো। প্রতিটা ইভেন্টের শেষেই দেখতাম, বহু কিছুর অপচয় হচ্ছে। চেষ্টা করেও এড়াতে পারতাম না এই অপচয়। হয়তো ঘণ্টা তিন-চারের ছোট্ট ইভেন্ট, কিন্তু তার শেষে এত কিছু অপচয় হল, যা দিয়ে হয়তো অনেকগুলি মানুষের কয়েক দিনের অন্ন সংস্থান হয়ে যেত। হতাশ লাগত আমার। খুব বিরক্তও লাগত।”– বলছিলেন নিত্যা।

এই বিরক্তিই হয়তো সুপ্ত ইচ্ছেকে আরও চাগিয়ে দিয়েছিল। মনে করিয়ে দিয়েছিল, জীবনটা আরও অনেক ভাল ভাবে বাঁচা যেতে পারে। যে জীবন বাঁচতে চেয়েছিলেন তাঁর বাবা!

পাহাড়ে যাওয়া-আসা শুরু হয় নিত্যার। কখনও একা, কখনও সদলবল। বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রামে ঘুরতেন, পাহাড়ি মানুষের যাপন আপন করতেন। প্রকৃতির প্রতি, পাহাড়ের প্রতি ভালবাসা বাড়তে শুরু করল তীব্র ভাবে। নিত্যা বললেন, “এই সময়েই আমি একটা অদ্ভুত কাজ পাই উত্তরাখণ্ডের লিটি গ্রামে। পাহাড়ের কোলে এক জনের ঘরবাড়িসম্পত্তি দেখাশোনা করার কাজ। ওই গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, ফোনের সংযোগ ছিল না। এমনকী গ্রামে পৌঁছনোর রাস্তাও ছিল না। ওখানেই ছ’মাস কাটিয়েছিলাম আমি। বড্ড ভাল ছিলাম, কোনও অসুবিধা হয়নি। তখনই বুঝেছিলাম, এই নির্জন জীবনটাই হয়তো আমার জন্য সব চেয়ে ভাল হবে।”

আচমকা মারা গেলেন নিত্যার জীবনের প্রিয়তম মানুষটি। তাঁর বাবা। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল আচমকা। কিন্তু শত অন্ধকারেও স্বপ্নের জ্যোতি কখনও ম্লান হয় না। তাই বাবা চলে যাওয়ার পরে, বাবারই স্মৃতিতে উত্তরাখণ্ডের সাত্তালে এসে একটি ছোট্ট ক্যাফে খুলে বসেন নিত্যা। নাম দেন, ‘বাবা’স ক্যাফে’। সঙ্গে বাবার নামেই খোলেন একটি ছোট্ট হোম-স্টে, ‘নবীন’স গ্লেন’। নিত্যার মা-ও দিল্লিতে থাকতে চাননি একা। চলে আসেন মেয়ের সঙ্গে।

শহরের সমস্ত আনন্দ-আয়োজন ছেড়ে, ঘরবাড়ি ছেড়ে নির্জন প্রকৃতির কোলে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে মা-মেয়ের এতটুকু সময় লাগেনি। সময় লাগেনি, বাবা নবীন বুধরাজার ইচ্ছে পূরণ করার সিদ্ধান্ত নিতে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠে নতুন সংসার, নতুন কাজ, নতুন জীবন। স্থানীয় মানুষদের সাহায্যে আস্তে আস্তে বড় হয় ক্যাফে। পর্যটকদের মুগ্ধতা কেড়ে নিতে বেশি সময় নেননি, আজন্ম পাহাড় ভালবাসা মেয়েটি।

“এত ভাল খুব কম মানুষই থাকতে পারেন, যেমন আমরা আছি। প্রকৃতির চেয়ে বেশি সুন্দর আর কী আছে? একটা মাত্র জীবন, সে সৌন্দর্যের সবটুকু উপভোগ করা উচিত। আমি সেটাই করছি। একটা বাড়ের জন্যও আমার মনে হয় না, এখানে কিছু কম আছে, বা আমি কোনও শহুরে সুবিধা মিস করছি। আসলে এখানে অনেক কিছু না থাকার পরেও যে অনাবিল শান্তি আছে, তা বেঁচে থাকার অমূল্য সম্পদ।”– বলেন নিত্যা।

আরও পড়ুন:

ছোট পোশাক পরেই মেয়েরা ধর্ষণকে ডেকে আনে, এক মহিলার মন্তব্যে নেট দুনিয়ায় তুলকালাম

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More