বেঁচে থাকাটাই ‘সুবিবেচনার’ কাজ বলে মনে হয়েছিল সৌমিত্রদার

৪১২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দেবশঙ্কর হালদার

অভিনেতা

‘কখনও কখনও বাঁচাটাই খুব শুদ্ধ বিবেচনার কাজ বলে মনে হয়।
কারণ এখনও দেশে রয়ে গেছে বাঁশি হাতে মহিষের সুরেলা রাখাল।
দুপুর বিবশ করার কাজ শুরু করে দিলে, হে রাখাল।
বেঁচে থাকাটাই বড় সুবিবেচনার বলে মনে হয়।’

এই ছোট্ট কবিতাটা সৌমিত্রদা লিখেছিলেন অনেকদিন আগে। কবিতাটার নাম ‘সুবিবেচনা’। একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম। স্মৃতি থেকে বলবার চেষ্টা করলাম। আজকে যখন উনি চলে গেছেন বলে আমরা জানছি, তখন আমার এই কবিতাটা বারবার মনে পড়ছে। যেন উনি বলছেন, ‘বেঁচে থাকাটাই বড় সুবিবেচনার বলে মনে হয়।’ কেন না, ওই ‘রয়ে গেছে বাঁশি হাতে মহিষের সুরেলা রাখাল’।
এই যে উনি নেই, এমনটা আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় ওঁর যে কাজ, ওঁর যে অভিনয়ের ছাপ, তার চিহ্ন, তার চিত্র, তার গন্ধ, তার বর্ণ, তারই সঙ্গে কবিতা-নাটক-গান, আরও আরও নানা প্রান্তরে ওঁর যে অনায়াস যাতায়াত, এক থেকে অন্যে গিয়ে সেখান থেকে প্রাণবায়ু আহরণ করা এবং সেটিকে ধারণ করা আর যেটিকে আমরা নশ্বর দেহ ছেড়ে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়া বলি, তারপরেও বেঁচে থাকাটাই ‘সুবিবেচনার’ কাজ বলে মনে হয়েছিল ওঁর। অতএব উনি বেঁচে আছেন বলেই আমার মনে হয়। উনি যে ক’দিন অসুস্থ ছিলেন, তারপরে এই যে চলে গেছেন, কোথায় উনি গেছেন? উনি তো একেবারে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে, ঘাড়ে, মাথায়, শোণিতে, সুদূরে, নিকটে, অনতিদূরে, আকাশে, সমুদ্রে, গাছে, পত্রে, পুষ্পে, লাবণ্যে, বিশ্বাসে, কখনও কখনও বিশ্বাসহীনতায়, কখনও বিষন্নতায়, কখনও দুঃখে, কখনও ম্লান কণ্ঠে, কখনও উচ্চৈস্বরে– এই যে শব্দগুলো বলছি এর প্রতিটির মধ্যে উনি রয়েছেন। এবং রয়েছেন একটা সংযত সন্ন্যাসী হিসেবে। রাখালের মতো। যে রাখালের বাঁশির সুর বড় দূর থেকে আরাম দেয় আর বিবশ করে।
সেইরকম একজন মানুষের কথিত সেই ছেড়ে চলে যাওয়া সত্ত্বেও তাঁর যা যা কিছু রয়ে গেল এবং সেই স্মৃতি আমাদের অনেক কিছু এখন উপহার দেবে। আমাদের অনেক মণিমানিক্য দেবে। সেইগুলি যেন আমাদের বুঝতে অসুবিধে না হয়। সেই থাকাগুলির মধ্যে কিন্তু উনি ভীষণভাবে বেঁচে থাকবেন, আছেন এবং এটাই তো ওঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল।

আর একটা কথা বলব, অভিনয় একজন অভিনেতার জন্য কতবড় একটা অহংকার হতে পারে সেটা ওঁকে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম। শেষবার অসুস্থ হওয়ার বোধহয় মাত্র চারদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে একসঙ্গে বসেছিলাম। সেখানেও থিয়েটার নিয়ে, অভিনয় নিয়ে ওঁর অসীম আগ্রহের কথা বলছেন। এই পঁচাশি বছর বয়সেও উনি একটা নতুন থিয়েটার করবার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। এমন একটা থিয়েটার যা সমাজকে, মানুষকে কোথাও একটা ধাক্কা দেবে, কাঁপুনি দেবে। শুধু থিয়েটার করা নয়, তাতে অভিনয়ও করবেন। যেন বোঝাতে চাইছেন অভিনয় করাটাই অভিনেতার একমাত্র অহংকার, আর কোনও অহংকারই তাঁর নেই। যশের নয়, খ্যাতির নয়, অর্থের নয়। আমি অভিনয় করব। আমি যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, যেখানেই থাকি না কেন, যত বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়েই যাই না কেন, যত আনন্দের মধ্যেই থাকি না কেন আমি অভিনয় করব। এই অহংকারটি উনি আমাদের সামনে উদাহরণস্বরূপ রেখে গেছেন। সেইটিকে যদি বুঝতে পারি তাহলে হয়তো নিজের ভেতরের শক্তি আরও বাড়াতে পারব। এমনটাই আমার মনে হয়। এইসব নিয়েই আমাদের পথচলা আর একরকমভাবে শুরু হল। একভাবে পথ চলছিল, আর একভাবে শুরু হল। এটাই মনে হয়।
আজ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পথচিহ্নগুলো, যেগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই মাইলস্টোনগুলোর সামনে গিয়ে যদি দাঁড়াই, দেখব, অনেক দূর থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামক এক সুরেলা রাখাল নিরন্তর বাঁশি বাজিয়ে চলেছেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More