সোমবার, এপ্রিল ২২

‘আরোহী’ দেবাশিসকে তিলে তিলে গড়েছে এই পেমবা শেরপাই

পর্বতারোহণে এক ধাক্কায় বেশ এগিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এমন আরোহী প্রায় বিরল, যাঁর কোনও না কোনও বড় মাপের আরোহণে সঙ্গী হননি দার্জিলিঙের পেমবা শেরপা। সেই পেমবা শেরপাই এখন কারাকোরামের সাসের কাংরি অভিযানে গিয়ে, ক্রিভাসের অতলে নিখোঁজ। কী বলছেন রাজ্যের পর্বতারোহীরা? পেমবা শেরপার সহযোগিতায় এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্নপূর্ণা, লোৎসে, ধৌলাগিরি-সহ আরও বহু শৃঙ্গ অভিযানে সামিল হওয়া পর্বতারোহী দেবাশিস বিশ্বাস ভাগ করে নিলেন তাঁর অভিজ্ঞতা।

দেবাশিস বিশ্বাস

পেমবার কথা বলতে গেলে কোথা থেকে শুরু করব, আর কোথায়ই বা শেষ করব! পাতার পর পাতা লিখলেও কি তার কথা শেষ করা যাবে? সে তো আমার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে ছিল, জড়িয়ে আছে। পেমবা না থাকলে কি আমি আদৌ কোনও আরোহণ করতে পারতাম? সে শিবলিঙ্গই হোক, বা এভারেস্ট, বা কাঞ্চনজঙ্ঘা, বা অন্নপূর্ণা।

কী অসম্ভব সরল আর ভদ্র মানুষ পেমবা! আমি শুধু চিনি বলে নয়, যাঁরা ওকে চেনেন না, তাঁরাও একটিও নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারবেন না, ব্যক্তি পেমবাকে নিয়ে।

কত বার হয়েছে, সকালে ঘুম ভাঙার আগেই পেমবার ফোন, “স্যর, পঁহুচ গ্যয়া।” আমি তো তাজ্জব, কাঁহা পঁহুচ গ্যয়া! ঘুমের ঘোর কাটতেই বুঝলাম, ও কলকাতায় এসেছে। বিধাননগর স্টেশনের পাশেই আমার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট রয়েছে। পেমবা জানে, ওটার চাবি কেয়ারটেকারের কাছেই রাখা থাকে। আর জানে, ও এলে বা অন্য শেরপা ভাইরা এলে ওটাই ওদের আস্তানা।

পেমবার কত কত শৃঙ্গ আরোহণ! যে কোনও পর্বতারোহীর কাছেই সেই তালিকা ঈর্ষণীয়। আমারও তো কত অভিযান ওর সঙ্গেই। কত স্মৃতি পেমবার সঙ্গে। কত যৌথ ভাবে তৈরি গল্প। তিক্ততা? না, মনে পড়ে না। বরং সব সময় মনে হয়, ‘আরোহী’ দেবাশিসকে তিলে তিলে গড়েছে এই পেমবা শেরপাই।

শিবলিঙ্গ অভিযানের সামিট ক্যাম্পের পরেই সেই বিখ্যাত বা কুখ্যাত সেরাক। পেমবা আর পাসাংয়ের চরম নৈপুণ্য আর তুখোড় দক্ষতাতেই সেই সেরাকের রুট ওপেন হল। সেখানেই রোপে ঝুলতে ঝুলতে আমার ছবি তোলা, ভিডিও করা। ওদেরই ভরসায়। আর তা থেকেই পরে তৈরি হয় শিবলিঙ্গ মুভি। সেই শিবলিঙ্গ আরোহণ বাংলার পর্বতারোহণে একটা মাইলস্টোন বলেই আমি মনে করি। কিন্তু সেই মাইলস্টোনের কারিগর আমি নই, পেমবা আর পাসাং।

আরও পড়ুন: পাহাড়ে একটা ভুলই হয়তো শেষ ভুল, শিখিয়েছিলেন পেমবাজি

পানওয়ালি দুয়ার শৃঙ্গে অভিযানের সময়েও পেমবা-পাসাং দুই ভাইয়ের জুটি। প্রচণ্ড খারাপ আবহাওয়ায় শীর্ষ আরোহণ হয়। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না মেঘ আর বরফপাতের জন্য। আমরা চড়তে চড়তে এক সময়ে নামতে লাগলাম। পেমবাই আবিষ্কার করল, সামিট হয়তো হয়ে গিয়েছে। চেঁচিয়ে বলল, “দেবাশিস দাদা, সামিট হো গ্যয়া শায়েদ। সামিট ক্রস করকে নীচে যা রহে হ্যায় হামলোগ!”

আর এভারেস্ট? ২০১০ সালের এভারেস্ট অভিযান বাংলার পর্বতারোহণের এক অন্যতম পদক্ষেপ। অসামরিক বাঙালি হিসেবে প্রথম শৃঙ্গ ছুঁই আমি আর বসন্ত সিংহরায়। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, এই পদক্ষেপের সমস্ত, কৃতিত্বই আসলে পেমবার। প্রায় দু’মাসের সেই কর্মকাণ্ডে কত কাছ থেকে দেখেছি পেমবার দায়িত্ববোধ, দক্ষতা, দূরদর্শিতা। আমাদের দলের সাফল্য নিয়ে সব চেয়ে বেশি আগ্রহ ওরই ছিল। সব চেয়ে বেশি পরিকল্পনা ও-ই করেছিল প্রতিটা ধাপে। অসংখ্য স্মৃতি এই অভিযানে। তার মধ্যেই ছোট্ট একটা ঘটনা মনে থেকে গিয়েছে।

ক্যাম্প থ্রি পর্যন্ত উঠে গিয়েছি। আমাদের পৌঁছে দিয়ে পেমবা ফের নেমে গিয়েছে ক্যাম্প টু-তে। কারণ ক্যাম্প থ্রি-তে আমাদের একটাই তাঁবু, তাতে জায়গা হবে না সকলের। বসন্তদা, পাসাং আর আমি রইলাম। পরের দিন সকাল থেকেই বেশ মেঘলা, সঙ্গে স্নো-ফল। আমাদেরও আলসে মেজাজ, বেরোনোর খুব একটা ইচ্ছে নেই। অথচ পেমবা আগের দিনই বলে গিয়েছে, সকাল সকাল বেরোতে। বলে গিয়েছে, ও ক্যাম্প টু থেকে বেরিয়ে আমাদের ধরে ফেলবে পথে।

আরও পড়ুন: রেখেছো শেরপা করে, আরোহী করোনি!

সে দিন আমরা সময়ে না বেরোলেও, পেমবা কিন্তু যথা সময়ে পৌঁছে গিয়েছিল আমাদের ক্যাম্প থ্রি-তে। আমাদের তখনও বেরোতে না দেখে, শুরু হল প্রচণ্ড বকাবকি। যেন মনে হল, আরোহণের গরজটা ওরই একার। অথচ তত দিনে ওর পাঁচ বার এভারেস্ট ছোঁয়া হয়ে গিয়েছে। তার পরেও শুধু আমাদের সাফল্যের জন্য এতটাই আন্তরিক ও যত্নবান ছিল পেমবা।

আরও পড়ুন: পাহাড়ে পেমবাজি সঙ্গে থাকলে বিপদ ধার ঘেঁষত না

২০১৩ সালের ধৌলাগিরি অভিযান। প্রায় শীর্ষের নীচেই যে কুলোয়ার, তার গোড়ার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা আড়াইটে বেজে যায়। তত ক্ষণে আবহাওয়া গেছে বিগড়ে। বরফেরর গুঁড়ো মেশা হাওয়া চলতে শুরু করেছে। আমাদের সামনেই স্পেনের আরোহী গারা আর তার শেরপা কেশব বরফের ঢালে গড়িয়ে পড়েন। জাপানি আরোহী কোনো-ও ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে ওখানেই থেমে যান। পরে মারা গিয়েছিলেন। আমরাও আটকে পড়ি, বুঝি আর এগোনো সম্ভব হবে না। তখনই সঙ্গের দড়িটাকে দু’টুকরো করে পেমবা আমাদের দু’টো দলে ভাগ করে দেয়। বসন্তদা নামতে শুরু করেন দাওয়ার সঙ্গে, আমি পেমবার সঙ্গে। সেখানে যে কত বড় বিপদের মুখে বসন্তদা পড়েছিলেন, আর দাওয়া কত দক্ষতায় ওঁকে বাঁচিয়েছিল, সে খবর জানাজানি হয়। কিন্তু যেটা জানা হয়নি, আমিও ওই আবহাওয়ায় গোটা পথ সুস্থ অবস্থায় নামতে পেরেছিলাম শুধু পেমবার জন্যই।

২০১৭ সালের লোৎসে অভিযানেও দেখেছি পেমবার সেই আন্তরিকতা, যত্ন। আমার আচমকা ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যায়। ২৬০/১৫০। খুবই শরীর খারাপ। বেস ক্যাম্প থেকে হেলিকপ্টারে উড়ে গিয়ে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। তার পরে একটু সুস্থ হয়ে আবার ফিরি বেস ক্যাম্পে। পেমবা সারা ক্ষণ চোখে চোখে রেখেছিল আমায়। অথচ সে বার কিন্তু ও আমার নির্ধারিত শেরপা ছিল না। কার্লোস নামের এক বিদেশি আরোহীর সঙ্গে ছিল ও। তা সত্ত্বেও আমার খেয়াল রাখতে, আমার সঙ্গে ক্যাম্প থ্রি পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল পেমবা। বারবার ওকে কথা দিতে হয়েছিল, আমার একটুও শরীর খারাপ লাগলে সঙ্গে সঙ্গে নীচে নেমে যেতে হবে। তবেই ও আশ্বস্ত হয়ে ফিরে গিয়েছিল কার্লোসের কাছে।

আরও পড়ুন: তুষার-গহ্বরে তিন দিন নিখোঁজ পেমবা, আশার আলো ক্ষীণ

পেমবার সরলতার আর একটা উদাহরণ দিই। এই সরলতা অবশ্য ওকে বড়সড় বিপদেও ফেলেছিল। পর্বতারোহী মহলে কম তোলপাড় হয়নি এই ঘটনায়। কী, না ওর ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট হওয়া দু’টো ছবি। দেখা যায়, অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের মাথায় পতাকা হাতে পেমবা। আর সে ছবি দেখে এক জন ছোট বাচ্চাও বুঝতে পারবে, ছবিটা মর্ফড। অন্য কোথাও পতাকা হাতে দাঁড়ানো ছবি অন্নপূর্ণার মাথায় বসানো হয়েছে। আর আমি একচোখ দেখেই বুঝলাম, সেই ‘অন্য কোথাও’টা হল কাঞ্চনজঙ্ঘা। কারণ কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে সামিটের পরে ওর ওই ছবিটা আমিই তুলেছিলাম।

আর এই বানানো ছবি নিয়ে তো সংবাদমাধ্যম থেকে সোশ্যাল মিডিয়া— সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। সেই বিতর্কের সময়ে পেমবা গিয়েছে অভিযানে। ও কলকাতায় ফেরা মাত্রই ওকে ডেকে প্রচণ্ড বকাবকি করলাম, কেন করেছো এটা! ও তো প্রায় কেঁদেই ফেলে। বলল, দুয়েক লাইন লেখা ছাড়া আর কিছুই পারি না আমি কম্পিউটারে। ফেসবুকে যা কিছু রয়েছে, সে সব তো ছেলেমেয়েরাই করে।

“ওদের বলেছিলাম, অন্নপূর্ণার মাথায় পতাকা নিয়ে আমার কোনও ছবি নেই। তাই ওরা ওটা বানিয়ে পোস্ট করেছে।”— অকপট সরল স্বীকারোক্তি পেমবার। ছেলেমেয়েদের কাছে ওর এরকম একটা সরল আফশোস যে এত বিতণ্ডা সৃষ্টি করতে পারে, কখনও কল্পনা করতে পারেনি ও। সব শুনে ওর চোখ ছলছল করছিল। আমারও খারাপ লেগেছিল না জেনে বকাবকি করার জন্য। কিন্তু তত ক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন মহলে অবিশ্বাস আর মিথ্যাচারের বদনাম কুড়িয়ে নিয়েছে ও। পরে শুনেছিলাম, ওর ছেলেমেয়েরাও অনুতপ্ত হয়েছিল। আজ পথ চেয়ে বসে আছে ওরা, বাবা ফিরবে বলে।

গত মাসে, সাসের কাংরি অভিযানের আগে।

গত বছর দেখেছি, পেমবারও শরীর ভাঙছে। বছরে অতগুলো করে বড় বড় অভিযান করার তো একটা ধকল আছে। বয়সও বাড়ছিল। আমি চেষ্টা করতাম, ওকে আগলে রাখতে। ওর থেকেই শেখা, যেমন করে ও অনেক বার রেখেছে আমায় আগলে, সামলে। পেমবাও যে কোনও কারণেই হোক, খুব ভরসা করত আমায়। কিছু দিন আগেই একটা অভিযানে ওকে এক জন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “পেমবাজি, অওর কিতনে দিন ক্লাইম্ব করেঙ্গে?” জবাবে আমায় দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল, “দেবাশিস দাদা যব তক বোলেঙ্গে।”

কিন্তু আমায় তো থামতে বলার সুযোগ দিল না পেমবা। তার আগেই নিজেই থেমে গেল। এই প্রথম আর এই শেষ বার, আমার কথা শুনল না। কিছু বলার সুযোগই দিল না!

বারবার মনে হচ্ছে, আমার এত দিনের চড়াইপথের ফ্রেন্ড, উতরাইয়ের ফিলজ়ফার, সমতলের গাইড, এই শেরপা ভাইটা কি আমায় ইঙ্গিত দিয়ে গেল— এবার তোমারও যাওয়ার সময় হয়েছে!

Shares

Leave A Reply