মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯

ক্ষতিপূরণের অর্থে উতরে যাবে মেয়ের বিয়ে, কিন্তু বৌবাজারে গুঁড়িয়ে গেল শীল পরিবারের সবটুকুই

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেয়ের বিয়ে হয়তো হয়ে যাবে। কিন্তু তার পর?

এই চিন্তাই আপাতত ঘুম উড়িয়েছে বৌবাজারের দুর্গা পিথুরি লেনের শীল বাড়ির কর্তা জয়ন্তবাবুর। আগামী জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন তিনি। সেই মতোই এগোচ্ছিল সব কিছু, বিয়ের কয়েক মাস আগে যেমনটা এগোনোর কথা আর কী।

কিন্তু আচমকাই বিপদ এল ঘনিয়ে। রবিবার পুলিশের নির্দেশে ঘর খালি করতে হল। মেট্রোর কাজের জন্য মাটির তলায় সুড়ঙ্গ খুঁড়তে গিয়ে এলাকার বাড়ি-ঘর ভেঙে পড়তে পারে। তবে রবিবার বাড়ি ছেড়ে এলেও শীল পরিবারের কেউ ভাবতে পারেননি, মঙ্গলবারই তিনতলা বাড়িটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে পুরোপুরি!

বিয়ে উপলক্ষে অনেক টাকা খরচ করে সে বাড়ি মেরামত করা হয়েছিল কয়েক দিন আগেই। সেই বাড়িতেই রাখা ছিল মেয়ে তৃষা শীলের বিয়ের শাড়ি, গয়না, টাকা। ছিল অসংখ্য নথিপত্র। কোনও কিছুই বাড়ি থেকে বার করতে পারেনি শীল পরিবার। সে সব কি আর উদ্ধার করা যাবে? আশা দেখছেন না জয়ন্তবাবু। কারণ ১৩ এ দুর্গা পিথুরি লেনের শীল বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই নয়। জয়ন্তবাবু আক্ষেপ করছেন, কেন সোমবার পুলিশের বাধা সরিয়ে জোর করে ঘরে ঢুকে দরকারি জিনিসটুকু বার করে আনলেন না!

তবে বিয়ের জিনিসপত্রই মুখ্য নয়, ওই বাড়িতেই ছিল শীল পরিবারের নিজস্ব ছাপাখানা। ওটাই বংশপরম্পরায় ব্যবসা তাঁদের। সমস্ত যন্ত্রপাতি যে ভেঙে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য আর এটাই ভাবাচ্ছে শীলবাবুকে। আপাতত সরকারি ক্ষতিপূরণ যতটা মিলছে, তা দিয়ে হয়তো মেয়ের বিয়ের খরচ ভাল ভাবেই উতরে যাবে। কিন্তু তার পর? কী ভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন তাঁরা! নতুন করে ব্যবসা শুরু করা কি মুখের কথা!

এই একই সংশয় খোদ তৃষারও। কেবলই তার বিয়ে নিয়ে সকলের হা-হুতাশে যেন একটু বিরক্তই সে। আরও অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। সে দিকে যেন হুঁশ নেই কারও!

মঙ্গলবার শীল-বাড়ি ভেঙে পড়ার পরে, মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে তাঁদের। মেট্রো কর্তৃপক্ষকেও পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে বলা হবে বলে জানান তিনি। তাই মেয়ের বিয়ের জন্য এই দশ লক্ষ টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ায়, সে দিক থেকে জয়ন্তবাবু ও তাঁর স্ত্রী সোনালিদেবী খানিকটা নিশ্চিন্ত।

তৃষার মা সোনালিদেবী বলছেন, “মেয়ের বিয়েটা হয়তো আটকাবে না। আমার মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়িও যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। কিন্তু আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল! এত বড় প্রকল্পের কাজ করার আগে মেট্রো কেন ভাল করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি!”– আক্ষেপ, অভিযোগ, আফশোস উপচে পড়ে গলায়।

আপাতত সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর একটি গেস্ট হাউসের অস্থায়ী বাসিন্দা তাঁরা। কবে, কোথায়, স্থায়ী বসবাসের সুযোগ মিলবে, জানেন না জয়ন্ত-সোনালি-তৃষা। জানেন না, কয়েকশো বছরের পুরনো ভিটের নীচে যে স্মৃতি-স্বপ্ন-সম্পদ চাপা পড়ে গেল, তা আর কোনও দিন উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না!

Comments are closed.