বহুজন সমাজ ও নয়া নাগরিকত্ব আইন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবত্র দে

    শীতে আপামর বাঙালির ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মুকুটমণিপুরে প্রবেশের তিন কিলোমিটার আগে নির্মীয়মাণ খাতরা স্টেডিয়ামের গায়ে রাস্তার পাশে খেজুর গুড় তৈরি করেন হারুন রশিদ মণ্ডল। প্রতি-শীতেই নিজের পুত্রদের নিয়ে পাশের ব্লক ইন্দপুর থেকে এখানে এসে খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি অস্থায়ী আস্তানা বানিয়ে মাস তিন-চার আশপাশের থেকে সংগ্রহ করা রস দিয়ে সুস্বাদু গুড় বিক্রি করেন। তাদের খুব সামান্য ভাড়ায় এই ক’মাস বসবাস ও ব্যবসা করতে দেন জমির মালিক কোনও আদিবাসী পরিবার।

    এই ধু-ধু মাঠের মধ্যে তাঁরা তাদের প্রয়োজনীয় জল সংগ্রহ করতে যান রাস্তার অপর পাশের হোটেলে, যার মালিক নিজে বহুজন সমাজের লোক, যিনি আবার তার অতিথিদের অনুরোধ করেন ওই গুড় কিনতে। আমাদের দেশে বহুজন সমাজ তথা শ্রমজীবী মানুষের এই বহমান সখ্য আমাদের মনে করায়, নয়া নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের প্রতিবাদে পক্ষকাল আগেই এক দলিত নেতার দেশের সংবিধান হাতে দিল্লির জামা মসজিদ থেকে রাষ্ট্রের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করার দৃশ্য। প্রসঙ্গত, ভিন্ন ঘরানার কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অবিভক্ত বাংলায় নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানের সখ্যের কথা বারবার উল্লেখ করতেন।

    একথা অত্যুক্তি হবে না, যে এই মুহূর্তে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ আইনসভায় সংখ্যাধিক্যের জোরে পাশ হওয়া সিএএ-এর প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে রাস্তায় সামিল। ছাত্রছাত্রীদের বাইরে এই রাস্তায় নামা মানুষের একটা বড় অংশ বহুজন সমাজের। অসমের এনআরসি-তে নাম না-ওঠা হিন্দু বাঙালিদের সংখ্যাগুরু বহুজন সমাজের। খটকা লাগে, যখন দেখি এ দেশের আদিবাসী সমাজেরও বড় অংশ নতুন আইনের বিরোধী, কিন্তু তাদের তো এতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তা হলে এই বহুজন সমাজ এত সংবেদনশীল হল কেন এই নতুন সংশোধনী নিয়ে?

    বিগত তিন দশকে প্রায় আমূল বদলে গিয়েছে দেশের অর্থনীতি, মূলত উদারীকরণের কারণে, যা আরও গতি পেয়েছে গত পাঁচ বছরে। দশ ভাগ ধনীর হাতে প্রায় আটাত্তর ভাগ সম্পদ! ফসলের দাম না-পেয়ে বা ঋণখেলাপির ভয়ে কৃষকের অভূতপূর্ব হারে আত্মহত্যা, ঊর্ধ্বগামী বেকারি, সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি এ সব এই বদলে যাওয়া অর্থনীতির অঙ্গ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যেমন বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি সরকারি বরাদ্দের হ্রাসমাণতা, তেমনই সাধারণ স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা।

    অর্থনীতির সার্বিক এই বদল সর্বত ভাবে নাড়া দিয়েছে বহুজন সমাজের মানুষকেই, কারণ তাদের সিংহভাগই যুক্ত অসংগঠিত ক্ষেত্রে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য তারাই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার একাধিক প্রতিবেদন জানান দিচ্ছে যে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের বড় অংশই এই বহুজন সমাজের, অথচ গত তিন দশকে তারাই অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে কোণঠাসা।

    অন্যদিকে, তিন দশক আগে অর্থনীতির উদারীকরণের প্রাক্কালে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশের উদঘাটন দেশের রাজনৈতিক সামাজিক জীবনেও নিয়ে আসে এক আমূল বদল। বদলে যায় গোটা হিন্দিবলয়ের রাজনৈতিক সমীকরণ। দেশ জুড়ে অনগ্রসর শ্রেণির রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান আর বিপ্রতীপে অর্থনীতিতে তাদের ক্রমহ্রাসমানতা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রসার ঘটাল গত তিন দশক ধরে।

    নয়া নাগরিক আইন নতুন করে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতার সঞ্চার করেনি, অসমের অভিজ্ঞতায় মূলবাসী, দলিত ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মানুষরাও শঙ্কিত। নতুন ভারতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রান্তিক শ্রেণির এই সংখ্যাগুরু মানুষই শ্রমশক্তির জোগানদার হবে আধুনিক নগরসভ্যতার, যার উঁচু পাঁচিলের অন্দরে প্রবেশের অধিকারই থাকবে না এই গরিবগুর্বোদের। আর অন্যদিকে, জঙ্গল ও তার নিচে থাকা খনিজের লোভে কয়েক হাজার বছর ধরে বাস করা মূলবাসীদের উচ্ছেদ করা হবে ‘জনস্বার্থে’, যাতে তারাও হতে পারেন সস্তার শ্রমশক্তির যোগানদার।

    এ কাজ করার জন্যই চাই নাগরিকত্বহীন বহু মানুষ, যাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টির কোনও দায়িত্বই নেবে না রাষ্ট্র। তাঁরা বাধ্য হবেন দক্ষতাহীন কাজে নামমাত্র মজুরিতে কাজ করতে। আর সস্তার এই শ্রমশক্তির প্রতি শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক পুঁজিও জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্পেরও লাভের মূল ভাণ্ডার শ্রমচুরি, যা আজ থেকে দু’শতাব্দী আগে জন্মানো জার্মান লোকটা বলেছিলেন অত্যন্ত কর্কশ ভাষায়, ‘পুঁজিপতির হৃদয় আসলে পুঁজিরই হৃদয়’।

    পুঁজিবাদের স্বর্গরাজ্য এই নয়া ভারতের বিপ্রতীপে আর এক নতুন ভারতও যেন জেগে উঠছে, যার সামনের সারিতে রয়েছেন ছাত্রছাত্রী, যুবকযুবতী এবং শ্রমজীবী নারী ও পুরুষ। এই নতুন প্রতিবাদী ভারতের কোনও কেন্দ্রিকতা নেই, নেই জয়প্রকাশ নারায়ণের মত স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া কোনও সর্বভারতীয় নেতা। সবই বিক্ষিপ্ত, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত। তাই এই প্রতিবাদী দেশের কোনও একমেবদ্বিতীয় নেতাও নেই।

    গত তিন দশকে কংগ্রেসী ও বামপন্থীরা বহুজন সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে উপলব্ধিই করতেই পারেননি, ফলে শ্রেণি ও জাতের বিভাজন ক্রমশ দীর্ঘতরই হয়েছে। অপরদিকে দুর্বল হয়েছে শ্রমজীবীর ন্যূনতম অধিকারের দাবি। ফলে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ধারাবাহিক ভাবে ক্রমশই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে এই দুই রাজনৈতিক শক্তি। এই রাজ্যেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বহুজন সমাজের মানুষেরাই রয়েছেন প্রতিবাদের মুখ হিসেবে, যা অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতির রঙের বাইরে।

    উল্লেখ্য, আমাদের দেশ এখন চলছে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’-এর মধ্য দিয়ে, যা কোনও জাতির জীবনে একবারই আসে, যার অর্থ, জনসংখ্যায় অল্পবয়সিদের প্রাধান্য। সরকারি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত কর্মহীন (এই মুহূর্তে গত পঁয়তাল্লিশ বছরের নিরিখে সর্বাধিক বেকারত্ব) যুবক-যুবতীরাই যেন নেই-এর রাজ্য থেকে বেরিয়ে আজ রাজপথে। এই বিপুল জনরোষে কেরলে আপাত দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বাম এবং কংগ্রেস যৌথমঞ্চে সামিল। দেশের রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে বহুজন সমাজের ভূমিকা তাই নির্ধারণ শক্তি। দেখার, সে তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান বুঝে নেওয়ার জন্য কতটা পথ হাঁটতে পারে।

    লেখক বগুলার শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক।

    (মতামত লেখকের নিজস্ব)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More