করোনা মহামারীতে পালটে যাচ্ছে বিশ্ব, আমরা সতর্ক আছি তো?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ডিসেম্বর মাসে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল, চিনে নাকি কী একরকম ছোঁয়াচে রোগ শুরু হয়েছে। ব্যাপারটাকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ২০২০ সালের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে যাঁরা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি নতুন রোগটাকে। তার এক-দেড় মাসের মধ্যে যা ঘটল, তাকে বিপর্যয় বললে কম বলা হয়। কালবৈশাখীর মেঘের মতো হু হু করে বেড়ে উঠল রোগের প্রকোপ। তার পরিণামে বিশ্ব জুড়ে টালমাটাল। এই মার্চের মাঝামাঝি কলকাতাতেও দিনের ব্যস্ত সময়ে রাস্তাঘাটে ভিড় পাতলা। অনেক অফিস-কাছারী বন্ধ। স্কুলকলেজ, ধর্মস্থান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলোও বন্ধ। এখনও পর্যন্ত করোনাভাইরাস রোগ বিশ্ব জুড়ে প্রায় সাত হাজার প্রাণ নিয়েছে। আরও কত নিয়ে থামবে কে জানে।

    রোগ যতই সাংঘাতিক হোক, বিজ্ঞানীরা নিশ্চয় তাকে নিয়ন্ত্রণে আনবেন। আশা করা হচ্ছে, তার জন্য লাগবে আরও মাসখানেক। কিন্তু মহামারীর জন্য ব্যবসাবাণিজ্যের যা ক্ষতি হচ্ছে, তা কতদিনে সামলে ওঠা যাবে বলা মুশকিল। ইতিমধ্যে বিশ্ব জুড়ে শেয়ার বাজারে চড়চড় করে নামছে সূচক। সেনসেক্স, নিফটি, ডাও জোনস, নিক্কি, সবার এক অবস্থা। বিনিয়োগকারীরা নতুন শেয়ার কিনতে ভয় পাচ্ছেন। যাঁর কাছে যা শেয়ার ধরা আছে, বেচে ফেলতে পারলে বাঁচেন। বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ কমছে। ছোট ও মাঝারি যে শিল্পগুলো বৃহৎ শিল্পের ওপরে নির্ভরশীল, তাদের অবস্থা শোচনীয়। ওই সব জায়গায় কোটি কোটি লোক কাজ করে। তাদের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এমনিতেই দেশে বেকারের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। তার ওপরে যদি বড় সংখ্যক মানুষ কাজ হারায়, অর্থনীতি ঘোরতর সংকটে পড়বে।

    অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক খুব গভীর। দেশে যদি অন্নবস্ত্রের সংকট দেখা যায়, মানুষ সবার আগে শাসককেই দোষ দেবে। তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইবে। এখনই অনেকে বলছেন, আমেরিকায় যেভাবে করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে, তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভোটে জিতে ফেরা মুশকিল হবে।

    ২০১৪ সালে আফ্রিকায় এবোলা রোগের মহামারী হওয়ার পরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আলাদা একটি প্রশাসনিক দফতর খুলেছিলেন। তার কাজ ছিল মহামারী প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ওই দফতরটিকে তুলে দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্যে ব্যয়বরাদ্দও কমিয়েছেন অনেক। ভোটের আগে তাঁকে ওইসব নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে বৈকি।

    চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর অবশ্য ভোটে জিতে আসার দায় নেই। কিন্তু বিপদ আছে অন্যদিকে। তাঁর দেশ থেকেই রোগ ছড়িয়েছে। বিশ্ব জুড়ে নিন্দার মুখে পড়ছে চিন। সেদেশের অনেক শহর লক ডাউন হয়ে আছে। প্রশ্ন উঠছে, পরিস্থিতি এভাবে হাতের বাইরে চলে গেল কীভাবে? সরকার কি আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে পারত না? প্রশাসন ব্যাপারটাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে দেখাতে চায়। কেউ কেউ এমনও বলছেন, আমেরিকা ল্যাবরেটরিতে ওই জীবাণু বানিয়ে চিনে ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানিও তাঁর দেশে করোনা মহামারীর পিছনে ষড়যন্ত্র দেখছেন। কিন্তু মানুষকে সেকথা বিশ্বাস করানো যাবে কিনা বলা শক্ত।

    আগামী কয়েকমাসে বিশ্ব জুড়ে ঠিক কী ঘটবে এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে বড় রকমের উথালপাথাল যে আসন্ন তা অনেকেই বলছেন।

    প্রতিটি প্রজন্মকেই এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। আজ থেকে একশ বছর আগে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গত শতকের চারের দশকটা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই সময় আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও দেশভাগের শিকার হয়েছিল। ছয়-সাতের দশকে ছিল খাদ্য আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন, জরুরি অবস্থা। ন’য়ের দশকের গোড়ায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে দেশ জুড়ে ছড়িয়েছিল হানাহানি।

    আবার যদি অশান্তির সময় আসে, তাহলে সচেতনতাই হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মহামারীর বিপদ ঠেকাতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে কঠোরভাবে। আমরা যদি বারে বারে হাত ধুই, যত্রতত্র থুতু না ফেলি, ভিড়ের জায়গায় না যাই, জ্বর-সর্দিকাশি হলে বিলম্ব না করে ডাক্তার দেখাই, তাহলে বিপদ অনেকটা কমবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More