বুধবার, অক্টোবর ১৬

জল বাড়ছে, কুমীর আসছে, অন্ধকার নামছে! প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকে কী ভাবে বেঁচে ফিরল যুগল!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: জনমানুষহীন প্রত্যন্ত এক দ্বীপে হিংস্র কুমীরেরা ঘিরে ফেলেছিল তাঁদের। মৃত্যু হয়তো আর কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা ছিল। কিন্তু বাঁচিয়ে দিল, সিনেমার পর্দায় দেখা পরিচিত দৃশ্য। সিনেম্যাটিক কায়দাতেই। কাদার উপরে বড় বড় অক্ষরে ‘হেল্প’ লিখেছিলেন তাঁরা। সেই লেখা উদ্ধারকারী দলের চোখে পড়ার কারণেই জীবিত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল তাঁদের।

অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে এক প্রত্যন্ত দ্বীপে বান্ধবী শ্যানটেল জনসনকে নিয়ে সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয় যুবক কোলেন নালগিট। সঙ্গে ছিল তাঁদের পোষা কুকুরছানা এস। তাঁরা কুনুনুরা এলাকার বাসিন্দা। কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার পরে, গত ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কোনও খোঁজ মেলেনি তাঁদের। খবর পেয়েই বিভিন্ন দ্বীপে খোঁজ নিতে শুরু করে উদ্ধারকারী দল। কিন্তু মারালুমের কাছে বরা হোল নামের যে প্রত্যন্ত দ্বীপে তাঁরা ছিলেন, সেখানে পৌঁছননি কোনও উদ্ধারকারী। যদিও গোটা এলাকা আকাশ পথে তল্লাশি চলছিল।

এ দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আতঙ্কে সিঁটিয়ে গিয়েছিল ওই যুগল। কোনও ভাবেই তাঁরা যোগাযোগ করতে পারেননি কারও সঙ্গে। গাড়িও আটকে গিয়েছিল, চার পাশ জলে ঘেরা বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে। শেষমেশ জানাশোনা কায়দাতেই কিছু কাঠ জোগাড় করে আগুন জ্বালান তাঁরা। তার পাশে দ্বীপের মাটি-কাদায় বড় বড় করে লেখেন “HELP”.

“আমাদের গোটা দ্বীপটার চার পাশে থিকথিক করছিল কুমীর। ওরা শিকারের গন্ধ পেয়েছিল কি না জানি না, কিন্তু ক্রমেই ডাঙার দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসছিল। আমরা ভেবেছিলাম, কোনও দিন ফেরা হবে না আর। দেখা হবে না মানুষের মুখ।”– বলেন নালগিট। তিনি জানান, প্রথমটায় গাড়ির ভেতরেই ছিলেন তাঁরা সকলে। কিন্তু ক্রমে জল বাড়তে থাকে দ্বীপে। “গাড়িটা প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। আমরা তাড়াতাড়ি করে, সব জিনিসপত্র নিয়ে একটু দূরে চলে যাই। চুপ করে বসেছিলাম। ভয়ে, ক্লান্তিতে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।”– আতঙ্কের ছাপ এখনও স্পষ্ট শ্যানটেলের গলায়।

কিন্তু তাঁদের রবিবার রাতে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও, তাঁরা না ফেরায় পুলিশে খবর দেন শ্যানটেলের মা। জানান, কোনও ভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না মেয়ের সঙ্গে। তিনি আঁচ করছেন, কোনও বিপদে পড়েছে মেয়ে ও তার প্রেমিক। পুলিশ এ কথা জানার পরেই সক্রিয় হয়। যে এলাকায় গিয়েছিলেন নালগিটরা, সেই এলাকায় উদ্ধারকারী দল পাঠিয়ে দেয়।

খোঁজ মেলেনি প্রথমটায়। কিন্তু হঠাৎই উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার থেকে এক জন দেখেন, একটি দ্বীপ থেকে আগুনের ধোঁয়া উঠছে। খানিক লক্ষ করতেই তাঁর চোখে পড়ে, মাটিতে লিখে সাহায্য চেয়েছেন কেউ। তখনই ওই দলটি নিশ্চিত হয়ে যায়, এই দ্বীপেই আটকে আছে যুগল।

নালগিট জানান, তত ক্ষণে জল আরও বাড়ছে দ্বীপে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। “আমরা ভেবেছিলাম, হয় জলে ধুয়ে যাব নয় কুমীরের পেটে যাব। যেভাবে কুমীরগুলো এগিয়ে আসছিল, আমরা হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। বিশেষ করে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পরে।”– বলেন তিনি। এই সময়েই দেখা মেলে হেলিকপ্টার উড়ছে মাথার ওপর। প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া আশা জ্বলে ওঠে দপ করে। দু’জনেই হাত নাড়তে শুরু করেন। শেষমেশ ভালয় ভালয় উদ্ধার করা হয় তাঁদের।

পুলিশ জানিয়েছে, আগুন জ্বালিয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন ওই তরুণ-তরুণী। সেই সঙ্গে প্রশংসা করেছেন, ওঁরা গন্তব্য এবং ফেরার সময় বাড়িতে জানিয়ে গিয়েছিলেন বলে। সেটা না হলে, এই ঘটনাটি অন্য রকম হতে পারত হয়তো।

নালগিট বলেন, “আমি পুলিশের কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা যে কতটা ভাগ্যবান, সেটা ফেরার পরে বুঝতে পারছি। বুঝতে পারছি, জীবন কতটা দামী এবং সুন্দর!”

Comments are closed.