বৃহস্পতিবার, জুন ২০

জন্মের আগেই মৃত্যু নিশ্চিত! ২৪ সপ্তাহের ভ্রূণের গর্ভপাতের আর্জি নিয়ে আদালতে দম্পতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়ে, তাকে বড় করতে চান সব মা-ই। সেই আশাতেই সন্তান ধারণ করেন মা, সেই সন্তানকে নিজের শরীরে পালন করেন ন’মাস ধরে। কিন্তু সেই সন্তান যদি ‘সুস্থ’ না হয়? জন্মের আগেই যদি নিশ্চিত হয়ে যায় তার মৃত্যু?

এমনটা হলে বোধ হয় কোনও মা-ই চান না সেই ঝুঁকি নিতে। শোকতাপ যতই হোক, মৃত্যুর বার্তা নিয়ে জন্মানো সে সন্তানকে জন্ম দিতে কোনও মা-ই চান না। এমনটা চান না চিকিৎসকেরাও, তা-ই তো তাঁরা সবটা খুলে বলেন হবু মা-বাবাকে। তখন গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন মা-বাবারাই। কিন্তু আইন বলছে ভ্রূণের বয়স ২১ সপ্তাহের বেশি হয়ে গেলে, গর্ভপাত করাতে আদালতের অনুমতি লাগবে।

তাই এমনই অবস্থায় কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন জোধপুর পার্কের বাসিন্দা জয়া গোস্বামী ও তার স্বামী অম্বুজ গোস্বামী। তাঁদের সন্তানের ভ্রূণের বয়স ২৪ সপ্তাহ। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অপর্যাপ্ত বৃদ্ধির কারণে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ না ঘটায়, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও বাঁচানো যাবে না তাকে। এমনকী জন্মানোর আগে মায়ের গর্ভেই মারা যেতে পারে সে। তার ফলে মায়ের জীবন সংশয় ঘটতে পারে। অথচ আইন অনুযায়ী গর্ভপাতের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জয়ার জীবনরক্ষার স্বার্থেই আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে তাঁদের। আবেদন, গর্ভপাতের অনুমতি দিক আদালত।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর এজলাসে মামলাটির শুনানি হলেও আদালত কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি। ওই দিন দম্পতির আইনজীবী অমিতাভ ঘোষ সওয়াল করতে গিয়ে জানান, গত ২৬ ডিসেম্বর সন্তানসম্ভবা মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ওঁদের ডাক্তারবাবু জানিয়ে দিয়েছেন, অবিলম্বে গর্ভপাত প্রয়োজন। এর পরে ৭ জানুয়ারি আর এক জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও একই পরামর্শ দিয়েছেন। এই অবস্থায় আদালত একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে ভ্রূণটি নষ্টের অনুমতি দিক।

সওয়াল শোনার পরে সরকারি কৌঁসুলির মতামত জানতে চান বিচারপতি চক্রবর্তী। আদালতে উপস্থিত অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল অভ্রতোষ মজুমদার কিছু সময় চান। তিনি বলেন, “এসএসকেএমের বিশেষ চিকিৎসকদের পরামর্শ প্রয়োজন। তাই সময় দেওয়া হোক।” এর পরেই বিচারপতি আজ শুক্রবার পর্যন্ত রাজ্য সরকারকে সময় বরাদ্দ করেন। রাজ্যের মতামত শোনার পরে আজ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে আদালত। অম্বুজবাবুকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে শুক্রবারের শুনানিতে।

সূত্রের খবর, চিকিৎসকেরা গর্ভপাতের পরামর্শ দেওয়ার পরে ডিসেম্বরের শেষের দিকে জয়া ও অম্বুজ পিজিতে গিয়ে গর্ভপাত করাতে চান। তখনই আইনি বিধি-নিষেধের কথা উল্লেখ করেন চিকিৎসক৷

তাঁদের আইনজীবী অমিতাভ ঘোষ জানিয়েছেন, গত জুলাইয়ে এ রাজ্যেরই ২৬ সপ্তাহের অন্ত্বঃসত্ত্বা এক বধূকে এমনই ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ ভ্রূণ নষ্ট করার অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। উল্লেখ করেছেন ২০১২ সালে আয়ারল্যান্ডে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সবিতা হালাপ্পানাভারের অকালমৃত্যুর কথাও। সে দেশে বারো সপ্তাহের পর গর্ভপাত করানো আইনত নিষিদ্ধ। তার জেরে ৩১ বছরের সবিতা মারা যান রক্তে সেপ্টিসেমিয়া হয়ে। তিনি ১৭ সপ্তাহের অন্ত্বঃসত্ত্বা ছিলেন, ফলে সমস্যা জানার পরেও অনুমতি পাননি গর্ভপাতের। এর জেরে আয়ারল্যান্ডের গর্ভপাত আইন বড় সমালোচনার মুখে পড়ে। চাপে পড়ে অবশেষে গর্ভপাত নিয়ে নতুন আইন তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিল আয়ারল্যান্ড প্রশাসন। তবে ভারতে, পরিস্থিতি বিচার করে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়ার আইন রয়েছে আগে থেকেই।

বৃহস্পতিবার জয়া ও অম্বুজের মামলা আদালতে উঠলে, বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর এজলাসে দ্রুত মামলাটি শোনার জন্যও বিশেষ করে আবেদন করেন অমিতাভ ঘোষ। তিনি উল্লেখ করেন, দেরি হলে অন্তঃসত্ত্বার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে পারে। এর পরেই আদালত দ্রুত মামলার শুনানির উদ্যোগ নেয়।

পারিবারিক সূত্রের খবর, দ্বিতীয় বারের জন্য গর্ভবতী হয়েছিলেন জয়া। কয়েক বছর আগেও শারীরিক জটিলতার কারণে গর্ভপাত করাতে হয়েছিল ওই তরুণীকে। আবার একই পরিস্থিতি হওয়ায়, সঙ্গে এই সমস্ত আইনি জটিলতায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি।

গর্ভপাতের মতো অন্য বেশ কিছু জটিল শারীরিক সমস্যায় দীর্ঘসূত্রিতা কাটাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে স্থায়ী বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের তরফে। সেই নির্দেশ মেনে এ রাজ্যেও এলাকা বা জেলাভিত্তিক এই ধরনের বোর্ড গঠনের কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য দফতর। স্বাস্থ্য কর্তাদের বক্তব্য, আদালত কোনও নির্দেশ দিলেও, তা দেবে বোর্ডের পরামর্শ মেনেই। তাই সেই বোর্ড গঠনে যাতে বাড়তি সময় অপচয় না হয়, সে দিকে নজর রেখে শীর্ষ আদালত সর্বত্র স্থায়ী বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছে।

শুক্রবার দুপুর একটা নাগাদ মামলাটির দ্বিতীয় শুনানি হয়। বিচারপতি জানান, শনিবার সকাল এগারোটায় ওই বোর্ডের কাছে যেন নিয়ে যাওয়া হয় তরুণীকে। সেখানকার বিশেষজ্ঞদের রিপোর্ট পাওয়ার পরে সোমবার ফের শুনানি হবে এই মামলার।

Comments are closed.