বুধবার, মার্চ ২০

কল্পনা চাওলার মৃত্যুবার্ষিকী: ‘আমি কোনও নির্দিষ্ট দেশের নয়, সৌরজগতের নাগরিক’

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পৃথিবীর মাটি ছুঁতে বাকি ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। তখনই মুহূর্তের বিস্ফোরণে ছাই হয়ে যায় মহাকাশযান। আর তার ভিতরেই অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে শেষ হয়ে যান ভারতের প্রথম মহিলা মহাকাশচারী কল্পনা চাওলা। সারা পৃথিবী তাঁকে এই নামে চিনলেও, তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের আদরের মন্টো। ২০০৩ সালের এই তারিখেই মাত্র ৪২ বছরে শেষ হয়ে যায় তাঁর জীবন।

জীবনের ৩১ দিন মহাকাশেই কাটিয়েছিলেন তিনি। প্রথম সফল অভিযানের পরে, দ্বিতীয় অভিযান শেষে ফেরার সময় তাঁর মৃত্যু ঘটে। কয়েক হাজার মাইল ভ্রমণ করেছেন মহাকাশে। তাই তাঁর মুখেই হয়তো মানায়, “আমি কোনও নির্দিষ্ট দেশের নয়, সৌরজগতের নাগরিক।”

১৯৬১ সালের ১৭ মার্চ হরিয়ানার কার্নালে একটি গোঁড়া পরিবারে জন্মেছিলেন কল্পনা। যে রাজ্যে মেয়েদের জন্মাতে দেওয়া হয় না, জন্মালেও সম্মান রক্ষার্থে খুন হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, যে রাজ্যে মেয়ের সংখ্যা কম হওয়ায় একই মেয়েকে পরিবারের পাঁচ ভাই মিলে বিয়ে করার ঘটনা ঘটে, যে রাজ্যে লিঙ্গ বৈষম্য দেশের মধ্যে সব চেয়ে বেশি, সেই রাজ্যে জন্ম নেওয়া একটা মেয়ের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখাটাই ছিল অলীক কল্পনা। সেই কল্পনাকেই সত্যি করেছিলেন কল্পনা নিজে।

শুধু নিজের জন্য নয়। তাঁর এই স্বপ্ন সফল করার উড়ান সারা দেশেই সামাজিক ভাবে প্রান্তিক করে রাখা মেয়েদের স্বপ্ন দেখার ইচ্ছেটাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন কয়েক ধাপ। তাই তাঁর জন্যই বোধ হয় বলা যায়, ‘স্কাই ইজ় দ্য লিমিট’।

ছোটবেলায় সবেতেই তুখোড় ছিলেন কল্পনা। পড়াশোনায় সব সময় প্রথম দিকেই থাকত নাম। ভালোবাসতেন কবিতা আর নাচ। সাইক্লিং-এ ছিলেন ওস্তাদ। প্রতিটি দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান ছিল তাঁর বাঁধা। ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। হরিয়ানার মতো জায়গায়, সংরক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে উঠেও, চাপা ছিল না তাঁর প্রতিভা ও জেদ।

সেই জেদের জোরেই পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন তিনি। পরে আমেরিকা যান ১৯৮২ সালে। দু’বছর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে মাস্টার অফ সায়েন্স ডিগ্রি পান। আরও চার বছর পরে, ১৯৮৮ সালে নাসায় যোগ দেন। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং চট করে যে কোনও কিছু শিখে নেওয়ার প্রতিভা তাঁকে আরও দক্ষ করে তোলে। পঞ্জাবে স্নাতক স্তর পর্যন্ত পাশ করা কল্পনা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, নাসায় যোগ দিতে হলে যে বিদেশেই পড়াশোনা করতে হবে, তার কোনও মানে নেই।

কয়েক বছরেই স্বীকৃত পাইলট হয়ে ওঠেন কল্পনা। পরে নাসা রিসার্চ সেন্টারে ওভারসেট মেথডসের ভাইস প্রেসিডেন্টও হন। বাণিজ্যিক উড়ান চালানোর অনুমোদন ছিল তাঁর। সামুদ্রিক বিমান এবং মাল্টি-ইঞ্জিনের প্লেন চালানোরও লাইসেন্স ছিল তাঁর। পরে ফ্লাইট ইনস্ট্রাকটরও হয়েছিলেন তিনি।

এর মধ্যেই বিয়ে করেন মার্কিন লেখক জাঁ-পিয়ের হ্যারিসনকে। তিনিই পরে কল্পনা চাওলার জীবনী লেখেন ও প্রকাশ করেন। ১৯৯১ সালে কল্পনা মার্কিন নাগরিকত্ব পেলে নাসার অ্যাস্ট্রোনট কোরের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পান কল্পনা।

এর ছ’বছর পরে পাড়ি দেন প্রথম মহাকাশ অভিযানে। ১৯৯৭ সাল। মহাকাশযান কলম্বিয়া এসটিএস ৮৭-তে মিশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে  ৩৭২ ঘণ্টা মহাকাশে কাটান তিনি। পৃথিবীর কক্ষপথে ২৫২ বার পরিক্রমা করেন। ১০০ লক্ষ মাইলেরও বেশি ভ্রমণ করেন মহাকাশে।

২০০০ সালে কলম্বিয়া এসটিএস ১০৭-এর মহাকাশ অভিযানে ফের মহাকাশে যাওয়ার সুযোগ পান কল্পনা। নানা কারণে পিছিয়ে যাওয়ায় শেষমেশ ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি মহাকাশযাত্রা করেন কল্পনারা। তিনি ছাড়াও আরও ছয় মহাকাশচারী ছিলেন ওই অভিযানে।

১ ফেব্রুয়ারি ফেরার পথে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত পৌঁছেও গেছিল তাঁদের মহাকাশযান। আর কয়েক মিনিটেই হয়তো ছুঁয়ে ফেলতেন পৃথিবীর মাটি। তখনই টেক্সাসের উপরে টুকরো টুকরো হয়ে যায় গোটা মহাকাশযান। সাত জন অভিযাত্রীই মারা যান।

মৃত্যুর পরে বহু সম্মান জুটেছে কল্পনার। তাঁর নামে একটি গ্রহাণু ও একটি উপগ্রহের নামকরণ করা হয়েছে। মঙ্গল গ্রহে কলম্বিয়া হিলস অঞ্চলে একটি পাহাড়েরও নাম রাখা হয়েছে চাওলা হিল। প্রথম আবহাওয়া উপগ্রহের নাম দেওয়া হয় কল্পনা-১। তাঁর নামে একটি সুপার কম্পিউটারও আছে। এ ছাড়াও যে সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েছেন, সেখানকার ডর্মিটরি, প্রবেশপথের নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে। তাঁর নামে চালু হয়েছে বৃত্তি, পদক, সম্মান। তিনি নিজেও বহু মরণোত্তর সম্মান পেয়েছেন।

সৌরজগতের নাগরিক হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়া কল্পনার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল দেশ জুড়ে। আজও ভারতের মহাকাশ চর্চায় তাঁর অবদান ভোলেননি কেউ। তিনি বলেছিলেন–  “তোমরা যখন নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে চেয়ে থাকবে, তখন তোমাদের মনে হবে তোমরা কোনও নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নয়, এই সৌরজগৎ থেকেই এসেছো।”

সৌরজগতের সেই বিশালতার সামনেই ক্রমে ফিকে হয়েছে মানুষের মনে তাঁর অস্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুর শোকেও সময়ের প্রলেপ পড়েছে। তবুু এই বিশেষ দিনগুলোয় জেগে ওঠে তাঁর স্মৃতি। মনে পড়ে, গোটা দেশের মুখ উজ্জ্বল করে তিনি নিজেই বিলীন হয়ে গিয়েছেন নক্ষত্রের দুনিয়ায়।

Shares

Comments are closed.