কেরলই হোক বাকিদের সামনে আদর্শ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    প্রাচীনকালের মুনিঋষিরা একটা কথা বলে গিয়েছেন — ইদমপি কালেন প্রবিলীয়তে। এই সময় থাকবে না। শ্লোকটির অন্তর্নিহিত অর্থ হল, মানুষের সুসময় বা দুঃসময়, কোনটিই স্থায়ী হয় না। সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

    আমাদের গ্রহ এখন ভয়ংকর দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি ১০০ বছর অন্তর এমন হয়। ১৯১৮ সালে এসেছিল স্প্যানিশ ফ্লু অতিমহামারী। তার ১০২ বছরের মাথায় আমরা কোভিড ১৯ অতিমহামারীর কবলে। কিন্তু আপ্তবাক্য মিথ্যা হওয়ার নয়। এই সময়ও থাকবে না। কয়েক বছরের মধ্যেই অতিমহামারীর ছায়া পৃথিবীর ওপর থেকে অপসৃত হবে। আমাদের উত্তরপুরুষরা ইতিহাস বইতে তার কথা পড়বে। বইতে অতি অবশ্যই উল্লেখ থাকবে কেরলের কথা। সারা বিশ্ব যখন করোনাকে সামলাতে হিমসিম, তখন ভারতের দক্ষিণে একটি অঙ্গরাজ্য অর্জন করেছিল বিরাট সাফল্য।

    কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক ৫ মে যে হিসাব দিয়েছে, তাতে দেখা যায়, এযাবৎ কেরলে কোভিড ১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০০ জন। তাঁদের মধ্যে সেরে উঠেছেন ৪৬২ জন। এখনও অসুস্থ আছেন ৩৪ জন। মৃতের সংখ্যা চার।

    অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করলে কেরলের সাফল্যের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মহারাষ্ট্রের। সেখানে করোনা পজিটিভ কেসের সংখ্যা ১৪ হাজার ৫৪১। সেরে উঠেছেন ২৪৬৫ জন। এখনও অসুস্থ ১১ হাজার ৪৯৩ জন। মৃতের সংখ্যা ৫৮৩। গুজরাত, দিল্লি, তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যেও করোনা নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাহলে কেরলে এল কোন জাদুতে। এই রহস্য নিয়ে ইতিমধ্যেই মাথা ঘামাচ্ছেন দেশ-বিদেশের মহামারী বিশেষজ্ঞরা।

    ভারতে প্রথম কোভিড ১৯ রোগী ধরা পড়ে কেরলে। সেখান থেকে তিন ছাত্র গিয়েছিলেন উহানে। চিনের যে শহর থেকে অতিমহামারীর সূচনা হয়েছিল, সেখানেই তাঁরা পড়াশোনা করতেন। উহান থেকেই তিনজন নিয়ে এসেছিলেন করোনা। যে এলাকায় দেশবিদেশের মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করেন, সেখানেই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেরল থেকে অনেক দক্ষ শ্রমিক কাজ করতে যান পশ্চিম এশিয়ার নানা দেশে। তাছাড়া কেরলে আছে ট্যুরিজম হাব। সেখানেও বহু পর্যটক যাতায়াত করেন। ফলে কেরলে ব্যাপক হারে সংক্রমণের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তা হয়নি।

    কেন হয়নি?

    আপাতত কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়।

    কেরলে শিক্ষিতের সংখ্যা অনেক রাজ্যের চেয়ে বেশি। অনেক দিন ধরেই ওই প্রদেশটি পূর্ণস্বাক্ষর। শিক্ষা মানে সচেতনতা। মহামারী ঠেকাতে সচেতনতা একটা বড় হাতিয়ার।

    অতি সম্প্রতি কেরল তিনটি দুর্যোগের কবলে পড়েছিল। দু’বার এসেছিল বিধ্বংসী বন্যা। ২০১৮ সালে হয়েছিল নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ। এই বিপদগুলির সঙ্গে লড়াই করে রাজ্যের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রভূত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের করোনা বিপর্যয়ের মোকাবিলায় সাহায্য করেছে।

    কেরলে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছিল অনেক আগে। সেই জানুয়ারি মাসে। দেশের অন্যান্য অঞ্চল তখন ওই বিপদ সম্পর্কে আদৌ সচেতন হয়নি। তখন থেকেই কেরলে কোভিড ১৯ রোগীকে চিহ্নিত করা, তাঁকে আইসোলেশনে পাঠানো, কীভাবে তাঁর শরীরে রোগটি এল তা খুঁজে বার করা ইত্যাদি শুরু হয়ে গিয়েছিল।

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেন ২৪ মার্চ। কেরলে লকডাউন শুরু হয়েছিল তার আগেই। স্কুল-কলেজ-অফিস সব বন্ধ। যে কোনও জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা।

    কেরলের পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। সামনেই বর্ষাকাল। বন্যার সময়। অনেকের আশঙ্কা, বর্ষার সুযোগে দ্বিতীয়বার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে করোনাভাইরাস। ঈশ্বরের আপন দেশ বলে পরিচিত কেরল একইসঙ্গে বন্যা আর মহামারীর মোকাবিলা করতে পারবে কি?

    কেরল থেকে যাঁরা বিদেশে কাজ করতে গিয়েছেন, তাঁরা ফিরবেন শীঘ্র। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ থাকতেই পারেন করোনা পজিটিভ। তাঁদের ঠিকমতো চিহ্নিত করা এবং আইসোলেশনে পাঠানো খুব জরুরি। না হলে গত কয়েক মাসে অর্জিত সাফল্য নষ্ট হয়ে যাবে।

    আগামী দিনে হয়তো আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে কেরলকে। কিন্তু পরীক্ষার প্রথম দফায় সে সসম্মানে উত্তীর্ণ। তাই বা কম কী। তার থেকে বাকি দেশের শিক্ষা নেওয়া উচিত। অনেক ধনী দেশও এখনও প্যানডেমিককে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ভারতের মতো গরিব দেশের ওই রাজ্যটি তাদেরও প্রেরণা দিতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More