এক দিনের আশ্চর্য দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে এবছর ভিড় নেই ধেনুয়া গ্রামে

এ এক আশ্চর্য পুজো। নিয়ম মেনে দেবীপক্ষের চার দিন নয়, দুর্গতিনাশিনী এই গ্রামে মাত্র একদিনের অতিথি। ব্যতিক্রমী এই পুজোতেও এবছর করোনার ছোবল৷ জৌলুস হারিয়েছে ধেনুয়া গ্রামের কুমারী দুর্গাপুজো।

৩৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো,পশ্চিম বর্ধমান: পঞ্জিকা মতে এবারের দুর্গাপুজো মহালয়ার ১ মাস ৫ দিন পরে। ২২ অক্টোবর মহাষষ্ঠী। অবশ্য আসানসোলের হিরাপুর থানার বার্নপুরের ধেনুয়া গ্রামের নিয়ম অন্যরকম। পিতৃতর্পণ শেষে মহালয়ার দিনই এই গ্রামের মাটিতে সাড়ম্বরে পা রাখেন দেবী, কিন্তু মাত্র একদিনের জন্য। সেইদিক থেকে একবেলার এই দুর্গাপুজো বাংলার অন্যান্য পুজোর থেকে একবারে ভিন্নরূপের।

করোনা পরিস্থিতির কথা মাথার রেখে পুরনো রীতিরেওয়াজের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বৃহস্পতিবার ১৭ই সেপ্টেম্বর মহালয়ার সকাল থেকে শুরু হয়ে গেল দেবীর এই বিশেষ পুজো। সাতসকালে নবপত্রিকা বা কলাবউ স্নানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় মহাসপ্তমীর পুজো। তারপর একে একে নিয়ম মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে মহাষ্টমী ও মহানবমীর পুজো। সবশেষে অপরাজিতা পুজো দিয়ে শেষ হল দশমীর বিধিবিহিত অর্চনা।

হীরাপুর থানার অন্তর্গত ধেনুয়া গ্রামে প্রতিবছর এই মহালয়ার দিনেই কুমারী মহামায়া রূপে পূজিতা হন দেবী। গত ৪৭ বছর ধরে এই বিশেষ দুর্গা পূজার আয়োজন হয়ে আসছে। ভাদ্র মাসের অমাবস্যা তিথিতে অর্থাৎ পিতৃপক্ষের সমাপ্তির দিন হয় এই বিশেষ পুজো। একদিনের এই অকালবোধন দুর্গাপূজা দেখতে প্রতিবছরই দূর দূরান্ত থেকে ভিড় করে আসেন দর্শনার্থীরা।

এই বছর ধেনুয়া গ্রামের পুজোয় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছেন হিরাপুর থানার আশিস কুমার ঠাকুর। তার কাছ থেকেই জানা গেলো প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো এই পুজোর বেশ কিছু অজানা ইতিহাস। ইংরাজি ১৯৭৩ সাল নাগাদ ধেনুয়া গ্রামে এই দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল কালীকৃষ্ণ সরস্বতী ঠাকুরের হাত ধরে। গ্রামে আজও তাঁর স্বহস্তে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণা কালীর মন্দির ও মহাদেবের মন্দির আছে। কালীকৃষ্ণ সরস্বতী ঠাকুর মারা যাওয়ার পরে, এই গ্রামেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

তবে, প্রথম বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কোনও এক অজানা কারণে প্রায় তিন বছর বন্ধ ছিল এই পুজো। ১৯৭৭ সালে আসাম থেকে ফিরে এসে তেজানন্দ ব্রহ্মচারীর উদ্যোগে আবার নতুন করে শুরু হয় এই পুজো। ২০০৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে গৌড়িয় কেদারনাথ মন্দির কমিটির নেতৃত্বে মন্দির সংলগ্ন আশ্রমে পূজার আয়োজন করা হয়।

আশিসবাবু বলেন, দুর্গা এখানে সপরিবারে আসেন না৷ অর্থাৎ মা দুর্গার সঙ্গে তার চার ছেলেমেয়ে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ এখানে নেই। এমনকি থাকেন না মহিষাসুরও। মায়ের মূর্তির দুপাশে বিরাজমান কেবল তার দুই সখী জয়া ও বিজয়া।মায়ের সঙ্গে একত্রে পূজিত হন তারা। প্রশ্নের উত্তরে আশিসবাবু বলেন, মূলত বৈষ্ণবতন্ত্র মতে এই পুজো হয়ে আসছে। ঠিক যেমনটি বহুবছর আগে কালীকৃষ্ণ সরস্বতী ঠাকুর শুরু করেছিলেন, তার বিশেষ ব্যতিক্রম হয়নি। বৈষ্ণব মতে পুজো, তাই দেবীর আরাধনায় কোনও বলি হয় না এখানে।

মা দুর্গা কুমারী রূপে পূজিত হয় এই গ্রামে। দেবী মূর্তির এই আদল পূর্ববঙ্গে, অধুনা বাংলাদেশে দেখা গেলেও এ বঙ্গে বেশ অভিনব। অবশ্য কালীকৃষ্ণ ব্রহ্মচারীর আমলে মা না কি সিংহবাহিনীরূপেই পূজিত হতেন। তিনবছর পুজো বন্ধ থাকার পর আসামের তেজানন্দ মহারাজ মা’কে কুমারীরূপে প্রতিষ্ঠা করে পূজো শুরু করেন। তেজানন্দ ব্রহ্মচারীর আমলে বিভিন্ন এলাকার ২১ জন কুমারী মেয়েকে বেছে নিয়ে তাদের আলাদা আলাদা পুজোর আয়োজন করা হত।

নির্ধারিত চারদিনের বদলে এমন আগেভাগে মহালয়ার দিন কেন এই একদিনের দুর্গাপুজো, তা অবশ্য জানেন না পুজোর দায়িত্বে থাকা আশিসবাবু নিজেও। গ্রামের বাসিন্দারাও এ ব্যাপারে বিশেষ কিছুই বলতে পারলেন না। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আশিসবাবু বলেন, এর অন্তর্নিহিত রহস্য আমাদেরও জানা নেই। হতে পারে পুজো শুরুর আগে এ ব্যাপারে মায়ের কোনও স্বপ্নাদেশ ছিল।

গ্রামের মানুষের মতে মহালয়ার দিনে এই একদিনের দুর্গাপুজোও যেন নতুনভাবে দেবীর অকালবোধন। প্রতিবছর মহালয়ার দিনে ধেনুয়া গ্রামে অকালবোধন হয় দুর্গতিনাশিনীর। এই পুজোর হাত ধরেই যেন বাংলা জুড়ে শারদীয়া দুর্গোৎসবের সূচনা হয়।অবশ্য এই বছর পিতৃপক্ষের অবসান হলেও শারদীয় দেবী আরাধনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে একটা গোটা মাস। আশ্বিন মাস মলমাস হবার কারণে এই বছর দূর্গাপূজা হবে কার্তিক মাসে। তার উপর করোনা আতঙ্ক আর কিছুদিন আগে শেষ হওয়া দীর্ঘ লকডাউনের কুফল তো আছেই। ফলে জৌলুস হারিয়েছে একদিনের এই বিশেষ দুর্গাপুজোও। সেবাইত কৃষ্ণচন্দ্রবাবু যেমন বলেন, করোনা আবহে এবছর পুজোয় দর্শনার্থীদের ভিড় কমানো হয়েছে। শুধু পুজো ও মায়ের সামান্য ভোগ বিতরণ করা হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More