পুজো করতে গিয়ে রোজ ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে পুরোহিতদের ফুসফুস! ধূপ-ধুনোর ধোঁয়া যেন নিঃশব্দ ঘাতক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়ার ব্যুরো: সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, এ তথ্য এখন বোধ হয় সকলেই জানেন। সিগারেটের প্যাকেটে বাধ্যতামূলক ভাবে সতর্কবার্তা ও ছবিও দেওয়া থাকে এই বিষয়ে। কিন্তু আপনার ফুসফুসকে ঝাঁঝরা করে দিতে সিগারেটের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে ক্ষতি করে যাচ্ছে আরও একটি আপাত-নিরীহ জিনিস, তা কি আপনি জানতেন?

    এই দুর্গাপুজোর মরসুমে সে জিনিসের নাম ফের উঠে এসেছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক এবং পাবলিক হেল্থ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার একটি যৌথ সমীক্ষায়। এবং পাশাপাশি এ-ও জানা গিয়েছে, যে সে জিনিসটির কারণে এ দেশের বেশির ভাগ পুরোহিত ভুগছেন ফুসফুসের অসুখে। কারণ তাঁরাই তো সব চেয়ে বেশি করে গিলে খান ধূপ-ধুনোর ধোঁয়া! হ্যাঁ, এই ধূপ-ধুনোর ধোঁয়াই কিন্তু নিঃশব্দ ঘাতকের মতো ঝাঁঝরা করে চলেছে বহু মানুষের ফুসফুস।

    গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ স্টাডি করে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যের ৫০০ জন পুরোহিতকে নিয়ে সমীক্ষা করে জানা গিয়েছে, যে মন্দিরে ধূপের সংখ্যা যত বেশি, সেখানে ধোঁয়ায় তত বিপদ বাড়াচ্ছে পুরোহিতদের। কারণ ধূপ থেকে নির্গত কার্বন-মোনো-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং ক্ষতিকারক মোনো-নাইট্রেট দিনের পর দিন শরীরে প্রবেশ করতে করতে সিওপিডি–‌র (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ) মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে।

    এই সমীক্ষা ও তার রিপোর্টের পরে, ধূপের বাক্সেও সিগারেটের মতো সতর্কীকরণ বার্তা দেওয়া যেতে পারে কিনা, তা নিয়ে সরকারি স্তরে ভাবনাচিন্তা চলছে। কারণ যাঁরা কোনও দিনও ধূমপান করেননি, এ রকম বেশির ভাগ পুরোহিতের ফুসফুস পরীক্ষা করে ৭০ শতাংশ সিওপিডি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ পাওয়া গেছে। যার মূল কারণ ধূপ-ধুনোর ধোঁয়া।
    এই সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা বলছেন, একটি মশার ধূপ জ্বালিয়ে ঘুমোনো মানে দিনে ১০০টি সিগারেট খাওয়ার সমান। এবং ঘুপচি মন্দিরের ভিতরে ধূপকাঠির ধোঁয়া দীর্ঘ সময় ধরে গ্রহণ করলে, তা ৫০০ সিগারেট খাওয়ার সমান।

    ফলে সাধারণ মানুষের পুজোর জন্য, মানুষের কথা ঈশ্বরকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যাঁদের পুজোর সময়ে শ্বাস ফেলার ফুরসৎ নেই, তাঁদেরই ফুসফুস জ্বলে-পুড়ে ছারখার! স্টাডি বলছে, এই ধূপের ধোঁয়া আবার একই রকম ভাবে সকলের ফুসফুস খায়নি। কেস হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে উঠে এসেছে, নানা রকম ভয়ঙ্কর সব তথ্য। যে সমস্ত মন্দিরে ধূপের সংখ্যা যত বেশি, ধোঁয়া যত জমাট, সেখানেই কার্যত মৃত্যুর মুখে পুরোহিতরা। ধূপের ক্ষতিকর গ্যাস দিনের পর দিন ধরে শরীরে প্রবেশ করতে থাকলে হাঁপানি এবং সিওপিডি-এর মতো রোগের প্রকোপ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।

    সমীক্ষা বলছে, দেশের মধ্যে উত্তরপ্রদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ– এই দুই রাজ্যই আপাতত সিওপিডির কবলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। এ রাজ্যে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি হলেও বায়ূদূষণে পশ্চিমবঙ্গকে পিছনে ফেলে দিয়েছে উত্তরপ্রদেশ। তবে নতুন সমীক্ষার তথ্য বলছে, সিওপিডি হয়েছে এমন ৩৫০০ লোকের মধ্যে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখা গিয়েছে, এঁদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ কখনও ধূমপানই করেননি।

    চিকিৎসকেরা বলছেন, ফুসফুসের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারানোর অসুখের নাম সিওপিডি। ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজে শুধু যে ফুসফুস কালো হয়ে যায় তাই নয়, বড় হয়ে যায় হার্টও। এবং এই অসুখ এখন মহামারীর আকার নিচ্ছে। এইচআইভি, এইডস, ম্যালেরিয়ার থেকেও মারাত্মক আকার নিয়েছে সিওপিডি।

    পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে প্রতি বছর ৫২ হাজার ব্যক্তির মৃত্যু হয় এইডসে। সেখানে সিওপিডিতে মৃত্যুর সংখ্যা ন’লক্ষেরও বেশি। অথচ শহরতলি বা গ্রামের অনেক মানুষ এখনও এই অসুখের নামই শোনেননি। তাই চিকিৎসকের কাছেও যাননি। সে সংখ্যাটাও চমকে দেওয়ার মতোই। সমীক্ষা বলছে, গ্রামাঞ্চলের শতকরা ৯৯.১৫ শতাংশ মানুষ জানেনই না সিওপিডি কী।

    ফলে সিওপিডি-র বিস্তারিত প্রচার ও তাকে রোখার জন্য সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে সরকারি স্তরে। মানুষকে রোগ সম্পর্কে সচেতন না করতে পারলে, সে রোগের চিকিৎসাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে– এমনটাই মনে করছেন চিকিৎসকেরা। ধূপ-ধুনোর মতো নিরীহ ও ভক্তিমূলক জিনিসের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করাটা যে খুব সহজ হবে না, সেটাও ভেবে দেখার বিষয় বলে মনে করছেন অনেকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More