নতুন বছরেও কি আমরা কেবল হিন্দু-মুসলমান করে যাব?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    প্রবল ঠান্ডা ও কুয়াশার মধ্যে আর একটা নতুন বছর উপস্থিত। পুরানো বছরে কী পেলাম আর কী হারালাম সেই হিসাব কষে মনখারাপ করা বৃথা। বরং নতুন বছরটা কেমন হতে চলেছে, তা নিয়ে চর্চা করা ভাল। ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকা যাবে।

    ২০২০ সাল নিয়ে নাকি সাংঘাতিক সব ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন নস্ত্রাদামুস। ষোড়শ শতকে ফরাসি দেশে জন্ম তাঁর। জ্যোতিষচর্চা করতেন। চিকিৎসাবিদ্যা জানতেন। ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত বই, ‘লা প্রফেটিস’। যাতে লেখা আছে আগামী দিনের অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার কথা।

    তিনি ভবিষ্যতের কথা শুনিয়েছেন হেঁয়ালির ছন্দে। ২০২০ সাল নিয়ে তাঁর বইতে লেখা আছে —

    ঈশ্বরের নগরীতে ধেয়ে আসবে বিরাট ঝঞ্ঝা/ বিরাট নৈরাজ্যে ছিন্নভিন্ন হবে দুই ভাই/ রক্ষা পাবে শুধু এক দুর্গ/ মারা পড়বেন সর্বোচ্চ নেতা/ নগরী যখন জ্বলবে, তখনই শুরু হবে তৃতীয়বারের যুদ্ধ…

    নস্ত্রাদামুসকে নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা বলছেন, এর অর্থ, আমাদের সামনে ঘনিয়ে আসছে ভয়ংকর বিপদ। নতুন বছরে শুরু হতে চলেছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। চলবে ২৭ বছর ধরে।

    ‘লা প্রফেটিস’ বইতে আরও নাকি লেখা আছে, ২০২০-তে গুপ্তঘাতকের হাতে মারা পড়বেন ভ্লাদিমির পুতিন। ডোনাল্ড ট্রাম্প রহস্যময় অসুখে আক্রান্ত হবেন। বিরাট বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে সারা বিশ্ব। ইংল্যান্ডে নতুন রাজার অভিষেক হবে। ক্যাথলিক চার্চে নতুন পোপ নিযুক্ত হবেন। ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পে তছনছ হবে উত্তর আমেরিকা।

    নস্ত্রাদামুস থাক। ২০২০ সালে এমনিতেই অনেক বড় ঘটনা ঘটবে বলে স্থির হয়ে আছে। তাদের প্রভাব পড়বে বিশ্ব জুড়ে। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে ৩ নভেম্বর। সেই দিনটা হবে মঙ্গলবার। মার্কিন নাগরিকরা স্থির করবেন ট্রাম্পকেই কি ফের দেশ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হবে? নাকি তাঁর জায়গায় আসবেন অন্য কেউ। আমেরিকায় যদি পালাবদল হয়, তবে বদলে যাবে তার বিদেশনীতি, বাণিজ্যনীতি।

    নতুন বছরে আরও অনেকগুলো রাষ্ট্রে ভোট হওয়ার কথা। তার মধ্যে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম দেশ শ্রীলঙ্কা। সেখানে রাজনীতিকদের মধ্যে ভারতের বন্ধুরা যেমন আছেন, তেমন আছেন শত্রুরাও। শত্রুরা চিনের ঘনিষ্ঠ। কারা ক্ষমতায় আসে, সেদিকে নজর থাকবে দিল্লির।

    ৯ অগস্ট অলিম্পিকস শুরু হবে টোকিওতে। ১৯৬৪ সালে প্রথমবার জাপানে হয়েছিল সামার অলিম্পিকস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় তথা হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বিস্ফোরণের পরে জাপান অত বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা করার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে কিনা তা নিয়ে বহু লোকের সন্দেহ ছিল। কিন্তু অলিম্পিকসের প্রতিটি ইভেন্ট সম্পন্ন হয়েছিল সুচারুভাবে। ওই সময়েই জাপানে চালু হয়েছিল বুলেট ট্রেন। রেলগাড়ি এত জোরে যেতে পারে? দেখে অনেকের তাক লেগে গেল।

    ২০২০-র অলিম্পিকের জন্যও কি জাপানিরা আস্তিনে লুকিয়ে রেখেছে কোনও চমক?

    অগস্ট মাস আসুক। তখনই বোঝা যাবে।

    বিজ্ঞানের দিক থেকেও স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে নতুন বছর। এই বছরে সবার লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহের দিকে। আমেরিকা আর রাশিয়া, উভয়েই মহাকাশযান পাঠাবে লাল গ্রহের পাথর সংগ্রহ করে আনার জন্য। পিছিয়ে থাকবে না চিনও। ২০১৯-এ জানা গিয়েছে, আমাদের মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রে আছে এক রাক্ষুসে ব্ল্যাক হোল। নতুন বছরে সেই ‘সুপার ম্যাসিভ’ কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য জানাবে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ। অনেকদিন ধরে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন, কৃত্রিম উপায়ে যাতে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে দূর করা যায়। সত্যি পারলে দূষণের সমস্যা প্রায় দূর হয়ে যাবে। এই নিয়ে গবেষণা কতদূর এগিয়েছে তার ওপর ২০২০ সালেই রিপোর্ট প্রকাশ করবে রাষ্ট্রপুঞ্জ।

    ২০২০ সালেই চিন মহাকাশে পাঠাবে ম্যান মেড মুন। ইলেকট্রিসিটির খরচ বানাতে চিনা বিজ্ঞানীরা বানিয়েছেন নকল চাঁদ। তাতে প্রতিটি রাতই হয়ে উঠবে পূর্ণিমার মতো আলোকিত।

    নতুন বছরে ভারতে কী ঘটবে?

    ইসরো ঠিক করেছে মহাকাশযান পাঠাবে সূর্যের দিকে। চাঁদের উদ্দেশেও অভিযান হবে নতুন উদ্যমে।

    এর পাশাপাশি তৈরি হবে রামমন্দির। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ঝাড়খণ্ডের পাকুড়ে নির্বাচনী সভা করতে গিয়ে অমিত শাহ বলেছিলেন, আগামী চার মাসের মধ্যে অযোধ্যায় আকাশছোঁয়া রামমন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হবে। সেইমতো মার্চ-এপ্রিল নাগাদ শুরু হওয়ার কথা।

    ২০১৯-এর শেষটা কাটল বড় অশান্তিতে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে অনেকের ঘোর আপত্তি। তারা বলছে, এই আইন সংখ্যালঘুদের বিরোধী। শুধু বলে ক্ষান্ত হয়নি, অনেকে রাস্তায় নেমে বাস পুড়িয়েছে, ট্রেন পুড়িয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। লোকসভা ভোটে বিজেপি একাই ৩০৩ আসন পাওয়ার পরে বিরোধীরা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা অশান্তির পরিবেশে চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন।

    সরকারও দমননীতির আশ্রয় নিয়েছে। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ খোলাখুলি বদলা নেওয়ার কথা বলেছেন। আমাদের রাজ্যে বিজেপি এখনও ক্ষমতায় আসেনি, এর মধ্যে দিলীপ ঘোষ বুক বাজিয়ে বলছেন, অসম, উত্তরপ্রদেশ, কর্নাটকের মতো সারা দেশে বিরোধীদের লাশ গুনতে হবে।

    গত বছর আর্থিক বিকাশের হার কমে হয়েছে ৪.৫ শতাংশ, বেকারত্ব বাড়তে বাড়তে দাঁড়িয়েছে ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, পিঁয়াজের দাম কয়েক মাসের চেষ্টাতেও আয়ত্বের মধ্যে আনা যায়নি। তার ওপরে পাঁচটি রাজ্য থেকে বিদায় নিয়েছে বিজেপি। বিপাকে পড়ে সরকারের মনোভাব আরও উগ্র হয়ে উঠেছে।

    ২০২০ -তেই দিল্লি ও বিহারের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। বিজেপি হাঁটছে মেরুকরণের পথেই। অমিত শাহ কিছুদিন আগেই ‘আলিয়া-মালিয়া-জামিলিয়া’ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তাতে সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।

    আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে রাজনীতির ভাষা বদলে গিয়েছে। আগে ভোটের ইস্যু হত উন্নয়ন, বন্ধ কলকারখানা খোলা অথবা ক্ষমতাশালী রাজনীতিকদের দুর্নীতি। এখন কেবলই ঘুরে ফিরে আসে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ। প্রতিটি ইস্যুতে সেই দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ঘটে।

    নতুন বছরে কি ছবিটা খুব একটা বদলাবে। সম্ভাবনা কম। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি সহজে থামার নয়। আসলে আমাদের মনের ভিতরেই রয়ে গিয়েছে অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ। একশ্রেণির রাজনীতিক সেই সুযোগটা নিচ্ছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More