সোমবার, এপ্রিল ২২

খরা কাটিয়ে ফিরে এলেন ‘ঈশ্বর’

অরিন্দম মুখোপাধ্যায় 

পৃথিবী ধ্বংস হতে শুরু করেছে। মানুষ, মানুষের খুন পিপাসী। গাছপালা কাটার প্রবণতা বাড়ছে। খরা-বন্যার প্রকোপ প্রতি বছর দেখা দিচ্ছে। গাড়ির কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং গলিয়ে দিচ্ছে হিমবাহদের। ধর্মের নামে হানাহানি, খুনোখুনি চলছে রোজ। একে অপরকে ছোটো করার এক অদ্ভুত তৃষ্ণা জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। সংকটে মানবতা। অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে পড়ে থাকা রোগীকে ফেলে মানুষ চলে যাচ্ছে পাশ কাটিয়ে। জেরার ভয়ে। পুলিশ সাহায্যের আগে অনুদান চাইছে। প্রত্যেক  কলেজে সিট থাকা সত্ত্বেও পিছন দরজা দিয়ে ভর্ত্তি চলছে রমরমিয়ে। অনেক চিকিৎসকের চেম্বারের আলমারিতে ভুয়ো সার্টিফিকেট। মধ্যপ্রাচ্যে হত্যালীলা চলছে। শিশুদের রাইফেল চালানো শেখানো হচ্ছে। মৃত শিশুর ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে শ্রেষ্ঠ ছবির তকমা পাচ্ছে। গরু ‘মা’ বলে আর ময়ূর ‘পবিত্র’ বলে পূজিত হচ্ছেন আর। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ভ্রমণ করছেন। ট্র‍াম্প সাহেব হোয়াইট হাউসে বসে ব্ল্যাক ম্যাজিক দেখিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে কলিযুগের শেষ সীমার দিগন্তে এসে হাজির হয়েছি আমরা।

এ সবের মধ্যে হঠাৎই ঈশ্বর ফিরে তাকান। পাঠান এক দেবদূতকে। যে এই ধ্বংস হতে থাকা পৃথিবীর বুকে সৌন্দর্যের আগুন জ্বালে। সবুজ গালিচায় যে লিখে যায় প্রতিদিন প্রেমের কবিতা। প্রতি রাতে বহু দূরে থেকেও যে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দেয় গরমের দাবদাহে। যার এক একটা দৌড় গাড়ির কালো ধোঁয়া সরিয়ে ছড়িয়ে দেয় গোলাপের সৌরভ। যার এক একটা ড্রিবল গ্লোবাল ওয়ার্মিং কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বইয়ে দেয় হিমেল হাওয়া। যার এক একটা টাচ ভুলিয়ে দেয় দৈনন্দিন জীবনের জটিলতা। প্রতিটা শট যখন গোল পোস্টে আছড়ে পড়ে তখন যেন যুদ্ধকামান গুলোও মাথা নোয়ায় তাঁর সামনে। তিনি মন ভাঙা প্রেমিককে আবার প্রেমে ডোবান। তিনি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষদের রাত জাগান। তিনি মুহূর্তে মিটিয়ে দেন ঝগড়া। তিনি বন্ধু হয়ে পাশে থাকেন প্রতিটা মন খারাপের মুহূর্তে।

যার জন্য যুদ্ধে ডোবা কোনো এক ইরাকি শিশু প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগকে জার্সি বানিয়ে ফুটবলে মজে থাকে। যার জন্য জেলের কয়েদীরা ফুটবলে জীবন ফিরে পায়।  যার জন্য রোমের পোপ ও প্রার্থনা করেন। যার জন্য কোটি কোটি মানুষ ফেলে কান্নার জল। যার জন্য গোটা বিশ্ব ফেলে আনন্দাশ্রু।

তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রেমের বাণী। তিনি শক্তির বিরুদ্ধে শিল্পের বাহক। তিনি বাস্তবতার বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া ম্যাজিক। তিনি গদ্যময় জীবনে এক চিলতে কবিতা। তিনি সুনামীর বিরুদ্ধে ভালবাসার মোহনা। তিনি গ্রীষ্মের দাবদাহে ঝরে পড়া তুষারপাত। তিনি ধোঁয়াশা ভরা বাস্তবতায় গন্ধরাজ ফুল। তিনি দম বন্ধ করা পরিবেশে বয়ে যাওয়া দক্ষিণা বাতাস। তিনি রাত জাগা একাকীত্বের সাথী। তিনি মনখারাপের উঠোনে বব ডিলানের গান। তিনি  অমাবস্যার বিরুদ্ধে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না। তিনি উত্তপ্ত দুপুরের মাঝে লালচে গোধূলি।

তিনি কোটি কোটি  মানুষের স্বপ্ন। আবার শতকোটির কাছে দুঃস্বপ্ন। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেন। ফিরে আসেন। শতকোটি মানুষের স্বপ্ন নিজের কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলেন সেই সোনালি রমণীকে একবার ছুঁয়ে দেখার আশায়। ফুটবলের শ্রেষ্ঠ প্রেমিকের অপেক্ষায় সে এখন দিন গুনছে স্তালিনের দেশে।

কয়েক ঘণ্টা আগেও আমি দেখতে পাচ্ছিলাম –  স্বপ্নগুলো ডানা মেলছে না আর। উড়তে উড়তে  সীমানা পেরিয়ে যেতে যেতে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে । নীল-সাদা আকাশ ধীরে ধীরে সোনালি থেকে কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। আর তার মাঝে মাথা নীচু করে বসে আছে সেই রোজারিওর বাচ্চা ছেলেটা। সে দেখতে পাচ্ছিল এক বিরাট সফল ফুটবলারকে। যে, চাপের বোঝায় কাহিল হয়ে পড়েছে। সেই অনাবিল হাসি, পড়ে গিয়েও উঠে পড়ে কাটিয়ে নেওয়ার নেশাটা যেন নেই।

কিন্তু কাল যখন সেই তোমার প্রতি অন্ধ ছেলেটা আবার দেখল তোমায়, সে দেখতে পেল সেই বাচ্চা ছেলেটাকে। সেই পুরনো কিছু টাচ, সেই  প্রাণভরে খেলা, জেতা-হারা সব ভুলে গিয়ে প্রাণভরে শুধু ভালো খেলা। তার সাথে যোগ হলো ৩১-এর লিওর পরিণতবোধ। যে শুধু খেলেই নিজের দায়িত্ব ভুলে যায় না। যে অন্যদের বোঝায়। সামলায় তাদের। তাইতো থাই দিয়ে অসাধারণ রিসিভ, তারপর বাঁ পায়ের টোকা দিয়ে বলটা নিয়ে ডান পায়ে দুরন্ত শটে গোল করে তাকে গ্যালারির দিকে ছুটে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে আকাশের দিকে হাত তুলে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। যেন বার্তা দেয় সে আছে, কিন্তু আবার খেলার শেষ মুহূর্তে রোহোর জয়সূচক গোলের পর বাচ্চাদের মতো ছুটে গিয়ে তার কাঁধে উঠে পড়ে। ছোট্ট ছেলের মতো মেতে ওঠে আনন্দে। এটাই তো আমার লিও। আমাদের লিও। সেই পুরনো লিও। যে সবকিছু ভুলে নিজেকে শুধু সঁপে দেয় খেলার মধ্যে। আর তার সাথে জেগে ওঠে গোটা দল। তবে সে জানে যে একটা পরীক্ষা শেষ হলো সবে, আর আরেকটার দিকে পা এগোলো তার।

তুমি বলেই পারবে। আর যদি না পারো? তালে আর কী হবে? আমরা আবার কাঁদবো। নিন্দুকরা ঠাট্টা করবে। কিন্তু রোজারিওর সেই বাচ্চাটা হেরে যাবে। যে তোমায় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলো। প্রতিদিন ইঞ্জেকশান নিয়েও, নিজের থেকে দশগুণ বড়ো চেহারার ডিফেন্ডারকে মাটিতে ফেলার জন্য অন্যদের থেকে দশগুণ বেশী খাটা সেই লাজুক ছেলেটা হেরে যাবে আবার। আর হেরে যাবে সেই ছেলেটা যে, স্পেনের নাগরিকত্ব প্রত্যাখান করে নিজের দেশকে বেছে নিয়েছিলো। কারণ ইতিহাস ত্যাগের থেকে হারকেই বেশী গুরুত্ব দিয়ে এসেছে বার বার। তোমার ক্ষেত্রেও তাই তার ব্যতিক্রম হবে না। আর আজকের সব ভালোবাসা আবার মুহূর্তে বদলে যাবে অপমানে…

আর কিছু বলছি না তাই, বাকিটুকু না  বলাই থাকুক না হয়।  রোজারিওর সেই বাচ্চা ছেলেটা আবার হেরে গেলে তুমি কি খুশি হতে পারবে?  উত্তরটা জানার জন্য তাকিয়ে থাকব তোমার দিকে। সেই একইভাবে। চোখের পাতা না ফেলে।

(লেখক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র)

Shares

Leave A Reply