TheWall

পশ্চিমবঙ্গ কি রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকে এগোচ্ছে? এই সংঘাতের শেষ কোথায়? 

0

শঙ্খদীপ দাস

সংসদের দুই সভায় নাগরিকত্ব সংশোধন বিল পাশ হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে তাতে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। তার পর রাত কাটতেই পরদিন তথা শুক্রবার দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলায় নাগরিকত্ব আইনের বাস্তব প্রয়োগ করতে দেবেন না। এও বলেছেন, কেন্দ্র আইন করতেই পারে, কিন্তু রাজ্যে তা বলবৎ হবে কিনা তা ঠিক করবে রাজ্য সরকারই।

অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতি কখনও হয়নি তা নয়। তবে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ ঠোকাঠুকি রাজনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু শনিবার আরও এক কদম এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে বিজ্ঞাপন দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মানুষকে আশ্বস্ত করতে চেয়ে বলেছেন, বাংলায় নাগরিকত্ব আইনের বাস্তবায়ন হবে না। যে ভিডিও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে প্রচার করা হচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একই টেবিলে বসে রয়েছেন রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা-সহ শীর্ষ পুলিশকর্তারা।

প্রশ্ন হল, সরকারি ভাবে এ কথা কি বলা যায়? কেন্দ্র আইন পাশ করবে, রাজ্য বলবে মানব না-যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এই সাংবিধানিক অধিকার কি রাজ্যের রয়েছে? যদি না থাকে, তা হলে সরকারের তরফে এই ধরনের বিজ্ঞাপন সাংবিধানিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করা নয় কি? এই সংঘাতের শেষ কোথায়?

অনেকেই বলতে পারেন, কেরল, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশের শাসক দলও তো বলেছে সেখানে নাগরিকত্ব আইনের বাস্তবায়ন করা হবে না। ঠিক কথা। তারা একথা বলেছেন। কিন্তু সেটা এখনও পর্যন্ত রাজনৈতিক মন্তব্য বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, ওই তিন সরকার এখনও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে বা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেনি যে তারা নাগরিকত্ব আইনের বাস্তবায়ন করবে না। এবং এও ঠিক যে, সংসদে সংখ্যার তাকতে নাগরিকত্ব আইন পাশ করিয়েছে সরকার। তার থেকেও বড় সংখ্যাও কিন্তু রয়েছে। তা হল, জনতার শক্তি। গণতান্ত্রিক ভাবে আইনের বিরোধিতা করে কেন্দ্রের উপর আইন প্রত্যাহারের জন্য চাপ তৈরি করা। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক পথে বিরোধিতা আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞাপনের মৌলিক ফারাকটা পরিষ্কার।

এ ক্ষেত্রে আরও একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন করা হয়েছে তা কতটা ভারতের বহুত্ববাদ রক্ষার পক্ষে ও কতটা তার জন্য বিপজ্জনক তা এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নয়। ভাল-খারাপের সেই বিতর্ক ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের বিষয়টিই এখানে আলোচ্য।

সংবিধানের সপ্তম তফসিলে তিনটি তালিকা রয়েছে। একটি কেন্দ্রের তালিকা, একটি রাজ্যের বিষয়বস্তুর তালিকা এবং একটি যৌথ তালিকা। যেমন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি রাজ্যের বিষয়। বিদ্যুৎ, পরিবহণ, শিক্ষা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ তালিকায় রয়েছে। আবার প্রতিরক্ষা, রেল, নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলি হল কেন্দ্রের বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র কোনও আইন পাশ করলে সাংবিধানিক ভাবে তা রাজ্য সরকার মানতে বাধ্য। কেন্দ্রের ওই আইনকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যেতেই পারে। কিন্তু রাজ্য কখনওই বলতে পারে না, তা মানব না।

ফলে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বাংলায় বাস্তবায়িত করতে দেব না বলার অর্থ হল সাংবিধানিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করা। নাগরিকত্ব সংশোধন বিলটিতে রাষ্ট্রপতি সই করার পর এখন ওই আইনের আওতায় কেন্দ্রীয় সরকার কিছু নিয়ম তথা রুল প্রবর্তন করবে। যা প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে ঘোষণা করা হবে ও রাজ্যগুলিকে জানানো হবে। রাজ্য সরকার সেই নিয়ম না মানলে সাংবিধানিক ব্যবস্থারই বিরুদ্ধাচরণ করা হবে।

বিষয়টিকে আরও সহজ করে বোঝানো যায়। ধরা যাক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিধানসভায় একটি বিল পাশ করল। তার পর রাজ্যপাল সই করে দেওয়ায় তা আইনে পরিণত হল। কিন্তু বামেদের দখলে থাকা কোনও পুরসভা বলল, রাজ্য সরকারের পাশ করা ওই আইন আমরা মানব না। সেটা কি সম্ভব? পুরসভার কি সেই অধিকার রয়েছে? সেরকম হলে, নবান্ন ওই পুরসভার সঙ্গে কী আচরণ করবে?

এত গৌরচরিন্দ্রকার পর এবার মূল প্রশ্ন। তা হল— এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার কথা আমি, আপনি সহ বহু মানুষ জানেন, পোড় খাওয়া রাজনীতিক ও নবান্নের দুঁদে আমলারা তা বোঝেন না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? না, কোনও ভাবেই নয়। এবং তাতেই কৌতূহল তৈরি হচ্ছে, তা হলে কি কৌশলগত ভাবেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও চান সংঘাত এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে যাতে কেন্দ্র এসপার ওসপার করতে বাধ্য হয়। এমন কিছু পদক্ষেপ করে বসে মোদী সরকার যাতে বাংলার মানুষের সহানুভূতি পেয়ে যায় তৃণমূল। সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন বিল পাশ হওয়ার পর বাংলার সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের পক্ষে অটুট থাকবে বলেই সাধারণ ধারণা। সেই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বা হারে সহানুভূতির ভোট যোগ হয়ে গেলে একুশের ভোটেও সোনা ফলানো তৃণমূলের পক্ষে অসম্ভব নয়। তা ছাড়া গ্রামে, গঞ্জে দু’টাকা কেজি চাল, সাইকেল, কন্যাশ্রী, সবুজশ্রীর মতো প্রকল্প রূপায়ণ করে উপভোক্তাদের একটা ভোটব্যাঙ্কও গড়ে ফেলতে পেরেছেন দিদি।

এমনিতে গত মাস তিনেক ধরে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় বেশ ‘সক্রিয়’। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেহাল দশা নিয়ে তিনি এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার মন্তব্য করেছেন। রাজ্য সরকারের সাংবিধানিক শিষ্টাচার নিয়েও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে প্রশ্ন তুলেছেন। এবং এও দেখা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তিনি শনিবার টুইট করে বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী যে শপথ গ্রহণ করেছেন তাতে সংবিধানের প্রতি ওঁর সত্যনিষ্ঠা থাকা উচিত”। রাজ্যপালের এ কথা বলার অর্থ পরিষ্কার।

অনেকের মতে, গত দু’দিন ধরে উত্তর থেকে দক্ষিণে বাংলায় নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ চলছে তাতে জনজীবন বিপর্যস্ত বলাই যায়। তার উপরে রাজ্য সরকার নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়ন করতে না চাইলে রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে কী রিপোর্ট পাঠাতে পারে তাও বোধগম্য।

তা হলে কি সত্যিই বাংলায় সংবিধানের ৩৫৫ ধারা বা রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে?

জানিয়ে রাখা ভাল, স্বাধীনোত্তর সময়ে এযাবৎ বাংলায় চার বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। ৬২ সালে একবার সাত দিনের জন্য। তার পর ৬৮ সাল থেকে এক বছর পাঁচ দিনের জন্য। এবং পরে ১৯৭০ ও ৭১ সালে বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। ৭২ সাল থেকে এক টানা পাঁচ বছর কংগ্রেসের সরকার চলে। তার পর ৩৪ বছর ধরে স্থায়ী সরকার চালায় বামেরা। সেই সময় রাজনৈতিক সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক ভাবে বার বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারির দাবি তুলেছেন ঠিকই। কিন্তু উপপ্রধানমন্ত্রী হিসাবে লালকৃষ্ণ আডবাণী সেই দাবি কখনও মানতে চাননি। তা ছাড়া তৃণমূলও চায়নি প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হোক। কারণ, একটা নির্বাচিত সরকারকে দিল্লি তাঁর সাংবিধানিক অধিকার খাটিয়ে ফেলে দিলে রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল মানুষের সহানুভূতি পেয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মুখে যে যাই বলুক, সহসা সেই অ্যাডভেঞ্চারিজমের পথে হাঁটতে চান না।

পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি যে দুম করে সে ধরনের পদক্ষেপ করতে চায় তা অন্তত দেখে মনে হচ্ছে না। বরং একুশ সালে সময়েই বিধানসভা ভোট হবে বলে দলের মধ্যে বহুবার বার্তা দিয়েছেন অমিত শাহরা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়িত না করার ব্যাপারে জেদ ও অবস্থান অনমনীয় করে ফেলে তা হলে কেন্দ্র কী করবে? সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে, না কি অন্য কোনও কৌশল নেবে?

আসলে মোদ্দা ব্যাপারটা বুঝতে হবে। এই যে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন এবং তার বিরোধিতা— আপাতদর্শনে দেখা বোঝা যাচ্ছে সবটাই রাজনৈতিক। এবং তাই বলে দেওয়া যায়, রাজনৈতিক ভাবে বাংলায় হয়তো বড় উথালপাথালের সময় আসছে।

Share.

Comments are closed.