সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

কাশ্মীরে ৩৭০ উঠলো তো আমাদের কী!

সোমেশ্বর বড়াল

কাশ্মীরে শিকারায় বসে মধুচন্দ্রিমা যাপন বা পুণ্য অর্জনের জন্য যারা কাশ্মীর যান বা মনে মনে যাওয়ার বাসনা করেন , কিংবা কাশ্মীর মানে যারা চোখের সামনে শুধু শাল বা আপেল দেখেন তারা অনেকেই খোঁজ রাখতেন না যে আদতে ওই জায়গা দেশের মধ্যে প্রায় একটি অন্য দেশ । তাদের অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন – কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা থাকলো আর গেলো – তাতে আমাদের কী আসে -যায়?

নামেই ভারতের অঙ্গরাজ্য অথচ এতদিন সেখানে অবশিষ্ট মূল ভারতবর্ষের বেশিরভাগ আইন কানুন প্রযোজ্য হতো না । সেখানে ভারতীয়ত্বর বদলে কাশ্মীরিয়ত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তথাকথিত মূলধারার এবং দেশ বিরোধী শক্তি কাজ করে চলেছে । বিছিন্নতাবাদী ইসলামিক সন্ত্রাসের পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছিল কাশ্মীর, যে মডেল ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল দেশ জুড়ে । ৩৭০ ধারা ছিল সেই রক্ষা কবচ যা এই উগ্র দেশ বিরোধী শক্তিকে লালন করত। দেশের মানচিত্রের মাথার ওপর থাকা এই রাজ্যটি যে ভাবে প্রায় বিদেশে পরিণত হতে চলেছিল তা যে কোনও দেশভক্ত ভারতীয়র মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল ।

শরীরের একটি অংশে রোগ বাসা বাঁধলে সারা শরীরকে যেমন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় দেশের একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সুবিধার দৌলতে লাগামছাড়া গোলমাল চলতে থাকলে তার ফল বাকি দেশের মানুষকেও ভুগতে হয়। যে অর্থ জলের মতো একটি অংশে খরচ করতে হয় তাতে আমাদের সবার অংশ আছে। যে ছেলেটি কাশ্মীরে পাক পন্থীদের গোলায় নিহত হয় সে তো আমাদেরই ছেলে। কাশ্মীরের মাটিতে বসে ভারতে অশান্তির যে চক্রান্ত চলে তার লক্ষ্য তো আমরা সবাই। ওখান থেকেই সারা দেশে সন্ত্রাসের তত্ত্ব থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে পড়ছে। যার শিকার আমরা সর্বত্র।

এতদিন অবশিষ্ট ভারতের মানুষেরা কাশ্মীরে জমি কিনতে পারতো না। অর্থাৎ আমাদেরই দেশের একটি অংশে আমাদেরই অধিকার সঙ্কুচিত ছিল। ৩৭০ উঠে গেলেই আমরা সবাই কাশ্মীরে জমি কিনতে শুরু করব ব্যাপারটা এরকম নয়। কিন্তু ৩৭০ উঠে গেলে আমরা এক ভারতের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবো। কাশ্মীরের মানুষের যেমন আমার পাড়ায় জমি কিনে বাস করার বা ব্যাবসা-বাণিজ্য করার অধিকার আছে, আমারও কাশ্মীরে বসবাসের বা ব্যাবসা-বাণিজ্য করার অধিকার আছে – এই বোধ আমাদের জাতীয় সংহতি মজবুত করবে।

৩৭০ ধারা তোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারত সরকার যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তা বিশ্বে ভারতের গৌরব বৃদ্ধি করবে। ভারত যে তথাকথিত কোন আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে না – এই বার্তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের বন্ধুর সংখ্যা বাড়াবে। অন্যদিকে পাকিস্তান, বাংলাদেশে বসে যারা দিনরাত ভারতে অশান্তির পরিকল্পনা করে তারাও একটু সমঝে চলবে। যে সরকার দুম করে ৩৭০ তুলে দিতে পারে, সে সরকার ঘাড় ধরে আবার বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে পারে এই আশঙ্কা থেকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা সতর্ক হবে ।

সর্বোপরি ৩৭০ ধারার বিলোপ আমাদের রাষ্ট্রনীতির আরও অনেক দুর্বল দিকের পরিবর্তনের সূচনা করবে যার সুফল সারা দেশের মানুষ ভোগ করবেন। দেশের সরকারের প্রতি শিক্ষিত, উদ্যমী, দেশপ্রেমী মানুষের আস্থা বাড়লে তারাও উৎসাহিত হবেন দেশ গড়ার কাজে। এক কথায় ৩৭০ ধারার বিলোপ যে ঐতিহাসিক ঝটকা দিয়েছে তা হাজা-মজা ভাবনা চিন্তা দূরে সরিয়ে দিয়ে নতুন দেশ গড়ার কাজে গতি সঞ্চার করবে ।

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

বীরভূম জেলায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত লেখক পেশায় শিক্ষক।  বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর নিবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে থাকে।

Comments are closed.