ইস্টবেঙ্গল ‘তৃণমূলের গণসংগঠন’ নয়, ক্রীড়া ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্যোগ আগেও ছিল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শোভন চক্রবর্তী 

বুধবার বিকেলে তখন আবেগের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। লাল-হলুদ আবেগ। দম বন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়ার আনন্দ। ‘সেকেন্ড ডিভিশন’ হওয়ার ভয়কে জয় করার উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছিল ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলি। ঠিক তার কিছুটা পর থেকেই টিকাটিপ্পনি এমন জায়গায় পৌঁছল, এমন এমন ইস্যু উঠে আসতে থাকল যা দেখে অনেকেই বলছেন— ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের লক্ষ্মীলাভ এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবান্ন থেকে সেই ঘোষণা নিয়ে যে রাজনৈতিক বিষোদগার শুরু হয়েছে, এটা বোধহয় একেবারেই কাম্য ছিল না।

ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে সরাসরি ‘তৃণমূলের গণসংগঠন’ বলে কটাক্ষ করেছেন কেউ কেউ। মিম বানিয়ে লেখা হয়েছে, নতুন ক্লাবের নাম নাকি ‘ইবি-টিএমসি!’ বিশেষত বাম সমর্থকদের একাংশের মধ্যে থেকেই এই বিষয়টি শুরু হয়। যা পরে মোহনবাগান সমর্থকদের একাংশের ‘অস্ত্র’ হিসেবে উঠে আসে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

অনেকেরই বক্তব্য, ফুটবল আর রাজনীতির ককটেল বানিয়ে একটা ‘অসভ্যতা’কে প্রোমোট করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যা আসলে ফুটবল, ময়দানি সংস্কৃতি এবং সার্বিক ভাবে বাংলার কয়েক কোটি মানুষের আবেগকেই ধাক্কা দিচ্ছে বা কালিমালিপ্ত করছে।

কেন?
পর্যবেক্ষকদের মতে, এটাকে রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে যাঁরা দেখছেন, তাঁরা বোধহয় ভারতের ফুটবল এবং অন্যান্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তার পিছনে অসংখ্য কারণ রয়েছে বলেই মত তাঁদের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের নয়া স্পনস্পরের কথা ঘোষণা করেছেন নবান্ন থেকে। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের শীর্ষ কর্তাদের পাশে বসিয়ে। যদি এই ঘোষণা হত কালীঘাটের বাড়ি থেকে কিংবা তপসিয়ার তৃণমূল ভবন থেকে তাহলে নয় বোঝা যেত যে, মুখ্যমন্ত্রী নন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই ঘোষণা করেছেন তৃণমূলনেত্রী হিসেবে।

তাঁদের আরও বক্তব্য, যে কতিপয় বাম সমর্থকগণ ইস্টবেঙ্গলকে তৃণমূলের গণসংঠন বানাতে মরিয়া প্রয়াস চালাচ্ছেন, তাঁরা আসলে তাঁদের নেতা সুজন চক্রবর্তীকেও অপমান করছেন। কারণ, গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখেছিলেন বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তী। মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে যাদবপুরের সিপিএম বিধায়ক মমতার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। এমনকি বুধবারও সুজনবাবু টুইট করে বলেন, “ইস্টবেঙ্গল ক্লাব, রাজ্য সরকার, আমরা সবাই উদ্যোগ নিয়েছিলাম যাতে ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলার সুযোগ পায়।” অর্থাৎ ডান-বাম, সরকার-বিরোধী নির্বিশেষে সব পক্ষ, বাংলার ক্রীড়াপ্রেমীদের আবেগ যাতে দেশের এক নম্বর লিগে জায়গা পায় তা চেয়েছিলেন সকলেই।

তা ছাড়া এ কথা কারও অজানা নয়, নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডকে আইএসএল খেলানোর পিছনে অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈয়ের ভূমিকা ছিল আজকের মমতার মতোই। পড়শি রাজ্য ওড়িশার কথাই ধরা যাক। এবার আইএসএল খেলবে ওড়িশা এফসি। এও অজানা নয় এ ব্যাপারে নবীন পট্টনায়েক কী না করেছেন। পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, তাহলে নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেড বা ওড়িশা এফসিকে কংগ্রেস অথবা বিজু জনতা দলের গণফ্রন্ট বলবেন বাংলার সেই মানুষগুলি।

অনেকে এও বলছেন, একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যা করার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্টবেঙ্গলের জন্য তাই করেছেন। এক ক্রীড়াপ্রেমী রাজনৈতিক সমালোচকের বক্তব্য, অতীতে ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে সুভাষ চক্রবর্তী যে ভাবে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের পাশে দাঁড়াতেন, ‘আমাগো ক্লাব’ বলে গর্ব করতেন, তখন যদি ইস্টবেঙ্গল সিপিএমের গণসংগঠন না হয়ে গিয়ে থাকে আজও তাহলে তৃণমূলের গণসংগঠন নয়। এমনকি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মূল ফটক দিয়ে ঢুকলেই দেখা যাবে কয়েক ফুট দূরে অবস্থান করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তীর নামাঙ্কিত দুটি ফলক। ময়দানের অনেকে এও বলছেন, টুটু বসু, সৃঞ্জয় বসুরা তৃণমূলের সাংসদ পর্যন্ত হয়েছিলেন। তখন যদি মোহনবাগান তৃণমূলের গণসংগঠন না হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আজও ইস্টবেঙ্গল নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগ ছিল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে।

তবে রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ বলছেন, উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূলের ভোট ফলাফল উনিশে খুব একটা ভাল হয়নি। বলা ভাল পায়ের তলার মাটি ধসে গিয়েছে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও বনগাঁর মতো এলাকায়। সেই প্রেক্ষাপটে ‘বাঙাল’দের মন জয়ের কৌশল হিসেবেও এই উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারেন দিদি। এর পাল্টা আবার অনেকে এও বলছেন, গত কয়েক মাসে মমতার উদ্যোগ, প্রফুল্ল পটেলকে ফোন, লেসলি ক্লডিয়াস সরণির ক্লাবের জন্য ইনভেস্টার জোগাড়ের তৎপরতা—এসবের মধ্যে রাজনৈতিক নেত্রীর বদলে দায়িত্বশীল মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকাই ঊর্দ্ধে উঠে এসেছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More