শুক্রবার, জুলাই ১৯

আমার স্কুলে নিরাপত্তা হয়তো ছিল, ভরসা ছিল কি?

কমলিনী মুখোপাধ্যায়

জিডি বিড়লা সেন্টার ফর এডুকেশন। হ্যাঁ, এটাই আমার স্কুলের নাম। সবেমাত্র আগের বছর, মানে ২০১৮-তেই আমি এই স্কুল থেকেই পাশ করে বেরিয়েছি।

এখন অবশ্য এই কথাটা কেউ নতুন করে শুনলে বেশ বিস্মিত হন। কারণ ছ-সাত বছর আগেও এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ নাম ছিল, কলকাতার আর পাঁচটা নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের মধ্যে একটা। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই নাম আর পাঁচটা স্কুলের চেয়ে খানিক বেশিই সামনে এসেছে। একাধিক বার।

এই বারও তাই। আমাদের স্কুলের নাম এখন সর্বত্র, আবারও। গত শুক্রবারই আমাদের স্কুলের এক জন দশম শ্রেণির ছাত্রী ওয়াশরুমে আত্মহত্যা করেছে। সে তার সুইসাইড নোটে লিখেও রেখেছে নানা কারণ। এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিশ্চয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে হতে দেখেছেন সকলে। এতটাই ভয়ঙ্কর রকমের বিস্তারিত, সে আলোচনা, যা মেয়েটির বা মেয়েটির পরিবারকে কোনও প্রাইভেসি রক্ষার সুযোগ দেয়নি।

আর স্কুলের প্রাইভেসির কথা ছেড়েই দিলাম। এই প্রথম নয় অবশ্য। এর আগেও তো দেখেছি, যে আমাদের প্রিয় স্কুলকে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। বাইরে থেকে শুনেছি তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠ। অনেক অসভ্যতাও হতে দেখেছি প্রতিবাদের নাম করে।

আমি যখন দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী, তখনও আমার স্কুলের নাম এ ভাবেই ছড়িয়ে গিয়েছিল চার দিকে। কারণ আমাদের স্কুলের এক জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু-নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছিল। তখন আমরা সকলেই মনে-প্রাণে শিশুটির পাশে ছিলাম, চেয়েছিলাম দোষীরা শাস্তি পাক।

তার পরেও আমাদের বাকি শিক্ষক/শিক্ষিকারা হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন, এবং তার সেই সঙ্গে আমরা পড়ুয়ারাও। অভিভাবকেরা অনেক অযৌক্তিক দাবি তুলে ধরেছিলেন সেই বার। আমাদের স্কুলের প্রতিটা পুরুষ শিক্ষক, উঁচু ক্লাসের ছাত্র, দারোয়ানজি-দের চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলতে বাকি রাখেননি। আমরা সেই বিষয়ে প্রতিবাদ করতে পেরেছিলাম। কারণ আর যা-ই হোক, আমরা কখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিনি স্কুলের ভিতরে। তবে নিরাপত্তা জোরদার থাকলেও, সেই সময়েও স্কুল কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতার অভাব ছিল, এ কথা আমি এখনও জোর গলায় বলি।

এখন আবারও আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে মিডিয়া/সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচুর প্রচার। সবাই নড়েচড়ে বসেছেন, দুঃখ প্রকাশ করছেন এই ঘটনা শুনে। ভাবতে বসেছেন, গলদটা ঠিক কোন জায়গায়। আবার কাঠগড়ায় উঠেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। আমার স্কুলে পড়া ছোট-ছোট বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা ভয় পেতে শুরু করেছেন। ভাবতে শুরু করেছেন, ‘আমার বাচ্চাটা নিরাপদ তো?’

কিন্তু এটাও ভাবার বিষয়, যে একমাত্র কৃত্তিকার নিজের পরিবারের মানুষজন ছাড়া বাকি পাঁচ জনের খুব বেশি দিন সময়-ও লাগবে না এই ঘটনাটির কথা ভুলে যেতে। সকলেই আবার সেই নিজের গতিতে জীবনযাপন করবেন, হয়তো এমন ভুলও করবেন অজান্তে যাতে, ফের অন্য কোনও স্কুলের আরও একটি বাচ্চা এই পথ বেছে নিতে পারে।

এই বার বোধ হয় সময় এসেছে সবটা ভাল করে বোঝার। আর পাঁচটা ঘটনার মতো ভুলে না গিয়ে, এই ঘটনাকে ভিত্তি করে হয়তো অনেকটা বদল আনার সময় এসে গেছে। আর এই বদলের জায়গাটায়, স্কুলের নামটা হয়তো অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। আবার খুব গুরুত্বপূর্ণও। কারণ অনেকেই বলেছেন, স্কুলের নজরদারি আরও কড়া হওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু একটু ভেবে দেখলে দেখা যায় যে বাথরুম এ সি.সি.টি.ভি. লাগানোটা কখনওই যুক্তিসম্মত নয়। আর সে দিন মেয়েটি ক্লাসের মাঝখানে সিক রুমে যাবে বলে ক্লাস থেকে বেরিয়েছিল। ক্লাস টেনের ছাত্রী বলেই হয়তো শিক্ষক/শিক্ষিকা খুব একটা চিন্তা করেননি দেরি হওয়াতে। কারণ এই বয়সে একটি মেয়ের নানা কারণে অসুস্থ বোধ করা খুব অস্বাভাবিক নয়। আর যা-ই হোক না কেন, খুব সাধারণ অবস্থায় এই ঘটনা কেউ প্রত্যাশা করেন না।

এইখানে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি চোখে পড়ে, সেটি হল মেয়েটির মানসিক অবস্থার কথা কেউ জানত না। কেউ-ই না। স্কুলের কেউ কেন জানত না, তার অবশ্য কারণ আছে। এক জন প্রাক্তনী হিসেবে আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, যে আমাদের স্কুলে কাউন্সেলিং সেল থাকলেও, তা খুব একটা সক্রিয় নয়। আর আমাদের স্কুলটা বাইরে থেকে প্রচন্ড ঝাঁ-চকচকে, উদারমনস্ক দেখালেও আমাদের স্কুলের ভিতরে অনেক বৈষম্যই জাঁকিয়ে রাজত্ব করে। উদারতার বেশ অভাব রয়েছে সেখানে। এবং এ সবের মধ্যে, ন্যূনতম গোপনীয়তাকে কখনওই তোয়াক্কা করেনি আমাদের স্কুলের কাউন্সেলিং সেল।

আমি এ রকম ঘটনাও নিজের চোখে দেখেছি, যে কোনও কিশোরী ছাত্রী ওই কাউন্সেলিং সেলে গিয়ে তার মনের সব চেয়ে গভীর কথা প্রকাশ করেছে, সাহায্য চেয়েছে। কিন্তু তার পরের দিনই স্কুলের প্রত্যেকটি ক্লাসরুমে এবং স্টাফরুমে সেই ‘গল্প’ ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরে তো কোনও ছাত্রী ভরসা হারাতেই পারে স্কুলের উপর থেকে।

আসলে, দায় সম্পূর্ণ স্কুলকেই বা কী করে দিই। প্রতিটা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য যে শারীরিক স্বাস্থ্যের থেকে কোনও অংশে কম নয়, এটাই তো এই সমাজ এখনও বুঝতে পারেনি। বাবা-মায়েরা অনেক সময়েই ছোটদের বিভিন্ন জটিল মানসিক অবস্থাকে ‘সাময়িক পাগলামি’ বলে গুরুত্ব দেন না। ছেলে-মেয়েকে কখনওই মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা যে মনেই আসে না অভিভাবকদের, এটা সামাজিক শিক্ষার অভাব। আমার মনে হয়, সমাজের সর্ব স্তরে যত দিন না মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তত দিন এই রকম ঘটনা পুরোপুরি এড়ানো যাবে না।

আশা করা যায়, এই ঘটনার পরে অন্তত আমাদের স্কুল সঠিক এবং কড়া পদক্ষেপ নেবে, যাতে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গল্প-আড্ডার খোরাক না বানিয়ে, যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এমনিতেই গোটা দেশ জুড়ে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীরা চেষ্টা করে চলেছে একশোয় একশো পাওয়ার। এ বছরে তো ১০০% নম্বরও উঠেছে বোর্ড-পরীক্ষায়। এ কথা মেনে নিতে বাধা নেই, আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা শুধু নম্বরের কদর করে। জ্ঞানের বা বোধের কদর নেই কোনও। তার পর তো মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করার পর থেকেই বিভিন্ন কম্পিটিটিভ পরীক্ষা আছেই, যাতে একই রকম ভাল নম্বর বা র‍্যাঙ্ক পাওয়ার চাপ থাকে।

খুব ছোট করে বললে, আমার মনে হয়, এখানে পড়াশোনা ছাড়া কিছু হয় না আবার পড়াশোনা করেও ভালো চাকরি পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। আমরা জেনেছি, সম্প্রতি অকালে নিজেকে শেষ করে দেওয়া এই ছাত্রীর পরিকল্পনার মধ্যে ছিল, যে সে আইএসআই-তে পড়বে। কিন্তু সেই পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপ হয়তো সে প্রকাশই করতে পারেনি। সে যে টপার ছিল, ফার্স্ট গার্ল ছিল! আমি শুনেছি, ওর ম্যাচিওরিটি আর পাঁচ জনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ও আদতে ব্রিলিয়ান্ট একটি মেয়ে ছিল। কেউ হয়তো বিশ্বাসই করত না, যে তারও চাপ লাগতে পারে পড়াশোনা নিয়ে! বা হয়তো, সে ভেবেছিল, কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে না তার সমস্যাটা। হয়তো সকলের অজান্তেই আশ্বাস ও সহানুভূতির অভাব বোধ করেছিল সে।

আর এর কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, আমাদের সকলেরই মেলামেশার প্রবণতা কমে আসছে ধীরে ধীরে। পরিধি কমে আসছে কথা বলার লোকের। আমাদের, মানে ছাত্রছাত্রীদের কিন্তু পড়াশোনার চাপ বেড়েই চলেছে। বেড়েই চলেছে একশোয় একশো পাওয়ার চাপ। তার পরে বাকি সময়টা কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় নেই কারও। আমরা সকলে ফোনের জগতে ডুবে যাই প্রায়ই। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে সব্বাই আমাদের বন্ধু, কিন্তু আসলে অনেকেই বন্ধু নয়। কারও কষ্ট হলে, তা কাউকে বলার থাকে না। কারও সময় নেই, কারও কথা দু’মিনিট শোনার।

আর সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে, পরিবার-পরিজনের মধ্যে একটু খোঁজ নিলেই দেখা যায়, বহু মধ্যবিত্ত বাড়ির বাবা-মার স্বপ্নভঙ্গ করার ভয়েই অনেক সময়ে বাচ্চারা অনেক যন্ত্রণার কথা বলে উঠতে পারে না। হয়তো বা ভাবে, বাবা-মা এই সমস্যা বুঝবে না আমার। আর বাবা-মায়ের বোঝার চেষ্টা থাকলেও, তা হয়তো তাঁদের কিশোরবেলার অভিজ্ঞতা দিয়েই তাঁরা সমাধান করার চেষ্টা করেন। অথচ আমরা খুব ভাল জানি, আমাদের ঠিক কয়েক দশক আগের কিশোরবেলা আর আমাদের এখনকার কিশোরবেলার মধ্যে বড় ফারাক। ফলে বোঝা এবং বোঝানো– দু’দিক থেকেই আরও নমনীয়তা প্রয়োজন।

এই ফারাক কমানোর চেষ্টা করতে হবে। বাবা-মায়েরা যেন এই আশ্বাসটুকু বাচ্চাদের দিতে পারেন, যাতে বাচ্চারা মনের সব কথা উজাড় করে দিতে পারে তাঁদের কাছে। এবং প্রয়োজনে, নিঃসঙ্কোচে বলতে পারে যে তার এক জন মনোবিদের সাহায্য দরকার। মা-বাবাও যেন কোনও রকম বিচার না করেই তার পাশে থাকে।

আমি মেয়েটিকে চিনতাম না ঠিকই, কিন্তু ঘটনাটা শোনার পর থেকে মনটা হু হু করছিল। মনে পড়ছিল সদ্য পেরিয়ে আসা নিজের কিশোরবেলার কথা। মনে পড়ছিল, স্কুলের কথা। সেইখান থেকেই এই কথাগুলো জোরে বলার দায় অনুভব করলাম।

Comments are closed.