শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৩
TheWall
TheWall

খ্যাতি কিনতে পরের বছর না-ই বা গেলাম এভারেস্ট!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

জানি, ভারতীয় হিমালয়ে শতাধিক চ্যালেঞ্জিং শৃঙ্গ আছে। কিন্তু তারা কী  আমাকে এত সম্মান দিতে পারবে? না পারবে না। এভারেস্ট থেকে ফিরে আমি যখন পার্টিতে গ্লাস হাতে করে দাঁড়াব, বলব এভারেস্টে আমাকে কেমন স্ট্রাগল করতে হয়েছিল, সবাই হাঁ করে শুনবে। অন্য সব ভারতীয়  শৃঙ্গগুলি আমাকে সে সুযোগ দেবেই না। পর্বতারোহণ বিষয়টিতে অনভিজ্ঞ দর্শকের সামনে স্থানীয়  জনপ্রতিনিধির দেওয়া মালা জুটবে না। এভারেস্ট থেকে ফিরে  স্লাইড শো-তে আমার রুদ্ধশ্বাস ভাষণ, এভারেস্টের মাথায়  জাতীয় পতাকা নিয়ে ছবি দেখিয়ে আমি পেতেও তো পারি এক টুকরো জমি  বা চাকরিতে প্রোমোশন, সারা জীবন কলার তুলে হাঁটার সুযোগ।

আমি যদি বলি আমি  থলয়সাগর অথবা সিবি-৯  আরোহণ করেছি, কেউ ফিরেও তাকাবেন না। একটা মালা কেউ দেবেন না ক্লাবের গুটিকতক শুভানুধ্যায়ী ছাড়া। সে যাই হোক, এই সিজ়নে প্রচুর মানুষের মৃত্যু দেখল এভারেস্ট। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পড়তে ও শুনতে সকলেরই খুব খারাপ লাগছে জানি। কিন্তু বাস্তবের জমিটা এতটাই রুক্ষ। তাই আরও দুঃখের দিন আসছে আগামী দিনগুলিতে।

এভারেস্টের বসন্ত মরসুম এ বছর শুরু হয়েছিল ১৪ মে, শেষ হল ২৪ মে।  এ বছরই সর্বোচ্চ সংখ্যায় আরোহী ভারত থেকে এসেছিলেন এভারেস্টে। মোট ৭৭ জন।  এ বছর বসন্ত মরসুমে ১১ জন আরোহী এভারেস্টে মারা গেছেন, তার মধ্যে আছেন চার জন ভারতীয়ও। অসংখ্য ভারতীয়কে এভারেস্টের বিভিন্ন জায়গা থেকে রেসকিউ করতে হয়েছে। নিশ্চিন্ত থাকুন, এর পরেও, আগামী বছর ভারত থেকে আরও আরোহী আসবেন এভারেস্টে।

কর্পোরেট অফিস থেকে স্পনসরশিপ জোগাড় করে, সম্পত্তি বিক্রি করে, নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলে, ফিক্সড ডিপোজিট থেকে লোন নিয়ে, সরকারি দফতরের দরজায় দরজায় ঘুরে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রাউড ফান্ড তুলে, লোন নিয়ে,  বন্ধু বান্ধবদের থেকে ধার করে আগামী বছর আবারও কেউ এভারেস্টে যাবেন। প্রত্যেক আরোহী কমপক্ষে ৪০ লাখ টাকা সংগ্রহ করবেন এভারেস্ট আরোহণের জন্য। আবার শত কোটি টাকার ব্যবসা হবে এভারেস্টকে ঘিরে। এভারেস্ট দেখবে আরও কিছু মৃত্যু।

তবে এই মরসুমে যাঁরা এভারেস্টে মারা গেলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ-ই তুষারঝড়ে, তুষারধসে, বরফ-ফাটলে পড়ে, পা ফসকে খাদে পড়ে বা অনান্য দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তাঁরা মারা গেছেন অসীম ক্লান্তিতে নিজের জীবনীশক্তিটুকু খুইয়ে। নয়তো উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, যেমন Acute mountain sickness (AMS) অথবা High Altitude Cerebral (HACE) বা Pulmonary (HAPE) Edema এবং Hypothermia তে আক্রান্ত হয়ে।

কিন্তু কেন! আসলে, বাস্তব বলছে, ভারত থেকে যাঁরা এভারেস্টে আসছেন  তাঁদের বেশিরভাগেরই আট হাজার মিটার উচ্চতায় অর্থাৎ এভারেস্টের ডেথ জোনে এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিজেকে সামলানোর পর্যাপ্ত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ নেই। তাঁদের এই আত্মঘাতী মিশনে যেতে প্রলুব্ধ করছে তাঁদের বিখ্যাত হওয়ার সর্বগ্রাসী  বাসনা, অর্থলোভী কিছু এজেন্সি, বাস্তব জ্ঞানশূন্য কিছু স্পনসর ও কিছু স্তাবক।

অথচ পর্বতারোহণ এমনই একটি খেলা, যেখানে আরোহীদের স্পেশ্যাল দক্ষতা দরকার, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দরকার। ২৫-২৬ হাজার ফুট উঁচু শৃঙ্গ আরোহণের পূর্ব অভিজ্ঞতা দরকার। হার-না-মানা মন ও শরীর দরকার। যদি আপনি কাঠমাণ্ডুতে জমা হওয়া এবং ভারত থেকে যাওয়া সমস্ত এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণ প্রত্যাশীদের বায়োডেটা দেখেন, দেখবেন তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই হয়তো কেবল একটি করে বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করেছেন। ক্লাইম্ব করেছেন সহজ কিছু ৬০০০ মিটার পিক। তার পরেই তাঁরা ছুটেছেন এভারেস্টে। এটা ভেবে নিয়েছেন, যে তাঁরা এভারেস্টের জন্য প্রস্তুত।

সদ্যপ্রয়াত বিশিষ্ট পর্বতারোহী অমূল্য সেন একবার বলেছিলেন, “নিজেদের সীমা আগে জানতে হবে৷ বুঝতে হবে আমি আদৌ পারব কি না৷ তারপরে তো পাহাড়ে ওঠা৷ প্রকৃতির সঙ্গে কোনও মস্তানি চলে না৷” কিন্তু তাঁর মত প্রবাদপ্রতীম পর্বতারোহীর কথার গুরুত্ব দেওয়ার মত মানসিকতা কি আদৌ অবশিষ্ট আছে!

এ বছরই নেপালে মাত্র ১৫ দিনে ৬ টি আটহাজার মিটারের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গ আরোহন করা প্রজেক্ট পসিবল-এর দলনেতা নির্মল পূর্জা এভারেস্ট আরোহন করে নেমে এসে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তিনি সেখানে তাঁর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এভারেস্ট আরোহণের পথে তিনি এমন অনেক আরোহীর দেখা পেয়েছেন যাঁরা পর্বতারোহণের ‘ আ আ ক খ” জানেনা। তিনি বলেছেন, “আমি সত্যি অবাক হয়ে গিয়েছি অনেক আরোহী ‘অ্যাবসেল‘(অবরোহণ) জানেন না দেখে। এটা পাঁচ-ছ’বছরের বাচ্চারাও জানে (যারা বোর্ড ক্লাইম্বিং শিখছে)”। কল্পনা করুন অবস্থাটা।

নির্মল পূর্জা ওই ইন্টারভিউতে বলেছেন, এক দিনে জিরো থেকে হিরো হওয়া যায় না। প্রকৃতি ধনী বা গরীব দেখে না সবার সঙ্গে একই রকম ব্যবহার করে। তিনি বলেছেন, ” তাই আমি প্রথমে ৬ হাজার মিটারে, তারপর ৭ হাজার মিটারে, তারপর ৮ হাজার মিটারে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। তারপর এভারেস্টে এসেছি”। ভেবে দেখুনতো কজন ভারতীয় এইভাবে নিজের শরীর ও মনকে উচ্চতার সঙ্গে টিউন করতে করতে এভারেস্টে আসেন।

ঝাংবু শেরপা, যিনি ২০০৬ সাল থেকে এভারেস্টের অভিযানগুলির সঙ্গে যুক্ত, তিনি এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, “খুব কম আরোহী এভারেস্টের জন্য সঠিক ভাবে তৈরি হয়ে আসেন। বাকিরা যেকোনও ভাবে উঠে পড়বেন ভাবেন। এভারেস্টে ওঠার কোনও শর্ট কার্ট রাস্তা নেই, সেটা ওঁরা বোঝেন না”।

অথএব, বর্তমানে যাঁরা নিজেদের মাউন্টেনিয়ার বলেন, অথচ এভারেস্ট ছাড়া আর কোনও শৃঙ্গ চোখের সামনে দেখতে পান না, তাঁরা কিন্তু আদতে ‘এভারেস্ট ট্যুরিস্ট’ ছাড়া কিছুই নন। তাঁদের যদি আইস ফল ডক্টরদের (উচ্চপ্রশিক্ষিত ও বিশেষ দক্ষ শেরপা) সাহায্য না নিয়ে খুম্বু আইসফলের ভেতর দিয়ে নিজে নিজে রুট ওপেন করতে বলা হয়, তখন কী হবে! বিশ্বাস করুন, ৫০০ জনের মধ্যে ৪৯০ জন আরোহীই বেসক্যাম্পে ফিরে আসবেন একরাশ হতাশা নিয়ে। মাত্র ১০ জন খুম্বু আইস ফল রুটটি ওপেন করতে পারবেন হয়তো। তাঁদের মধ্যে বড় জোর ৩ জন এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণ করতে পারবেন এবং সুস্থ ভাবে বেসক্যাম্পে ফিরতে পারবেন।

হ্যাঁ আমি নিজে এতটা পিছিয়ে থেকেও  এভারেস্ট আরোহণ করতে পারব। কারণ আমার এজেন্সি আমার সমস্ত লজিস্টিকের ভার নেবে অর্থের বিনিময়ে। এক দল শেরপা পুরো পথে রোপ লাগিয়ে দেবে। আমার নিজস্ব শেরপা আমার টেন্ট পেতে দেবে। আমার খাবার তৈরি করে দেবে। এমনকী সে আমার অক্সিজেন সিলিন্ডারও বইবে। মাস্কের ভেতরে অক্সিজেনের রেট ঠিক করে দেবে। বলবে, কখন আমাকে হাঁটতে হবে। কখন আমাকে থামতে হবে। বরফ গলিয়ে জল বানিয়ে দেবে।। আমাকে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকিয়ে দেবে। আমার হার্নেস চেক করে নেবে।

কিন্তু আমি একবারও ভেবে দেখেছি কি, আমার তখন কী হবে, যখন পরিবেশ শেরপাদের জন্যও প্রতিকূল হয়ে যাবে? যখন আবহাওয়া হঠাৎ খারাপ হতে শুরু করবে? যখন পরিস্থিতি আমাকে আমার শেরপার কাছ থেকে আলাদা করে দেবে? কী হবে, যখন আমার শেরপা তুষার ফাটলে পড়ে যাবে! যখন তার পা থেকে ক্র্যাম্পন খুলে যাবে। বা সে অনান্য অজানা বিপদে পড়বে ? তখন তো আমি শেষ! কারণ এই পরিবেশে লড়ার কোনও অভিজ্ঞতাই আমার নেই। নেই যথেষ্ট প্রশিক্ষণও। আমি তো শেরপার পায়ে পায়ে হাঁটার, থুড়ি, চড়ার ভরসায় চলে এসেছি এভারেস্টে!

কিন্তু সত্যিই কি তৈরি না হয়ে এতটা ঝুঁকি নেওয়া উচিত? তা ছাড়া, এভারেস্টও কি ফি বছর এত মানুষের দৌরাত্ম্য নিতে সক্ষম? এটাই কি সত্যিকারের পর্বতারোহণ? যাঁরা পাহাড় এত ভালবাসেন, এই ইস্যু নিয়ে কি গভীর ভাবে চিন্তা করার সময় আসেনি?

আমরা বরং কিছু দিনের জন্য এভারেস্টকে তার সাম্রাজ্যে একা থাকতে দিই তার অপার্থিব সৌন্দর্য্য নিয়ে। এভারেস্টকে একটু শান্তির শ্বাস নিতে দিই। আমাদের পায়ের চাপ থেকে, আমাদের ফেলে আসা আবর্জনা থেকে মুক্ত হতে দিই। ফাঁপা খ্যাতির জন্য এভারেস্টে না দৌড়ে তাকে ক’দিন একটু দূরে রাখি।

হ্যাঁ, এখনকার এভারেস্ট আরোহণের খ্যাতিটা ফাঁপাই। কারণ এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণের সব কৃতিত্বই শেরপাদের। “It’s Not us, It’s actually the Sherpas who climb Everest”  এই বিখ্যাত  উক্তিটি সাধারণ মানুষ না জানলেও, খ্যাতিটি যে ফাঁপা তা আজ বুঝেছেন। কিন্তু তাতে কী!  ফাঁপা খ্যাতির জন্য আমরা আগামী বছর আবার ঝাঁপিয়ে পড়ব এভারেস্টের গায়ে।  তারকেশ্বরে জল ঢালতে যাওয়ার মত লাইন করে এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণের মধ্যে যে এতটুকুও অ্যাডভেঞ্চার অবশিষ্ট নেই, তা জেনেও ঝাঁপাব। ঠিক যেমন পতঙ্গরা স্বেচ্ছায় ঝাঁপিয়ে পড়ে অগ্নিশিখায়!

Comments are closed.