মোদীর শিক্ষানীতি: সামনে জনমুখী মুখোশ, আসলে টিকিখানি বাঁধা আছে আম্বানিদের ওয়ালেটে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সৃজন ভট্টাচার্য

কী বলব? শূন্য কলসি বাজে বেশি? গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল? নাকি বিজাতীয় ভাষায়, অল দ্যাট গ্লিটারস ইজ নট গোল্ড?

শুরুতেই বলে রাখা যাক, পলিসি একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, চটজলদি প্রণয়ন হয়ে যাওয়া আইনের মত বিষয় নয়। ফলতঃ পলিসি নিয়ে কোনও লেখাই এই মুহূর্তে অভিজ্ঞতালব্ধ হবে না। কেবল নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে গড়ে ওঠা কিছু ধারণার সমষ্টি হতে পারে মাত্র। এই লেখাটিও, নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়নের পরিণতি সম্বন্ধে কিছু আগাম আভাস দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়, এটুকু না বললে অপকথন হবে। লাইন ধরে ধারা ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে আপত্তি করার মতো প্রায় শতখানেক পয়েন্ট রয়েছে (বাড়িয়ে বলছি না)। আলোচনাকে অহেতুক ভারাক্রান্ত না করে চেষ্টা করব মূল বৈশিষ্ট্যগুলিকে এক সূত্রে নিয়ে আসার।

‘ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন’-এর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে প্রস্তুত হওয়া এই শিক্ষানীতির লক্ষ্য কী? ৪.৬ নং ধারা বলছে – “..Holistic and well-rounded individuals equipped with key 21st Century skills” প্রস্তুত করা। শুনতে দারুণ, না? শিক্ষা শুধু পাঠ্য বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, মাথার কাজ হাতের কাজ মিলেমিশে যাবে। এপ্রসঙ্গেই সামনে আনা হয়েছে ভীষণ আকর্ষণীয় আর একটি অফার – ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ’! স্তুতির পাহাড় টপকে এসে চুপচাপ ভাবতে বসলে প্রশ্ন জাগে, এ আসলে ছাত্রদের “jack of all trades, master of none” বানিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নয় তো? নলেজ সোসাইটি থেকে স্কিল সোসাইটিতে উত্তরণের প্রাকশর্ত হিসেবে সরকার বিষয়ের গভীরে ঢুকে অধ্যয়ন বা স্পেশ্যালাইজেশনের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে চলতে চাইছে না তো?

আরও পড়ুন- মোদীর শিক্ষানীতি: বাস্তবতা, প্রয়োজনীয়তা আর আত্মনির্ভরতাই মূল ভাবনা

হীরক রাজার দেশে শোনা যেত – ‘যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে’। সরকার চায় না ছাত্ররা জ্ঞানের গভীরে অবগাহন করুক। তারা চায়, কাজ চালিয়ে দেওয়ার মতো সবই একটু করে জেনে রাখুক ছাত্ররা, যাতে ভবিষ্যতে সস্তায় বিশাল এক শ্রমিকবাহিনী জোগাড় করে দেওয়া যায় আম্বানি-মালিয়াদের জন্য। ১১.৪ নম্বর ধারায় এক কথায় এই শিক্ষানীতির মূল নির্যাসটুকু পাওয়া যাবে। যেখানে বলা হয়েছে, “Even engineering schools, such as the IITs, will move towards more holistic education with more arts and humanities, while arts and humanities students will aim to learn more science – while ALL will make an effort to learn more vocational subjects.” সরকার নিজেই ঘোষণা করছে, এই শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য ‘Employability’ বাড়ানো, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটানো নয়। দরকারে ক্লাসরুমের গুরত্ব কমিয়ে ওপেন অ্যান্ড ডিসট্যান্স লার্নিংয়ে জোর দিতে তাঁরা পিছপা নন।  অনুসন্ধিৎসু মনন তৈরি করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়, সরকার চায় স্কুল-কলেজগুলোকে কারখানা বানাতে। যেখান থেকে প্রতি বছর হাজারে হাজারে রোবট বেরোবে মানুষের বদলে – কে না জানে, রোবট প্রশ্ন করে না, হুকুম তামিল করে যায় শুধু।

মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ আসলে ছাত্রসমাজকে চিন্তাশক্তিহীন গড্ডলিকা প্রবাহে রূপান্তরিত করে ফেলার একটা চক্রান্ত। সরকার যদি ইন্টারডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচের কথা বলত, অবশ্যই স্বাগত জানাতাম। ইন্টারডিসিপ্লিনারি ও মাল্টিডিসিপ্লিনারি, এই দুইয়ের যে সুক্ষ্ম তফাৎটি রয়েছে, তা আদতে খুবই মোটা দাগের ক্ষত এঁকে দিতে পারে আগামীর সমাজে। আরও মজার কথা, মাল্টিডিসিপ্লিনের অফার কিন্তু বিনা ডিসকাউন্টে নয়! একজন ছাত্র যখন ইচ্ছে ডিপ্লোমা নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, ডিগ্রি সম্পন্ন করার দরকার নেই। এতদিন জানতাম ড্রপ-আউট একটা দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। এই শিক্ষানীতি আমাদের শেখাল, ড্রপ-আউটকে ‘মাল্টিপল এন্ট্রি অ্যান্ড এক্সিট পয়েন্টস’ নাম দিয়ে রীতিমতো উদযাপন করা যায়! কারণ? সুবিশাল কাব্যিক ঢক্কানিনাদের আড়ালে মোদ্দা কথা একটাই, চিপ লেবার চাই। এখনই চাই।

এই শিক্ষানীতিকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে সাধারণ উদ্দেশ্য হিসেবে বেরিয়ে আসে তিনটে ‘C’ – Commercialisation,  Centralisation, Communalisation – অর্থাৎ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, কেন্দ্রীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ। সমগ্র শিক্ষানীতি জুড়ে অজস্র নতুন ভাবনা, বিরাট ব্যাপ্ত পরিকল্পনার ভিড়। শুধু, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের যোগান কোথা থেকে হবে তা বলা নেই। একেবারে মিড ডে মিলে প্রাতঃরাশের যোগান থেকে উচ্চশিক্ষায় সর্বোচ্চ স্তরের বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়কে আমন্ত্রণ – ঘোষণার ভাঁড়ার উপচে পড়লেও সরকারি ব্যয়বরাদ্দ কতটা বাড়বে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

যেভাবে স্কুল কমপ্লেক্স সাজানোর কথা বলা হচ্ছে, যেভাবে স্কুলস্তর থেকেই সেমিস্টার সিস্টেম লাগু করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যেভাবে শিক্ষায় অনলাইন নির্ভরতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে বা যেভাবে উচ্চশিক্ষায় স্বশাসিত ডিগ্রিদানকারী কলেজের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলা হচ্ছে, তাতে লেখাপড়ার খরচ যে বহুগুণ বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আমাদের সন্দেহ, এই শিক্ষানীতি আসলে বড় বড় ঘোষণার আবডালে পরিকাঠামো নির্মাণ বা শিক্ষক নিয়োগের মত জরুরি প্রশ্নে সরকারের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে বকলমে আম্বানি-মালিয়াদের হাতে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাটাকে বেচে দেওয়ারই ষড়যন্ত্র! শিক্ষাকাঠামোর সমস্ত স্তরেই পিপিপি মডেল, ফিলানথ্রোপিক প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ইত্যাদিকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

একেই স্কুল কমপ্লেক্সের প্রস্তাব বা  উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে তিন ভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেখে আশঙ্কা জাগে, শহরে-গ্রামে সর্বত্র এই মুহূর্তে বিকেন্দ্রীভূত হয়ে ছড়িয়ে থাকা জরুরি কিন্তু ‘অলাভজনক’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তার উপরে যদি এই পরিমাণ লেখাপড়ার খরচ বাড়ে, প্রান্তিক, দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, এমনকী মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরও লেখাপড়া টেনে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে! ফেলো কড়ি, মাখো তেল – ১৯৮৬ সালের শিক্ষানীতি থেকে শিক্ষাকে ‘ব্যক্তিগত পণ্য’তে রূপান্তরিত করে বেসরকারিকরণের উদ্দেশে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তারই যেন আজ ষোলকলা পূর্ণ করল ৩৪ বছর পরের শিক্ষানীতিতে এসে।

স্ববিরোধিতা, আদতে উপরচালাকি, এই শিক্ষানীতির প্রণেতাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রচণ্ড মানবদরদী সেজে তাঁরা বলছেন – “education is a public service and not a commercial activity or a source of profit”,  আরএকটু পরে তাঁরাই জানাচ্ছেন তাঁদের লক্ষ্য – “substantial investment in a strong, vibrant public education system – as well as the encouragement and facilitation of true philanthropic private participation.”

এই স্ববিরোধিতা এই শিক্ষানীতির পরতে পরতে। ‘সবার জন্য শিক্ষা’র জনমুখী মুখোশটুকু না ধারণ করলে জনগণকে বোকা বানানো সহজ হবে না, অথচ টিকিখানি বাঁধা আছে আম্বানিদের ওয়ালেটে। শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ৬% ব্যয় করতে হবে, সেই ১৯৬৪ সালের কোঠারি কমিশন থেকে শুনে আসছে ভারতবাসী। ঘোষণাতে নতুন কিছু নেই, উদ্দেশ্যতে?

বাণিজ্যিকীকরণের কথা তো বললাম। এবার আসা যাক কেন্দ্রীকরণের প্রসঙ্গে। আমাদের দেশ বৈচিত্র‍্যময়, বহুমাত্রিক। দূরপাল্লার ট্রেনযাত্রা করলে ১২ ঘণ্টা অন্তর যে হকার ওঠেন, তাঁর চেহারা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ভাষা, সংস্কৃতি পাল্টে পাল্টে যায়। এই দেশে শিক্ষা থাকা উচিৎ রাজ্য তালিকায়, তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যুগ্ম তালিকার সঙ্গে। এই শিক্ষানীতি লাগু করার প্রশ্নে বাস্তবিক ক্ষেত্রে যুগ্ম তালিকার আইনকানুনও মানা হল না। রাজ্যগুলির মতামত গ্রাহ্য না করে, সংসদে আলোচনা না করে, শিক্ষাবিদ বা ছাত্র-শিক্ষক সংগঠনগুলির অভিমতের তোয়াক্কা না করে একতরফা ঘোষণা করে দেওয়া হল দিল্লি থেকে। এই স্বৈরতন্ত্রী  কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা শুধু লাগু করার প্রক্রিয়াতেই নয়, এই শিক্ষানীতির বক্তব্যেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

কী রকম? স্কুলশিক্ষায় NCERT-র স্থির করে দেওয়া কাঠামো ও টেক্সটবুকের উপাদান অনুসারেই সাজাতে হবে রাজ্যের কাঠামো ও টেক্সটবুককে। থাকছে NACSE-র মতো সংস্থার কথাও। যারা আদতে নিয়ন্ত্রণ করবে প্রতিটি রাজ্যের স্কুল বোর্ডগুলিকে। উচ্চশিক্ষাতে আবার ইউজিসির ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে বিপুল আকারে। পরিবর্তে গঠন করা হচ্ছে NHERA নামক ‘নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ’কে। সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে (HEI) মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে এই সংস্থার। এদের কার্যনীতি হবে “light but tight” – শব্দের খেলার আড়ালে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের উদগ্র কামনা, বুঝতে অসুবিধা হয় না।

পরিকল্পনা ও ব্যয়বরাদ্দের প্রশ্নে জেনারেল এডুকেশন কাউন্সিল (GEC) বা হায়ার এডুকেশন গ্রান্টস কমিশন (HEGC)-এর প্রবর্তনের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে একটি পৃথক ক্যাটেগরিভুক্ত করছে সরকার এবং কোন বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিৎ, কোন বিষয়ে গবেষণা হলে টাকার যোগান দেওয়া হবে, ইত্যাদি প্রশ্ন কেন্দ্রীয়ভাবে স্থির করার জন্য সমস্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাথার উপর বসানো হচ্ছে ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশনকে (NRF)। বিজেপি যদি ক্ষমতায় থাকে, তাহলে গবেষণার বিষয়বস্তু হবে গোরুর দুধে সোনা, এ আর আশ্চর্য কী! বিগত কয়েকবছর ধরে ইতিহাস কংগ্রেস বা বিজ্ঞান কংগ্রেসে আমরা আধুনিক বিদ্যাবুদ্ধির যে অসহ্য অবমাননা প্রত্যক্ষ করে আসছি, তাকেই কলেবরে বাড়িয়ে তুলবে এহেন কেন্দ্রীকরণ। আয়োজনে কোথাও যেন কোনও ফাঁক না থাকে তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবার উপরে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ‘রাষ্ট্রীয় শিক্ষা আয়োগ’ তো আছেই!

এবার সর্বশেষ ‘সি’র পালা। আরএসএস-বিজেপির হাতে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণের মানেই হল তাদের খেয়ালখুশিমতো সাম্প্রদায়িকীকরণের চেষ্টা। শিক্ষানীতি জুড়ে বলিউডি সিনেমার কায়দায় প্রাচীন যুগের গৌরবগাথা সম্বন্ধে আবেগ সঞ্চারের চেষ্টা থাকলেও পরবর্তী হাজার বছরে শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তনের ইতিহাস কার্যত উধাও। আরএসএসের ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষানীতি জুড়ে কোথাও নেই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা, এই শিক্ষানীতি প্রায় নিশ্চুপ শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ বা ছাত্রী নিরাপত্তায় সদর্থক ভূমিকার প্রশ্নেও। কেবলই গোল গোল কথার মাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে ভবিষ্যতের মানুষ গড়ার দায়িত্ব।

স্কুল কলেজ পরিচালনায় সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশান, এনজিও বা সোশ্যাল ওয়ার্কারদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে একাধিক জায়গায়। নির্দিষ্ট প্রশ্ন জাগে, এরা কারা? এদের পরিচয় বা ভূমিকা কী ও কতদূর বিস্তৃত,  তা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। এমন আশঙ্কা হওয়া অমূলক নয়, আইনের ফাঁক রেখে আরএসএস ও তার কর্মীদের প্রবেশপথ প্রশস্ত করা হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রের অন্দরমহলে। ছাত্রদের শিক্ষনীয় হিসেবে কতকগুলি আপাতনিরীহ কিন্তু অস্পষ্ট শব্দবন্ধ আলতো করে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে । যেমন- ‘ভারতীয় মূল্যবোধ’ বা ‘নীতিবান আচারব্যবহার’। এর সংজ্ঞা কী, তা স্পষ্ট করা হয়নি। আরএসএস ভারতবর্ষ বলতে যা বোঝে, আর এদেশের অধিকাংশ জনগণ ভারতবর্ষ বলতে যা বোঝেন, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ফলতঃ কোনটা ” ভারতীয়” তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে বৈকি!

এবং বহুচর্চিত ত্রিভাষা সূত্র! মাতৃভাষায় প্রাথমিকে শিক্ষাদানের সুপারিশ নতুন নয়, স্বাধীনতার পর শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় সকল কমিটি বা কমিশনই জোরালোভাবে এর পক্ষে মত দিয়ে গিয়েছেন। মাতৃভাষায় শিক্ষাদান বামপন্থীদেরও দাবি। এ রাজ্যে সে নীতির রূপায়ণ করতে গিয়ে একাংশের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তাঁরা। তথাপি তাঁরা এই অবস্থান পরিত্যাগ করেননি। আমাদের দেখার, এই শিক্ষানীতি কি হুবহু এতদিনের কথাগুলোই বলছে? না। ‘থ্রি-ল্যাঙ্গোয়েজ ফর্মুলা’তে সামনে আনা হচ্ছে মাতৃভাষার প্রশ্নটিকে। যে ভয়াবহ বিষয়টি প্রচারের আড়ালে থেকে যাচ্ছে তা হল, কার্যত সংস্কৃত এবং হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সমগ্র ব্যবস্থাটিকে।

গো-বলয়ের বাইরে হিন্দি আগ্রাসনের উদ্দেশ্য পুরনো। সঙ্গে একুশ শতকে এসে প্রাচীন গরিমার বিজ্ঞাপনের মোড়কে হঠাৎ সংস্কৃত ফেরি করা দেখে মনে সন্দেহ জাগতে বাধ্য, পর্দার পিছনে আরএসএস কলকাঠি নাড়ছে না তো? ভারতবর্ষের মানুষ নবজাগরণ ও তৎপরবর্তী সময়ে ভিনদেশি ভাষা শিখে সারা পৃথিবী থেকে যে জ্ঞান আহরণ করেছে, তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ইতিহাসের যাত্রাপথ উল্টোদিকে ঘোরানোর যাবতীয় ব্লু প্রিন্ট সেরে ফেলেছে এই শিক্ষানীতি। রাজনীতির বোঝাপড়া দরকার নেই, সাধারণ জ্ঞান থেকেই প্রশ্ন জাগা উচিৎ, বিশেষ উদ্দেশ্য না থাকলে খামোকা ২০২০ সালে এসে সমগ্র ছাত্রসমাজকে সংস্কৃত পড়ার জন্য জোর করতে চাইছে কেন সরকার?

উত্তর আসলে একটাই। আধুনিক প্রগতিশীল যা কিছু, তাকেই ‘বিদেশি’ আখ্যা দিয়ে ঘৃণার পাত্র করে তোলো। ভাষা এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আহরণ ও ব্যক্ত করা, দুইয়ের জন্যই। হিন্দি-সংস্কৃততে আরএসএসের পাঁচন তৈরি আছে, পাবলিককে গিলিয়ে দেওয়া সহজ। ইংরাজি বা অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় যে বিশাল সাহিত্য ও সমাজদলিলের সম্ভার, তার উপরে পুরোটা ছেড়ে দিলে তরুণ প্রজন্মের আধুনিক মনন গঠনের প্রক্রিয়াটা লাগামছাড়া হয়ে যেতে পারে, আশঙ্কা আছে বটে দাঙ্গাবাজদের। ওদের যন্তর মন্তর ঘরে ভাষার গুরুত্ব তাই ভীষণ বেশি।

প্রতিবাদের ভাষা অবশ্য ওদের সিলেবাসে সবটা নেই। প্রতিবাদ যদি প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয়ে যায়, ভয় আছে ওদেরও বিলক্ষণ। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি তাই ভুলেও ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র, ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মুখ খোলেনি। এমনকী ম্যানেজমেন্টেও ওরা সিলেকশন পদ্ধতিতেই আস্থা রেখেছে, ইলেকশনে নয়। শাসকের শিক্ষানীতির প্রণেতারা ভুলে যাচ্ছেন, লড়াইতে কোনওদিন লকডাউন হয় না।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া- নাম পরিবর্তন ছাড়া এই শিক্ষানীতিতে ইতিবাচক বিশেষ কিছুই নেই। এই শিক্ষানীতি স্বচ্ছন্দে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে পারেন। যদি পরিবেশ সচেতন হন, জ্বালাবেন না – পরিবর্তে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিন।

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

লেখক এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More