ইস্টবেঙ্গল নাম পরে বসলে অসুবিধেটা কোথায়? তাতে যদি ক্লাবের সার্বিক ভাল হয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ডাঃ শান্তিরঞ্জন দাশগুপ্ত

(ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সহসচিব)

উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ওই কথাটি দিয়ে শুরু করলাম ইচ্ছে করেই, ‘নামে কী আসে যায়!’
সত্যিই তো নামে কী এসে যায়? সাম্প্রতিককালের মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের নাম বদলের সম্ভাবনা নিয়ে যা হইচই হচ্ছে, তাতে আমি খানিক বিস্মিত। এও বলে রাখা ভাল, নাম ধুয়ে জল খাওয়ার দলে আমি নই। হয়তো কথাটি খুব তীর্যকভাবে বলছি, অনেক সদস্য-সমর্থকদের ভাল না লাগারই কথা। কিন্তু বাস্তব জীবন বড়ই কঠিন।

একটা সময় ছিল যখন ক্লাবের পাশে কেউ ছিল না। কেউ ছিল না বললে ভুল হবে, যে ক্লাবের এত সদস্য-সমর্থক, তারা কীভাবে অসহায় থাকবে। ইস্টবেঙ্গল নামের মধ্যে একটা জাদু রয়েছে, যেটা আমি এখনও প্রতিনিয়ত অনুভব করি।

আমি ক্লাবের প্রথমে সমর্থক, তারপর বাকিটা। সেই বাকিটার মধ্যে আমার কোনও গর্ববোধ নেই। সবসময় সমর্থক হিসেবেই থাকতে চাই। পদ তো অলঙ্কার, সেই অলঙ্কারের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। সহসচিব পদে রয়েছি দীর্ঘ দুই দশক ধরে, সেই দায়িত্ব আমাকে ক্লাব দিয়েছে বলে আমি ধন্য, চেষ্টা করি সেই পদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে।

যেটা বলছিলাম, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে যে একটা সময় ইস্টবেঙ্গল আইএসএলে খেলতে পারবে কিনা সেই নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। আমরা সবাই চেষ্টা করেছি কোনও একটা উপায় বের করতে হবে, কোনও ভাল বিনিয়োগ খুঁজে বের করতে হবে। সেটা যখন পাওয়া গেল, তারপর আমাদের কত থাকবে, ওদের কত থাকবে, সেই ভাগ-বাটোয়ারা দেখে আমার দুঃখ তো হচ্ছেই, রাগও হচ্ছে।

সব থেকে বড় বিষয়, ক্লাবের নাম বদলের ভাবনা নিয়ে। অধিকাংশ সমর্থকদের মনের কথা থেকে বলছি, অনেকেই বলছে ইস্টবেঙ্গল নামটা কী আগে থাকবে, না পরে? আমাদের জার্সি, লোগো ঠিক থাকবে তো? ওদের কত শেয়ার রয়েছে, ক্লাবেরই বা কত? এসব আলোচনা শুনে ভেতরে ভেতরে নিদারুণ হাহাকার হচ্ছে।

এ আমরা কোথায় বাস করছি! যদি আমরা আইএসএলে ‘শ্রী সিমেন্ট ইস্টবেঙ্গল’ নামে খেলি, তাতে কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? নাকি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবটি বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ হবে? আমি জানি না এই ভাবনা কোথা থেকে আসছে। সারা বিশ্বে কর্পোরেটরাই এই মুহূর্তে ক্লাব পরিচালনা করছে। যারা সেই কর্পোরেটদের হাতে ক্লাব দেয়নি, সেই ক্লাব আটলান্টিকে ডুবে গিয়েছে। আমি বেশিদূর যেতে চাইছি না। ভারতে কত ক্লাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তার তালিকা দিলে আরও দুঃখ বাড়বে। সেটা আমি চাইছি না।

বরং আমাদের বাইচুং ভুটিয়া ইংল্যান্ডের যে ক্লাবে খেলতে গিয়েছিল, সেই বারি এফসি ক্লাবটাই বন্ধ হয়ে গেল তিন সপ্তাহ আগে। তারাও কর্পোরেটদের হাতে ক্লাব দিতে চায়নি। শুধু গোঁ ধরে বসে থাকলে বর্তমান আর্থিক মন্দায় ক্লাব চালানো, আর সার্কাস পার্টি চালানো একই বিষয়।

আমি বলছি না, নিজের সবটা দিয়ে সম্মান বিসর্জন দাও, সেটা কেন দিতে যাব। সবসময় আমরা জানি, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান দলগুলিকে সবাই ভালবাসে, তাদের পিছনে বিনিয়োগও করতে চায়। কারণ একটাই, ক্লাবগুলির সমর্থকরা, তারাই যে কোনও ক্লাবের অক্সিজেন। তাদের ভালবাসা, আবেগ এসব কেউ অস্বীকার করবে না, আমাদের ইনভেস্টররাও করবে না আশা রাখি।

এই যে বলা হচ্ছে ইস্টবেঙ্গল এফসি নামে খেলতে না নামলে সম্মান ধূলোয় মিশবে, এটা কী ঠিক যুক্তি? সারা বিশ্বে সব বড় ক্লাব দলের পিছনেই রয়েছে ইনভেস্টররা। তারা যা বলবে, সেটাই করা উচিত। কারণ তারা অর্থ ঢালছে, তারা সদস্য-সমর্থকদের দাবি মতো দলগঠন করছে, কোচ আনছে, ক্লাবের সুবিধে অসুবিধে দেখছে।

এখন তো কেউ বলে না, এসি মিলান নামের আগে ‘এসি’ কথাটি লেখা হচ্ছে কেন? সবাই জানে ‘এসি’ মানে অ্যাথলেটিক ক্লাব, তা কী ঠিক তথ্য? অ্যাসিও সিওজিওনে ক্যালসিও মিলান। ইনভেস্টরদের নাম আগে বসে পরে বসেছে ক্লাবের নাম মিলান। এমনকি এসএসসি নাপোলি, যে ক্লাবের হয়ে একসময় কাঁপিয়েছেন আমাদের সকলের মহানায়ক মারাদোনা। তারাও তো কর্পোরেটদের অঙ্গুলিহেলনে চলছে, তাদের খারাপটা কোথায় হয়েছে বলতে পারেন?

ইনভেস্টর ও ক্লাব কর্তাদের এক্তিয়ারটা আগে বুঝতে হবে। কেউ কারোর সীমানা টপকে না গেলেই হল। দক্ষিণ ভারতে শ্রী সিমেন্টের দারুণ রমরমা। আমরা ক্লাব অফিসিয়ালরা চাইছি যে ওনারা পূর্ব ও উত্তর ভারতেও ব্যবসা সম্প্রসারণ করুণ। ইস্টবেঙ্গল বড় ব্র্যান্ড সন্দেহ নেই, তারা যদি সেটিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের পাশে থাকে দীর্ঘমেয়াদীভাবে তাতে আমাদের লাভ।

আমি এটা জানি, কোম্পানি বাঁচলে আপনি বাঁচবেন। গোঁ ধরে বসে থাকার দিন শেষ, প্রয়োজনে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হবে, কারণ এটাই জীবনের শিক্ষা। তোমাকেও কিছু দিতে হবে, ওনাকেও কিছু ছাড়তে হবে। এখন দিন বদলেছে, একটা বিদেশী ফুটবলারের সঙ্গে বাৎসরিক চুক্তি হয় নুন্যতম দুই কোটি টাকা দিয়ে। আগে আমরা এসব ভাবতেই পারতাম না। সেখানে যদি কর্পোরেটদের স্বাধীনতা দেখতে হয়, তা হলে ক্ষতি কোথায়?

আমরা যে ইনভেস্টর পেয়েছি, এরা ইস্টবেঙ্গল অন্তপ্রাণ। আপনাদের-আমাদের মতোই অন্ধ সমর্থক, এদেরও অভিপ্রায় আগে ক্লাবের প্রতি আবেগ রেখে চলা, তারপর ব্যবসা। তাই আমরা আশায় রয়েছি, ভালই হবে। নেতিবাচক জিনিস ভাবলে নেতিবাচকই হয়, তাই ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে আমরা দুইপক্ষই এগিয়ে যেতে চাইছি। আপনারা সদস্য-সমর্থকরা দয়া করে পাশে থাকুন, আমাদের ভাল হবেই।

ও আরও একটা কথা, আমরা ইস্টবেঙ্গল। আমাদের রক্তে লড়াই। আমরা মানুষের সাহায্য ভুলি না, আমরা অকৃতজ্ঞ নই, তাই শ্রী সিমেন্টের আধিকারিকদের সম্মানও আমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে সারা বিশ্বে যখন আর্থিক মন্দা, সেইসময় তারা আমাদের হাত ধরেছে, তাই আমরাও তাদের হাত সহজে ছাড়ব না। তারপর তো খেলা হবে মাঠে, ইস্টবেঙ্গল রানার্স হতে নয়, চ্যাম্পিয়ন হতেই মাঠে নামে, এবারও তাই হবে, দেখে নেবেন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More