কেসটা কী বলুন তো কেষ্টা?

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

হিন্দোল ভট্টাচার্য

বিশ্বাস করুন অনুব্রত, আমরা আপনাকে ভয় পাই। এমনকী শোলের গব্বর সিং-এর মতোই বীরভূমের বাচ্চারা না ঘুমোতে চাইলে তাদের মায়েরা বলে – শুয়ে পড় বাবু, নাহলে কেষ্টা এসে যাবে। উন্নয়নের দরকার নেই, আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলেই হবে। বিরোধীরা পরের কাছ থেকে ধার করে বাস ধরে মহানগরে ফিরে যাবে।  স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ না পেয়ে চিকিৎসা না পেয়ে মরে গেলেও মানুষ আবার বেঁচে ওঠে। আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে আরও কত কী হয়, সে সব বেশ এ মার্কা ব্যাপার, এখানে বলা মানা। তা আপনাকে ভয় পেলেন না উনি? কী যেন নাম- শঙ্খ ঘোষ। আরে আপনি কী করে জানবেন? যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কবিতা লিখে গেছেন সে ভাষায় অন্য কারও কবিতা পড়ার দরকার আছে নাকি? আপনি একটা কাজ করবেন জানেন? বাঙালি কবিদের বড্ড বাড় বেড়েছে। ওই বিজেপির লোকেরাও বলে। দাঁড়িয়ে পড়ুন তো স্কুলে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে, বইমেলায়, লিটল ম্যাগ মেলায়। দাঁড়িয়ে পড়ুন কলেজ স্ট্রিটে। কী সব বইয়ের দোকান আছে, কফি হাউস ইত্যাদি। একবার গিয়ে দাঁড়ান। দেখবেন সব কবির ইয়ে পেয়ে গেছে। আচ্ছা কী করবে মানুষ কবিদের কথা শুনে? তারা কি পেটো বাঁধতে পারে? তোলা আদায় করতে পারে? বন্দুক ঠেকিয়ে ভোটের বাপ মা মাসি মামা সবাইকে এক ঘাটে শুইয়ে দিতে পারে? আপনি পারেন। আগেকার দিনে বর্গীদের আসা নিয়ে গান বাঁধা হয়েছিল। খোকা ঘুমোলো পাড়া জুড়োলো বর্গী এলো দেশে। চিন্তা করবেন না, আপনাকে নিয়েও গান বাঁধা হবে। আচ্ছা আপনি কি মনে মনে ভীত? সন্ত্রস্ত? না হলে এত সন্ত্রাস করেন কেন? আমরা তো জানতাম সেই সন্ত্রাস করে, যে বেশি সন্ত্রস্ত। তা যাক, এসব অপ্রিয় প্রসঙ্গ থাক।

কথা হচ্ছিল কবিতা নিয়ে। আচ্ছা কেষ্টা, বলুন তো কেসটা কী? সকলে তো সব বিষয় নিয়ে জানে না। যেমন শঙ্খবাবু পেটো বাঁধতে পারেন না, তেমন আপনি কবিতা লিখতে। পড়েনওনি। কিন্তু আপনি কি জানেন না, আপনি না পড়লেও অনেক কিছু আছে, থাকতে বাধ্য। কারণ দেশ, দশ, পার্টির গুরুদায়িত্বে আপনি পড়াশুনোটা করেন না। আহা সে তো জনস্বার্থে। কিন্তু ৮৬ বছর বয়স্ক ওই ‘নতুন’ কবি-টা , যিনি দেশিকোত্তম, সাহিত্য আকাদেমি, জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন, তিনি যে ছড়াটা লিখেছেন, তা কি পড়বেন আপনার বীরভূমের কৃষকেরা? আপনি এত রেগে গেলেন কেন? নিজের দুর্বলতা কি প্রকাশ করা ভালো? বলুন তো কেষ্টা, আপনি যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে কবি হিসেবে জানেন, এতে তাদের বাপ চৌদ্দ পুরুষ তো উদ্ধার হয়ে গেছে ,তাতে কি  আপনার তৃপ্তি হল না? অবশ্য আপনি শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কবি হিসেবে স্বীকার করলেন না – এটা ঠিক কাজ হল না। একটা কথা চুপিচুপি বলি, আপনাকে কিন্তু বিজেপি লুফে নেবে। কারণ আপনি অন্তরে ফ্যাসিস্ট, বাইরে দলদাস। কিন্তু যদি তেমন সুযোগ পান, তেমন দল আপনাকে ডাকে, যাবেন না? ভেবে দেখুন, আপনার ফ্যাসিস্ট সত্ত্বা তো সেখানেই পরিপূর্ণতা লাভ করবে। মমতাদেবী আপনাকে নিয়ে পারবেন ফ্যাসিস্ট বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে? কারণ আপনার তো শুধু জার্সি আলাদা। ধর্মে তো আপনি মৌলবাদী। আরে , দাদা, মৌলবাদী কি আর শুধু সাম্প্রদায়িক হলে হয়? এই যে যা যা আপনার বিরুদ্ধ মত, তাকে আপনি ধ্বংস করে দিতে চান। তা সে বর্ষীয়ান, সকলের প্রণম্য কবি হলেই বা কী! তাঁকে অপমান করতে আপনার একবিন্দু সময় লাগে না। কারণ? কারণ তিনি আপনার হিমালয় স্বৈরাচারী বেলুনে ছোট্ট আলপিন ফুটিয়ে দিয়েছেন বলে। কিন্তু এ যদি কবি না হয়ে আপনার ঘরের কাছের কৃষক হল,তাহলে? প্রাণে বাঁচত বলুন?

লোকে বলছে আপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে যাচ্ছে। না, কবি শঙ্খ ঘোষের কিচ্ছু এসে যায়নি, আপনার কথায়। কারণ আপনার এই প্রতিক্রিয়া তো কেবল একধরনের প্রতীক। আসল কথা হল, আমার বিরুদ্ধে যে, তাকে পিষে মেরে দেব। আমি যা জানি না, তা নেই। আর আমি সব জানি। কবিতা, ক্রিকেট, হাঁচি কাশি টিকটিকি, ইলেকশন, ভগবান, -সব। আর আমি যা জানি না, সব নতুন, সব আমার বিরুদ্ধে। তাদের সবাইকে আক্রমণ করার অধিকার আমার আছে। তো, কথা হল, আপনার সাথে বিজেপির ফারাক তাহলে নেই। আসলে আপনার তো কোনও পার্টি নেই তিস্তা পারের বৃত্তান্তের বাঘারুর মতো। কিন্তু সে হল গিয়ে শোষিত শ্রেণি, আর আপনি হলেন শাসক শ্রেণি। সে হল সব হারানো একজন মানুষ। আর আপনি হলেন সব কিছুর অধীশ্বর একজন পাতি গুন্ডা। কিন্তু গুন্ডা আপনাকে করেছে কে? যারা আপনার শক্তিকে কাজে লাগাতে চায়, তারাই। আপনার শক্তিকে আরও ভালো ভাবে কাজে লাগাতে পারে কারা? থাক , তাদের কথা। তারা না হয় যখন রামের চৌদ্দ পুরুষের বাস্তুভিটা সংরক্ষণের দায়িত্ব দেবে আপনাকে, আপনি না হয় তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবেন। অবশ্য এটাও সম্ভাবনার কথা। আপনি আবার রেগে যাবেন না যেন। দেখুন, আপনি হলেন স্বয়ং উন্নয়ন। জনপদবধূরা যেমন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তেমন আপনার উন্নয়ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। বিশ্বাস করুন, তাদের অবস্থা ভালো নয়। কাস্টমার না পেলেই তাদের পেটে ভাত পড়ে না। আপনার উন্নয়ন রাস্তায় যদি রঙ চং মেখে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে ভালো হবে বলুন? অন্তত উন্নয়নকে একটা ফ্ল্যাট দেওয়াও গেল না? একটা অফিস? উন্নয়ন কি রিক্সায় চেপে বাজারে গিয়ে বাজার করে দরদাম করে? বলুন কেষ্টা, বলুন। আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সারা বাংলাদেশ।

যাক গে, এসব ছাড়ুন। শঙ্খ ঘোষ হলেন নতুন কবি। ক্ষমাঘেন্না করে দিন। বয়স বাড়লে নিশ্চয় বুঝতে পারবেন। আর শুনতে পাচ্ছি আপনার নামে পুরস্কার চালু হচ্ছে। শ্রেষ্ঠ নতুন কবি পাবেন সেরার তকমা। প্রতি বছর। আহা! এবার বাংলা কবিরা যদি একটু ভালো থাকে। আর আপনি একটু নতুন কবিদের তোলার ভার নিন না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পর বাংলা কবিতার অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন। একটু উন্নয়ন দরকার। তা, সে উন্নয়ন কি আপনি না এলে হবে?

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

(হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More