রস 

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের কথা বলা তো খুব সহজ।

তাছাড়া এই পঁচিশে বৈশাখের পুণ্যদিনে একটু তো বলতেই হবে। সেই জীবনদেবতার গল্প। কিন্তু তার বাইরেও অনেক কিছু বলার থাকে। বলা দরকার। আজকের এই ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংকটের দিনে। বাংলা ভাষা, বাংলা চেতনা, মূল্যবোধকে জোর করে ভুলিয়ে দেওয়ার দিনে।
বহুকাল আগে থেকেই এই সাংস্কৃতিক ধ্বংস শুরু হয়েছে। এখন আমরা সেই বিষবৃক্ষের ফল দেখছি শুধু।
আমাদের বাংলা সিনেমায় যেই ঝুলে যাবে গল্প, দেখবেন একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে এলো। হয়ত দেখবেন একেবারে বাজে গল্প, বাজে অভিনয়, এবং সিনেমার ভাষাই জানা নেই, শুধু টাকা আছে বলে ছবির ব্যবসায়ে নেমেছে আরো কিছু টাকা করবে বলে। মারোয়াড়ি প্রযোজক, আর বাঙালি পরিচালক। এইভাবে কত সিনেমাই যে আমাদের ছোটবেলা থেকে দেখতে হয়েছে। তখন দেখেছি কৈশোর, যৌবনের প্রবল উত্তেজনায়, পয়সা ছিলনা বলে নিশিপদ্ম বা জীবন জিজ্ঞাসা টাইপের বাজে সিনেমাও বন্ধুদের সঙ্গে লাইন দিয়ে দেখেছি মারামারি করে। তারপর এলো সত্তর একাত্তর। নকশাল আমলে হাই স্কুল। বোমা, ক্লাস কাটা, সিগারেট, সস্তা ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট পর্নোগ্রাফি চটি বই। একদিকে ইন্টারভিউ কলকাতা একাত্তর সীমাবদ্ধ চলছে, আর একদিকে ববি আর ইয়াদো কি বরাত। ঠিক ধারণা ছিলনা আসল রস কাকে বলে। একটু একটু বুঝতে পারতাম মনের মধ্যে-যে উত্তমকুমারের আশি শতাংশ ছবিই বসে দেখা যায়না। বুঝতে পারতাম হাতি মেরে সাথী বা আপনা দেশ বা জঞ্জীর একেবারে ট্র্যাশ। কিন্তু, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বিকৃত রস চটচটে রসগোল্লার মত গায়ে মেখে বাড়ি ফিরে এসেছি। টাইগার সিনেমার খারাপ হয়ে যাওয়া এয়ার কন্ডিশন হলে ঘামতে ঘামতে বাজে, সস্তা মার্কিন ছবি দেখে নিষিদ্ধ উত্তেজনায় আর্ত হয়ে লিন্ডসে স্ট্রীটে নগ্ন বিদেশী নায়িকাদের ছবি চুরি করে দেখেছি। রবীন্দ্রনাথের কথা সবাই বলতে পারে, আমিও একটু একটু পারি। কিন্তু বলে কী লাভ? ও তো সবাই জানে। সত্যজিত রায় ঋত্বিক ঘটক তপন সিন্হা মৃণাল সেন জানেনা কে? বাড়ির পাশে রঙ্গনাতে অজিতেশ কেয়া রুদ্রপ্রসাদ তখন দুর্দান্ত তিন পয়সার পালা জমিয়েছেন। ওদিকে বিনা পয়সায় টিকিট পেয়ে একাডেমীতে কুমার রায় শাঁওলি মিত্র দেবতোষের পাগলা ঘোড়া দেখে ফেললুম। ওঃ, সে কী গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিনয়! চেতনার মারীচ সংবাদ, উৎপল দত্তকে দেখলাম টিনের তলোয়ারে। গা কেঁপে ওঠে কী অদ্ভুত এক ঐশ্বরিক প্রেরণায়!
পাড়ায় পাড়ায় টিন দিয়ে ঘিরে কাঠের চেয়ারে বসে হেমন্ত, দ্বিজেন, শ্যামল মিত্র, আরতি, নির্মলা মিশ্র, নির্মলেন্দু, পিন্টু ভটচাজ শুনছি। কালীপুজোর পর আমাদের বিডন স্ট্রীটের ভবতারণ সরকার স্কুলে সারা রাত কল্যাণী রায় জয়া বিশ্বাস বাহাদুর খাঁ শ্যামল বোস। আবার আর এক জায়গায় ফ্রিতে হেমন্ত দেবব্রত সুচিত্রা দি সুমিত্রা দি।
রসের বন্যা। প্লাবন বললে ঠিক হয়।
সব কথা আমার স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনীতে লেখা সম্ভব হয়নি। সব কী আর লেখা যায় একটা বইতে?
দেবব্রত বিশ্বাস জলদমন্দ্র সুর লাগালেন,
“ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি, বনের পথে যেতে, ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে, ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই তান।”
তারপর, “বিস্ময়ে তাই জাগে” বলার সঙ্গে সঙ্গে সারা গায়ের মধ্যে দিয়ে যেন একটা ঢেউ খেলে গেল। রোমকূপগুলো দিয়ে যেন একটা স্বর্গীয় শিহরণ। এ রস অন্য রস। যে বোঝে, সে বোঝে। যে বোঝেনা, তাকে কী করে বোঝাই?
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একটা কাঠের চেয়ারে সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে বসে, মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে, সুর লাগালেন,
“ভ্রমর সেথা হয় বিবাগী নিভৃত নীলপদ্ম লাগি রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গিবিহীন অন্ধকারে বারে বারে।”
অথবা, রেডিওতে শুনলাম রাত্তিরবেলা ঘুমের মধ্যে চুপিচুপি,
“পার হয়ে যাব কত ভাবনার সাঁকো মাছরাঙা মন যেন কাঁচভাঙা চোখে তার রং খুঁজে পায়।”
কী করে বোঝাই এ রস! বর্ণনা করা-কি যায়?
মাছরাঙা মন কাঁচভাঙা চোখে রং খুঁজে পায়। কে লিখে গেছেন, কে জানে? আমরা তো খবর রাখিনা। এত রসের সমুদ্রে কত রত্নরাজি। বাঙালি নেহাতই হতভাগ্য, বিস্মরণমুখী জাত। এই অরূপ, অপূর্ব রস ছেড়ে দিয়ে স্থূলতা ইন্দ্রিয়গামিতার শিকার হয়েছে।
বাংলা ভাষাটাই জানেনা এখন। কী দুর্দশা আমাদের!
কথা, কাব্য, কল্পনা, ইমেজারি, কোমলতা, সুর, কন্ঠ, পরিবেশ, গ্রহণ করার শিক্ষা আর মানসিকতা, আর সারা মন প্রাণ দিয়ে শুষে নেবার ক্ষমতা শিশুর মত সারল্য নিয়ে আর ঈশ্বরলাভের অনুভূতি নিয়ে — এই সব কিছু মিলেমিশে হয় রসের সৃষ্টি। শিল্পী, লেখক, গায়ক, গায়িকা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, সুরকার সবাই যেমন আছেন সে রসের যোগান দেবার জন্যে, তেমনি আছেন অন্যদিকে বসে খোলা মন নিয়ে, মন্দির মসজিদে প্রার্থনার পবিত্রতা নিয়ে দর্শক শ্রোতা পাঠক পাঠিকা।

সবাই মিলে তৈরী করছেন রসের সে সার্থক সৃষ্টি।

(লেখক মানবাধিকার কর্মী। বর্তমানে থাকেন নিউ ইয়র্কে। তাঁর স্মৃতিকথা ‘ঘটিকাহিনী’ পাঠকমহলে সমাদৃত)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More