বিকিয়ে যেতে রাজি দেশের সংবাদমাধ্যম, ব্যতিক্রম বর্তমান ও দৈনিক সংবাদ

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শমীক ঘোষ: মে ২৫, ২০১৮। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের ইতিহাসের এক অন্যতম কালো দিন। একই সঙ্গে বাংলার সংবাদ মাধ্যমের অন্যতম উজ্জ্বল দিনও। কারণ এই দিনেই প্রমাণ হল, মাত্র দুটো প্রতিষ্ঠান হলেও, অদ্ভুত আঁধারে শিরদাঁড়া সোজা রেখে টাকার দম্ভ আর লোভকে অগ্রাহ্য করতে পারে বাংলার সংবাদ মাধ্যমই। আদর্শে অবিচল বাংলার সেই দুই দৈনিকের নাম বর্তমান পত্রিকা ও দৈনিক সংবাদ।

জরুরি অবস্থার সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ায় প্রতিবাদ করেছিলেন এই বাংলারই বরেণ্য সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ। লিখেছিলেন, আমি মনে করি আমার লেখার অধিকার, আমার মত প্রকাশের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার অর্থ আমার অস্তিত্বকে হত্যা করা। তেরো বছরের কিশোর ছেলেকে লেখা ‘পিতার পত্র’ নামের সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছিল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার অকাট্য সব যুক্তি। এর জন্য শেষ অবধি জেলেও যেতে হয়েছিল তাঁকে।

চার দশক পরে, টাকার কাছে সেই লেখার অধিকার, মত প্রকাশের ক্ষমতাই বিকিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল দেশের ২৭টা সংবাদ প্রতিষ্ঠান। স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল, টাকার জন্য দেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকেও বিক্রি করে দিতে পারে তারা। ইচ্ছাকৃত পক্ষপাত করে বিষিয়ে দিতে পারে সাধারণ মানুষের মন। একপেশে মিথ্যে খবর প্রকাশ করে কোনও একটি দলের স্বার্থে প্রভাবিত করতে পারে ভোটের ফলাফলও।

সেই সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোই, যাঁরা টেলিভিশন চ্যানেলে বা দৈনিকের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় বড়াই করে নিজেদের পক্ষপাতহীনতার । তুলোধনা করে রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির। নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে প্রচার করে।

দেশের নামকরা সংবাদ মাধ্যমগুলোর এই চেহারাই দেখিয়ে দিল তদন্তমূলক সাংবাদিকতা করা ওয়েবসাইট কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশন। ওয়েবসাইটে এবং ইউটিউবে প্রকাশ করা এই স্টিং অপারেশনের ভিডিওতে ভেসে উঠল সংবাদমাধ্যমের লজ্জাজনক চিত্র।

এই স্টিং অপারেশনের নাম অপারেশন ১৩৬। সাংবাদিকদের নিরপেক্ষতার বিচারে বিশ্বের মধ্যে ভারতের স্থানও ১৩৬ নম্বরেই।

এই ভিডিওগুলোতে দেখা যায় কোবরাপোস্টের সাংবাদিক পুষ্প শর্মা ‘আচার্য অটল’ নাম নিয়ে যোগাযোগ করছেন দেশের প্রথমসারির, প্রভাবশালী দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলির সঙ্গে। নিজেকে তিনি পরিচয় দিচ্ছেন হিন্দুত্ববাদী ‘সংগঠনের’ সদস্য বলে। এই ‘সংগঠন’ কে বা কারা সেটা কিন্তু কখনই স্পষ্ট করেননি তিনি।

তাঁর দাবি, অর্থের বিনিময়ে প্রচার করতে হবে ‘হিন্দুত্বের’ অ্যাজেন্ডাকে। রাম ও অযোধ্যার প্রসঙ্গ বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। তাই তার বদলে ব্যবহার করতে হবে শ্রীকৃষ্ণ ও গীতাকে। গীতার মাহাত্ম্য প্রচারের নাম করে সুকৌশলে প্রচার করতে হবে বিভাজনের রাজনীতির। প্রথম তিনমাস শুধুই হিন্দু ধর্মের কথা বলে তৈরি করতে হবে অনুকূল পরিস্থিতি। তারপরে সুযোগ বুঝে চারিয়ে দিতে হবে কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতাদের বক্তব্য। লোকসভা ভোটের ঠিক আগে আক্রমণ করতে হবে রাহুল গান্ধী, অখিলেশ, মায়াবতীর মতো বিরোধী নেতাদের। পাপ্পু, বাবুয়া, বুয়ার মতো নাম দিয়ে তাঁদের মানুষের চোখে হাস্যাস্পদ করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

এই প্রচার চালাতে হবে দৈনিক, টেলিভিশন, রেডিও, ডিজিটাল, নিউজ পোর্টাল এমনকি ফেসবুক টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যমেও।

‘আচার্য অটল’-এর এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয় মাত্র দুটো দৈনিক – বর্তমান পত্রিকা ও দৈনিক সংবাদ। দুটো পত্রিকাই পশ্চিমবাংলার।

বর্তমান পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিস মুখোপাধ্যায়কে দেখা যায় ‘আচার্য অটল’-এর এই প্রস্তাবে স্পষ্ট না বলে দিতে। Thewall.in এর তরফে আশিসবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি ওই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বিখ্যাত সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের কথা বলেন। তিনি জানান, “বরুণ বাবু আমাদের একটা শিক্ষা দিয়েছিলেন। কেউ যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করেন তাহলে তাঁর বিজ্ঞাপন ছাপবে। কিন্তু কেউ যদি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অন্যের ভাবাবেগে আঘাত করতে চায় তাহলে তাঁর বিজ্ঞাপন ছাপবে না। ‘আচার্য অটল’ নামের ওই ব্যক্তিকেও এই কথা পরিষ্কার করে দিয়েছিলাম আমরা।”

একই ভাবে দৈনিক সংবাদের এক আধিকারিককেও দেখা যায় এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে। তিনি বলেন এই ধরণের কাজ ওই সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নীতিবিরুদ্ধ।

এই দুটো দৈনিক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হলেও দেশের সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক চিত্রটা কিন্তু  সম্পূর্ণ উল্টো। স্টিং ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এই সমস্ত সংবাদ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরাই এই ধরণের বিদ্বেষমূলক খবর প্রচার করতে রাজি । কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, তাঁরা রাজনৈতিক ভাবে হিন্দুত্ববাদীদের কাছাকাছি। কেউ বলছেন তাঁরা চাইলেই কর্নাটকের ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করতে পারেন। একটি সংবাদ মাধ্যমের এক কর্তা আবার বলছেন, তাঁরা এই ধরণের খবর করবেন। তবে একই সঙ্গে নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশ ধরে রাখতে হিন্দুত্ববাদীদের বাড়াবাড়িরও নিন্দা করবেন।

বিখ্যাত এক সংবাদ মাধ্যমের মালিক ‘আচার্য অটল’ সেজে থাকা সাংবাদিককে কালো টাকা সাদা করার উপায়ও বলে দিয়েছেন বলে দাবি করেছে কোবরাপোস্ট। জানা যাচ্ছে, তিনি বলেছেন যে দরকারে ‘আচার্য অটল’-এর সংগঠন তাঁদের নগদ টাকাও দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনি নিজেই বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বন্দোবস্ত করে দেবেন, যাতে ‘সংগঠন’-এর ক্যাশ টাকা নিয়ে তাঁরা ওই সংবাদমাধ্যমকে চেক দিয়ে দেয়।

তবে এর মধ্যেই কোবরাপোস্টের এই স্টিং অপারেশন বন্ধ করার জন্য দিল্লি হাইকোর্টে গিয়েছে দেশের একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠান।

বর্তমান পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্ত ছিলেন কলকাতার  এক দৈনিকের রাজনৈতিক সংবাদদাতা। জরুরি অবস্থার প্রতিবাদ করে গৌরকিশোরবাবুর সঙ্গে জেলে যান তিনিও। বরুণবাবুর মৃত্যুর পর তাঁর দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান পত্রিকা। এই ঘটনায় বর্তমানের ভূয়সী প্রশংসা করছেন বিদ্বজনেরা।

তবে দেশের প্রায় সব প্রথমসারির সংবাদ মাধ্যমের এই ভাবে বিকিয়ে যাওয়ায় ভয় পাচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই। তাঁরা বলছেন, জরুরি অবস্থার সময় সংবাদমাধ্যম তীব্র প্রতিবাদ করেছিল সরকারি স্বেচ্ছাচারিতার। আর এখন দেখা যাচ্ছে সেই সংবাদমাধ্যমের বড় অংশেরই বিভাজন ও ঘৃণার কারবারিদের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দিতে কোনও আপত্তি নেই। বিখ্যাত আমেরিকান তাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি বলেন, আমেরিকার সংবাদমাধ্যম আসলে সেই দেশের শাসকদের পক্ষে সাধারণ মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ বা ‘সম্মতির উৎপাদন’। এখন দেখা যাচ্ছে এই দেশের সংবাদমাধ্যমেরও সেই একই চেহারা। দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য এর থেকে খারাপ আর কিছু হতে পারে কি?

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More