সোমবার, এপ্রিল ২২

সমুদ্র তো এমনই, রক্ষী না থাকলে বিপদ কিন্তু আসবেই

রেশমী পাল

পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ মোটে স্থল। অথচ আমরা স্থলের খবর যতটা রাখি, জলের খবর ততটা রাখি না।

উপর থেকে দেখা যাওয়া ফেনিল ঢেউয়ের ঢাকনার তলার মুখ লুকিয়ে থাকা সে এক আশ্চর্য পাতালপুরী, যেখানে বিচিত্র-দর্শন প্রবালেরা, স্পঞ্জেরা আসর সাজিয়ে বসে আর তাদের ফাঁকফোকর দিয়ে তুরতুরিয়ে সাঁতরে বেড়ায় আশ্চর্য সব মাছেরা। সেই দুনিয়ার ছবি কেবল ডিসকভারি বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পর্দাতেই দেখা যায় না, আমরাও সেখানে ঢুকতে পারি যদি স্কুবা ডাইভিং-এর প্রশিক্ষণ থাকে।

এটা যে দিন থেকে জানলাম, সে দিন থেকে জীবনের উইশলিস্টের দৈর্ঘ্য বেড়ে গেল বেশ খানিকটা। আর পন্ডিচেরীর ডাইভিং স্কুলে ওপেন ওয়াটার ডাইভিং-এর কোর্স করে সেই পাতালপুরীতে বিচরণের ছাড়পত্রও পেয়ে গেলাম এক দিন। প্রশিক্ষণের সময় প্রথম বার যখন ডাইভিং করতে গেলাম, মাঝসমুদ্রে নৌকা থেকে ঝাঁপ মারতে বুক ঢিপঢিপ করছিল। নাক-চোখ ঢাকা মাস্ক, পায়ে ফিন, কোমরে লোহা-লাগানো ওয়েটবেল্ট, গায়ে বিসিডি নামে একটা ফাঁপা জ্যাকেট আর পিঠে হাওয়া-ভরা সিলিন্ডার— এত্ত লটবহর নিয়ে ওই উত্তাল ঢেউয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া!

কার্যক্ষেত্রে অবশ্য দেখা গেল ওই চোখে দেখতে পাওয়া পেল্লায় ঢেউগুলো একটু নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারে বড় জোর। আসল গল্প তার নীচের স্তরে। বিসিডির থেকে হাওয়া ছেড়ে ছেড়ে শরীরের আয়তন কমিয়ে কমিয়ে যখন একটু একটু করে নামছি, তখন টের পাচ্ছি কি অসম্ভব জোর সমুদ্রের! নীচে নামার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারছি স্রোতের টান আর অভিমুখ কেমন করে বদলাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে। এই সময় প্রতিটা হাত-পা নাড়া হতে হবে প্রয়োজনমাফিক। বেহিসেবি নড়াচড়া মুহূর্তের মধ্যে ডাইভিং পার্টনারের থেকে অনেক দূরে নিয়ে চলে যাবে। বিসিডি থেকে হাওয়াও ছাড়তে হবে বুঝেশুনে। একসঙ্গে হুস করে অনেকটা নামা বা ওঠা দুই-ই মারাত্মক বিপজ্জনক, এমনকি প্রাণঘাতীও।

কারণ প্রতি ইঞ্চি গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে বদলায় জলের চাপ। আমাদের শরীরের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, প্রতিটা শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে তার প্রভাব পড়ে। তাই শরীরকে একটু একটু করে সইয়ে সইয়ে নিয়ে নামতে-উঠতে হয়। এই যে সমুদ্রের স্রোত আর জলের চাপ, যা আমরা ডাইভিং-এর সময় শরীর দিয়ে বুঝতে পারি, আরও বেশি বুঝতে পারি প্রতিটা ছোট ছোট ভুলভ্রান্তির মাশুল দিতে গিয়ে, এ সব কিন্তু কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই ওপর ওপর। গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়া-কমার একটা অঙ্ক আছে না হয়, কিন্তু স্রোত? আপাতদৃষ্টিতে যে সমুদ্রকে নিরীহ ও শান্ত মনে হচ্ছে, তারই ঢেউয়ের তলায় থাকতে পারে মারকুটে চোরাস্রোত। ভারত-সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দু-তিনটি দেশে অনেক বার স্কুবা ডাইভিং করেছি, কিন্তু আজও সমুদ্র দেখে আন্ডারকারেন্টের নাগাল পাই না।

মন্দারমণিতে এভাবেই রয়েছে হোটেলের গায়ে অরক্ষিত উপকূল

এক বার স্নরকেলিং করতে গিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে মরতে বসেছিলাম। স্নরকেলিং মূলত জলের সারফেসে সাঁতার, তবে শ্বাস নেওয়ার জন্য মুখ তুলতে হয় না। কারণ মুখের সাথে লাগানো থাকে একটা নল, যার অন্যপ্রান্তটা ওপরে হাওয়ায় খোলা থাকে। এখানে বিসিডি পরতে হয় না, পিঠে হাওয়াভরা সিলিন্ডারও থাকে না। জলের তলায় ডুবতেও হয় না। ডাইভিং-এর চাইতে স্নরকেলিং ঢের বেশি সোজা, যদি না প্রচণ্ড আন্ডারকারেন্ট থাকে।

এক বার এভাবেই সমুদ্রের চরিত্র ওপর থেকে বুঝতে না পেরে স্নরকেলিং করতে করতে চলে গিয়েছিলাম এমন একটা জায়গায়, যেখানে সমুদ্র কেবলই পিছন দিকে টানছে। সর্বশক্তি দিয়ে সাঁতরে যাচ্ছি ঢেউয়ের বিরুদ্ধে, এক চুলও এগোতে পারছি না। সমুদ্রের পাড়ের ঘরবাড়ি গাছপালা একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। কেউ যেন অদৃশ্য দড়ি দিয়ে সারা শরীরকে বেঁধে পিছনে টানছে। বিশাল বিশাল ঢেউ যাচ্ছে মাথার ওপর দিয়ে। স্নরকেল দিয়ে হাওয়া নয়, জল ঢুকছে খালি। শ্বাস নিতে গিয়ে হাওয়া নয়, জল টানছি বারবার। না ডুবে যাইনি। সমুদ্রের নোনাজলে কেউ সহজে ডোবে না। এই ভাবে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়তে লড়তে শরীরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে ফেলে, হাওয়ার বদলে নাকমুখ দিয়ে জল টেনে বিষম খেয়ে খেয়ে মরে যায় সব্বাই।

এই যে দীঘা-মন্দারমনিতে প্রতি বছর এত মানুষ মারা যান, তাঁরা ঠিক এভাবেই মারা যান। কিন্তু আমি বেঁচে আছি, এ সব সবিস্তারে ব্যাখ্যা করছি, এই সুযোগ তাঁরা পান না, কারণ দুর্ভাগ্যবশত আমার দেশে কোস্টাল সিকিউরিটির কোনো ব্যবস্থা নেই। মরতে বসার আগের মুহূর্তে অসহায়ের মত শূন্যে হাত নাড়াচ্ছিলাম। অনেক দূরে মাচার ওপর বসে থাকা কোস্টাল গার্ডদের দূরবীনে ধরা পড়েছিল সেই দৃশ্য। ওঁদেরই এক জন এগিয়ে এলেন সার্ফবোর্ডে করে। তারপর সেই বোর্ড ধরে ধরে শরীরটাকে জলের ওপরে তুলে তুলে কিছুটা এগোতে কোস্টাল সিকিউরিটির নৌকা এসে আমাদের তুলে নিল। পরে ওদের ক্যাম্পে গিয়ে দেখেছি নিরাপত্তার যাবতীয় বন্দোবস্ত ওদের ওখানে মজুত। উদ্ধার হওয়া মানুষটির তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর জন্য অক্সিজেন, ওষুধপত্র হাতের নাগালেই আছে। কয়েক জন দূরবীনে চোখ লাগিয়ে দিনভর নজরদারি চালাচ্ছেন। আর ওখানে প্রত্যেক কর্মীই এই সব জরুরিকালীন অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

আর আমার দেশে কি দেখি? সমুদ্রের পাড়ে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা হোটেল আর হোটেল। সমুদ্রে নামা মানুষদের নজরে রাখার কেউ নেই। মাঝে মাঝে জলোচ্ছ্বাসের আগাম সতর্কতা থাকলে সমুদ্রে নামার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, পুলিশ সেই মতো সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সক্রিয়তাও কেবল নিয়মমাফিক টহলেই সীমাবদ্ধ।

ন্যূনতম কী কী সুরক্ষা থাকা উচিত সমুদ্র সৈকতে?

  • কয়েক জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রেসকিউ-সার্ফার।
  • তাৎক্ষণিক বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো কয়েকটা সার্ফিং বোর্ড।
  • জল থেকে কাউকে তুললে, সিপিআর দিতে পারা এবং ন্যূনতম ফার্স্ট-এড জানা কোনও চিকিৎসক।
  • অক্সিজেন সিলিন্ডার।
  • ভাটার সময়ে সমুদ্র থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে পর্যটকদের আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

আমি পন্ডিচেরী থেকে ডাইভিং কোর্স করেছি, তার পর ডাইভিং করেছি মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ায়। অভিজ্ঞতার তুলনা করে বুঝতে পারি, বঙ্গোপসাগর অনেক বেশি মারাত্মক। অনেক বেশি আন্ডারকারেন্ট সেখানে। সে জন্য এখানে প্রবাল প্রাচীরও গড়ে ওঠে না তেমন। আর এই আন্ডারকারেন্টের চরিত্রও বদলায় জোয়ার-ভাটা, ঝড়বৃষ্টি ইত্যাদির সাথে সাথে। সেই কারণেই বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কোস্টাল সিকিউরিটির প্রয়োজনীয়তা আরও অনেক বেশি।

বিদেশে অনেক জায়গায় দেখেছি, জলের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় পতাকা পুঁতে মার্ক করা আছে। এই অংশের মধ্যে যাওয়া বা এই জায়গাটা পার হওয়া বিপজ্জনক এটা বোঝাতে। আমাদের সমুদ্রসৈকতগুলিতে সেই ন্যূনতম বন্দোবস্তও নেই। অনেকেই ভাবেন জলের অনেকটা গভীরে যাওয়াটাই বিপদ ডেকে আনা। এত সহজ নয় কিন্তু ব্যাপারটা। ডাইভিং করতে গিয়ে বুঝেছি সমুদ্র কেমন গোলমেলে। পাড়ের কাছাকাছিই এমন একটা এলাকা থাকতে পারে, যে আবর্তে ঢুকে গেলে আর বার হওয়া কঠিন হয়ে যায়।

এ সব কি একজন সাধারণ পর্যটকের পক্ষে বোঝা সম্ভব? আজকে সমুদ্রে নেমে কারও মৃত্যু হলে আমরা কারণ খুঁজতে বসি সে মদ খেয়ে জলে নেমেছিল কি না। যদি পেটে মদ না-ও পাওয়া যায়,তবুও ওটাই একমাত্র কারণ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিংবা মৃত মানুষটির বয়স কম, অর্থাৎ বিবেচনা কম।

যখন ভারত মহাসাগরে আমার সলিলসমাধি হতে যাচ্ছিল, তখন আমার পেটে কিন্তু অ্যালকোহল ছিল না। তা ছাড়া ডাইভিং-এর প্রশিক্ষণ আর অজস্র বার স্নরকেলিং করায় সমুদ্রস্রোতের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই বুঝি। তার পরেও যদি আমি বিপদে পড়তে পারি, তবে এমনটা যে কারও সঙ্গেই হতে পারে। মদ্যপ হলেই কি, বা না হলেই কি। ওপর থেকে সমুদ্রকে দেখে ভেতরের খবর বুঝে ওঠা আদৌ সহজ নয়।

আমাদের দেশে চার জায়গায় ডাইভিং স্কুল আছে। পন্ডিচেরী, আন্দামান, গোয়া, লাক্ষাদ্বীপ। এগুলোয় শখের ডাইভিং-এর পাশাপাশি রেসকিউ ডাইভিং-এরও কোর্স হয়। এ সব রেসকিউ ডাইভারদের দীঘা-মন্দারমনিতে কোস্টাল সিকিউরিটির কাজে নিয়োগ করা যায় না কি? মাঝে মাঝে বিপদে পড়া মানুষকে নুলিয়ারা বাঁচিয়ে দেন ঠিকই। কিন্তু তাঁরা তো আদতে মৎস্যজীবী। বাঁচানোটা তাদের পেশা নয়, আর তাদের প্রশিক্ষণও নেই।

জল থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে অবস্থা সামাল দিতে যা যা চিকিৎসা যেভাবে করা দরকার, তা এই রেসকিউ ডাইভারদের শেখানো হয়। বঙ্গোপসাগরের মত একটা বিপদসঙ্কুল সমুদ্রের পাশে এত পর্যটনের রমরমা, কিন্তু কোস্টাল সিকিউরিটির মত জরুরি বিষয় নিয়ে প্রশাসনের টনক নড়ে না। আমরাও মাথা ঘামাই না। যাঁর আপনজন চলে যায় তিনি যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকেন সারা জীবন, আর যাঁদের যায় না তাঁরা পেটে মদ থাকা বা কম বয়সের ঝুঁকি নেওয়ার স্বভাবকে দোষ দিয়ে খবরের কাগজের পরের পাতায় চলে যান।

আরও অনেক কিছুর মতোই কোস্টাল সিকিউরিটিও আমাদের অধিকার। এটা আমরা কবে বুঝতে শিখব?

(লেখক সার্টিফায়েড ওপেন ওয়াটার ডাইভার এবং অভিজ্ঞ স্নরকেলার। সমুদ্র সম্পর্কে বিশেষ ধারণার অধিকারী।)

Shares

Leave A Reply