শনিবার, জুলাই ২০

বড়দিনেও হাসপাতালে, মন খারাপ খুদেদের, উপহারের ঝুলি নিয়ে হাজির স্বয়ং সান্তা!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিনটাকে আক্ষরিক অর্থেই আজ ‘বড়’ করে পালন করল ওরা। রোজকার ওষুধ-ইঞ্জেকশন-স্যালাইন-রক্তের বাইরে আজ মাতল কেক-খেলনা-টুপি-রংপেন্সিল নিয়ে। তা-ও আবার খোদ সান্তা ক্লজ়ের সঙ্গে!

তবে এই সবটাই অবশ্য হল, হাসপাতালের বেডে শুয়েই। কারণ ওরা প্রত্যেকেই কোনও না কোনও কঠিন অসুখের শিকার। কারও সাময়িক, কারও বা দীর্ঘ দিনের আস্তানা হাসপাতালের বেডই। কেউ হয়তো সদ্য ফিরেছে মৃত্যুর মুখ থেকে, আবার কেউ হয়তো একটু একটু করে মৃত্যুর দিকেই….

অথচ বছরকার এই উৎসবের দিনটায় ওদের হয়তো থাকার কথা ছিল ময়দানে বা চিড়িয়াখানায় বা ইকো পার্কে। হয়তো খাওয়ার কথা ছিল ভালমন্দ। খুব দৌড়োনোর কথা ছিল সবুজ দাপিয়ে। কিন্তু অসুখের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ওদের শৈশবের উচ্ছলতা।

তাই একটা দিনের জন্যই, মিথ্যে করেই, সান্তা ক্লজ় এসে আনন্দ ফেরি করে গেলেন ওদের মাঝে। ওরাও খুশি। কেউ তখনই ড্রয়িং বুক হাতে পেয়ে আঁকতে শুরু করল, কেউ আবার কামড় বসাল চকলেটে। কেউ বা হাসপাতালের বেডেই চালিয়ে নিল ছোট্ট গাড়ি, কেউ আবার এত্ত বেলুন একসঙ্গে দেখে বেজায় খুশি! কয়েক জন তো অবাক হয়ে চোখ বড়-বড় করে সান্টাকে দেখতে গিয়ে উপহার নিতেই ভুলে গেল!

পার্ক সার্কাসের শিশু হাসপাতাল, ‘ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেল্থ’-এ আজ এ ভাবেই পালিত হল বড়দিন। হাসপাতালের স্বভাবসুলভ নিস্তব্ধতা ভেঙে হেসে উঠলেন সান্টা ক্লজ়। কচিকাঁচাদের উইশ করলেন, ‘মেরি খ্রিস্টমাস’! ছোট ছোট হাতে তুলে দিলেন উপহার। প্রায় দেড়শো যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে ফোটালেন চিলতে হাসি। কাউকে আশ্বাস দিলেন, খুব তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যাবে কিন্তু। কাউকে আবার মনে করিয়ে দিলেন, বাড়ি ফিরেই অনেক খেলা করতে হবে। আর এই পুরো ঘটনাটিই ঘটল ‘লাইটহাউস’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাত ধরে। সংগঠনের সদস্যরাও দল বেঁধে উপহার বিলি করলেন লাল টুপি পরে। কোনও কোনও খুদেকে পরিয়েও দিলেন লাল টুপি। সারা হাসপাতালে ঝলমল করল রঙিন বেলুন।

হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ এবং শিশু চিকিৎসক প্রভাস প্রসূন গিরি বললেন, “দিনটা আজ স্বপ্নের মতো ছিল আমাদের বাচ্চাদের জন্য। আমরা চিকিৎসকেরা সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি ওদের সারিয়ে তোলার। কিন্তু তার পরেও আরও কিছুর প্রয়োজন হয়, ওদের ভাল রাখতে। আজকের দিনটা তেমনই একটা ভাল রাখার দিন ছিল। লাইটহাউসকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের তরফ থেকে।”

তিনি জানালেন, দিন কয়েক আগেই আমেরিকার একটি হাসপাতালে আচমকা সান্টা সেজে পৌঁছেছিলেন সে দেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আদরে-উপহারে খুশি করে এসেছিলেন অসুখের সঙ্গে লড়তে থাকা বাচ্চাদের। তাই দেখে তাঁরও মনে হয়েছিল, এই হাসপাতালে কি এমন হতে পারে না? কেউ কি পাশে দাঁড়াতে পারে না এই বাচ্চাগুলোর? এই ভাবনা যে এমন করে সত্যি হয়ে যাবে তা আশা করেননি ডাক্তারবাবু।

ক্রনিক কনভালশন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আদৃতা পালের বাবা শান্তনু পাল জানালেন, এই প্রথম বড়দিনে মেয়ে হাসপাতালে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই খুব বিষণ্ণ ছিলেন তিনি। সকাল সকাল সিকিউরিটি গার্ডের হাত দিয়ে ক্যাডবেরিও পাঠিয়েছিলেন মেয়ের জন্য। “হঠাৎ করে ওদের পেলাম! আনন্দে ভরে গেল বড়দিনটা। যারা এমন করে ভেবেছে আমার মেয়ের এবং আরও অনেকের খুশির জন্য, তাদের প্রতি অনেক শুভেচ্ছা।”– বলেন তিনি।

লাইটহাউসের সভাপতি মালিনী বসু জানালেন, এই দিনটা বাচ্চাদের জন্য যতটা ভাল লাগার ছিল, বড়দের জন্য আরও অনেকটা বেশি ছিল। “আমরা যাঁরা আয়োজন করেছি এই উদ্যোগের, তাঁরা বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে, আমাদের এই বিশেষ দিনটা বিশেষ ভাবে পালন করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।”

সান্টা ক্লজ়ও খুশি এমন সুযোগ পেয়ে। সংগঠনের সদস্য, সান্টা-রূপী সৌভিক চক্রবর্তী বললেন, “শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে আনন্দ আর কী হতে পারে? তবে সত্যিকারের বড় দিন হয়তো সেই দিনটা হবে, যে দিন কোনও শিশুর হাসি ফোটানোর জন্য হাসপাতালে নয়, শুধু খেলার মাঠেই যেতে হবে আমাদের।”

Comments are closed.