শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

আত্মবলিদানের জন্য মন এবং কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করেন ক্রোধোন্মত্তা দেবী মা ছিন্নমস্তা

রূপাঞ্জন গোস্বামী

দশমহাবিদ্যার সবচেয়ে ভয়ংকর দেবী হলেন, দেবী ছিন্নমস্তা। করোটির ও মানব অস্থির মালা পরিহিতা মুণ্ডহীন ষোড়শী দেবী ছিন্নমস্তা। দেবী নগ্নদেহে উপবীতের মতো পেঁচিয়ে আছে সাপ। তাঁর স্তনদ্বয় পদ্মফুল ও পুঁতির মালা দিয়ে আবৃত। দেবী পিছনের আকাশ ছেয়ে গিয়েছে বজ্রবিদ্যুতে। মুণ্ড না থেকেও তিনি অমর ও যন্ত্রণামুক্ত। দেবী ছিন্নমস্তা দাঁড়িয়ে আছেন পদ্ম ফুলের ওপর সঙ্গমরত সুদর্শন ও সুদর্শনা দুই নারী পুরুষের ওপর। তাঁরা হলেন কাম ও রতি। বসনহীনা দেবীর এক হাতে আছে তাঁর ছিন্ন মস্তক।  অন্য হাতে খড়গ। দেবীর মস্তকহীন গ্রীবা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে রক্তের ত্রিধারা। একটি ধারা পড়ছে দেবীর মুখে, বাকি দুইটি ধারা পান করছেন তাঁর দুই ভীষণরূপা সহচরী ডাকিনী ও বর্ণনী।

দেবী ছিন্নমস্তা

হিন্দু পুরাণে মা ছিন্নমস্তা ‘ছিন্নমস্তিকা’ বা ‘প্রচণ্ড চণ্ডিকা’  নামেও পরিচিত। শাক্তপ্রমোদ গ্রন্থে তাঁর নাম ছিন্নমস্তা, শতনাম স্তোত্রে বর্ণিত দেবী ‘প্রচণ্ড চণ্ডিকা” দেবী ছিন্নমস্তারই অপর নাম। দেবী ছিন্নমস্তা আত্মবলিদান এবং কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করার দেবী। এক দিকে তিনি যৌনসংযম ও যৌনশক্তির প্রতীক, অন্যদিকে তিনি বিশ্বসংসারের জীবনদাত্রী এবং পাপীর বিনাশকারী শক্তি।

মা ছিন্নমস্তার উৎস সন্ধানে

শাক্ত মহাভাগবত পুরাণ

শিবের প্রথম স্ত্রী ছিলেন দক্ষরাজের কন্যা দাক্ষায়ণী। দক্ষ তাঁর যজ্ঞে সমস্ত দেবতাকে নিমন্ত্রণ করলেও  শিবকে নিমন্ত্রণ জানাননি। শিবপ্রিয়া দাক্ষায়ণী অপমানিত বোধ করেন। তিনি বিনা আমন্ত্রণেই পিতার যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি চান  শিবের কাছে। অপমানিত শিব কিছুতেই রাজি হন না। তখন দাক্ষায়ণী প্রচন্ড ক্রোধে দশটি ভয়ংকরী রূপ ধারণ করে দশ দিক থেকে শিবকে ঘিরে ধরেন।  এই দশরূপা দেবী মূর্তিই  হিন্দু পুরাণে দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত। এবং দশমহাবিদ্যার সবচেয়ে করালদর্শনা মহাবিদ্যা হলেন মা ছিন্নমস্তা।

দশমহাবিদ্যা

প্রাণতোষিণী তন্ত্র

প্রথম কাহিনী:- নারদ পঞ্চরাত্র অনুসারে

একদিন শিব জায়া পার্বতী মন্দাকিনী নদীতে স্নান করতে গিয়ে কামার্ত হয়ে পড়েন। এবং কামের প্রভাবে তাঁর গায়ের রঙ কৃষ্ণাভ হয়ে যায়। এই সময় তার দুই সহচরী ডাকিনী ও বর্ণনী ক্ষুধায় কাতর হয়ে পার্বতীর কাছে খাদ্য প্রার্থনা করেন। পার্বতী বলেন, স্নান সেরে গৃহে ফিরে সহচরীদের খেতে দেবেন। কিন্তু, সহচরীরা ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারেন না। ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকেন। সখীদের এই অবস্থা দেখে, পার্বতী নিজের নখ দিয়ে  গ্রীবা থেকে নিজের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। নিজ রক্ত দিয়ে সহচরীদের ক্ষুধা মেটান।

দ্বিতীয় কাহিনী:- স্বতন্ত্রতন্ত্র গ্রন্থ ও শক্তিসংগম তন্ত্র অনুসারে

দেবাদিদেব মহাদেব বর্ণিত এই কাহিনীটি হলো, একদিন মহাদেব ও পার্বতী সঙ্গমে মগ্ন ছিলেন। মহাদেবের দ্রুত বীর্যস্খলনে পার্বতী ক্রুদ্ধা হয়ে ওঠেন। তখন তাঁর শরীর থেকে থেকে ডাকিনী ও বর্ণনী নামে দুই সহচরীর জন্ম হয়। এর পর, একদিন পার্বতী সখীদের নিয়ে পুষ্পভদ্রা নদীতে স্নান করতে যান। সহচরীদের ক্ষুধা পেলে পার্বতী নিজের মস্তক ছিন্ন করে সহচরীদের রক্তপান করান। বীররাত্রি তিথিতে সৃষ্টি হয় দেবী ছিন্নমস্তার।

লোকশ্রুতি

দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের  যুদ্ধ চলছে। দেবগণের পরাজয় আসন্ন, এই সময় দেবতারা মহাশক্তিকে আহ্বান করলেন, এবং তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করলেন।  দেবী ‘প্রচণ্ড চণ্ডিকা’ দেবতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে রণক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হলেন। সংহারমূর্তি ধারণ করে সকল অসুরকে বধ করলেন। অসুর নিধনে সন্তুষ্ট না হয়ে ক্রোধন্মত্তা দেবী নিজেই খড়গাঘাতে নিজের মস্তক শরীর থেকে বিছিন্ন করে নিজ রক্ত পান করেন।

আরেকটি  লোকশ্রুতি বলছে, সমুদ্রমন্থনের সময় অমৃতের ভাগ নিয়ে দেবতা আর অসুরদের মধ্যে ভয়ঙ্কর মতভেদ  শুরু হয়। পরে মীমাংসা হয়, দেবী ছিন্নমস্তা অসুরদের ভাগের অমৃত গ্রহণ করেন এবং পান করেন। তারপর অসুরদের অমৃত থেকে বঞ্চিত করার জন্য নিজের মস্তক নিজেই বিছিন্ন করেন।

বৌদ্ধ ধর্মেও আছেন মা ছিন্নমস্তা, দেবী ‘ ছিন্নমুন্ডা’  নামে

প্রথম কাহিনী:- বৌদ্ধ তান্ত্রিক গুরু কৃষ্ণাচার্যের শিষ্যা ছিলেন দুই মহাসিদ্ধা বোন, মেখলা ও  কঙ্খলা  তাঁরা একদিন নিজেদের মাথা কেটে গুরু কৃষ্ণাচার্যকে  উপহার দেন এবং তারপর ভীষণমূর্তি ধারণ করে নৃত্য শুরু করেন। দেবী বজ্রযোগিনী দুই বোনের নৃত্য দেখে থাকতে না পেরে নিজেও কবন্ধ রূপ ধারণ করে মেখলা ও কঙ্খলার সঙ্গে নৃত্য করতে থাকেন। বৌদ্ধ তন্ত্রে অবতীর্ণ হন ছিন্নমস্তারুপী নতুন বৌদ্ধ দেবী ছিন্নমুন্ডা

বৌদ্ধদের দেবী ছিন্নমুন্ডা

দ্বিতীয় কাহিনী:- রাজকুমারী লক্ষ্মীঙ্করা পূর্বজন্মে ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মগুরু পদ্মসম্ভব-এর এক প্রিয় শিষ্যা। মহাসিদ্ধা রাজকুমারীকে বিনাকারণে রাজা মৃত্যুদণ্ড দেন। এবং রাজকুমারী লক্ষ্মীঙ্করাকে, নিজ হস্তে নিজ মস্তক ছেদনের দণ্ড সমাপন করবার আদেশ দেন। নতমস্তকে রাজার আদেশ শিরোধার্য করে রাজকুমারী লক্ষ্মীঙ্করা নিজের দেহ থেকে মাথা বিছিন্ন করে নগর পরিক্রমা করেন। মহাসিদ্ধা লক্ষ্মীঙ্করার এই বীভৎসরূপকে নগরবাসী ছিন্নমুণ্ডা-বজ্রবারাহী রূপে পূজা করা শুরু করেন।

মা ছিন্নমস্তার উল্লেখ আছে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে 

দেবী ছিন্নমস্তার কথা, সর্বপ্রথম উল্লেখ করা হয়েছে শাক্ত মহাভাগবত পুরাণদেবীভাগবত পুরাণ নামে দুটি উপপুরাণ-এ।  এছাড়াও গবেষকরা  হিন্দু ছিন্নমস্তাকল্প , তন্ত্রসার (সপ্তদশ শতাব্দী) ও বৌদ্ধ সাধনমালা নামক গ্রন্থগুলির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন হিন্দু দেবী ছিন্নমস্তা ও বৌদ্ধ দেবী ছিন্নমুণ্ডা আসলে একই দেবী। হিন্দু তন্ত্রসার গ্রন্থে দেবী ছিন্নমস্তার  নাম বলা হয়েছে দেবী সর্বসিদ্ধি এবং তাঁর সখী তিনজন, তাঁরা হলেন ডাকিনী, বৈরোচনীবর্ণনী। বৌদ্ধ সাধনমালা গ্রন্থে দেবী ছিন্নমস্তার নাম সর্ববুদ্ধা এবং তাঁর দুই সখীর নাম বজ্রবর্ণনী এবং বজ্রবৈরোচনী। ছিন্নমস্তাকল্প গ্রন্থে দেবী ছিন্নমস্তার নাম সর্ববুদ্ধি এবং তার সহচরীদের নাম বৌদ্ধ গ্রন্থে বর্ণিত বজ্রবর্ণনী এবং বজ্রবৈরোচনী।  প্রাচীন হিন্দু তান্ত্রিকদের গুহ্যাতিগুহ্য তন্ত্র গ্রন্থে, বিষ্ণুর দশাবতারের সঙ্গে দশমহাবিদ্যার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। এই গ্রন্থে বলা হয়েছে বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের  দশমহাবিদ্যা রূপ হলো ছিন্নমস্তা।

মা ছিন্নমস্তার ছবি, রাজারাপ্পা

গৃহস্থ বাড়িতে নয়, শুধু মন্দিরেই পূজিতা হন মা ছিন্নমস্তা

মা ছিন্নমস্তা গৃহস্থ বাড়িতে পূজা পান না। তাঁর অধিষ্ঠান মন্দিরে। শত শত বছর ধরে লোকবিশ্বাস বলে আসছে, মা ছিন্নমস্তা এক সংহাররূপিণী, প্রলয়ঙ্করী দেবী। তাই গৃহস্থ বাড়িতে মা ছিন্নমস্তার পূজা করা বা দেবীর দর্শন করার পরিণাম ভয়াবহ। তাই তান্ত্রিক, যোগীপুরুষ এবং সন্ন্যাসীরা দুর্গম স্থানে অবস্থিত মন্দিরে, এই ভয়ংকরী দেবীর পূজা বীরাচার মতে করে থাকেন।

কোথায় আছে ছিন্নমস্তার মন্দির!

দশমহাবিদ্যার অন্যতমা হলেও দেবী ছিন্নমস্তা। বিশ্বের বহু দেশের বহু মন্দিরে একক ভাবে পূজিতা হন।
সারা ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, তিব্বত, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে আছে দেবী ছিন্নমস্তার মন্দির। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের বীরভানপুরে আছে দেবী ছিন্নমস্তার মন্দির। রাঁচীর অনতিদূরে রাজারাপ্পায় ভারতের সবচেয়ে  বিখ্যাত দেবী ছিন্নমস্তার মন্দিরটি আছে।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Shares

Comments are closed.