মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

মুখ ভরা দগদগে ক্ষত! অ্যাসিড আক্রান্ত দীপিকা, ফার্স্ট লুকে নজর কাড়ল ‘ছপক’

দ্য ওয়াল ব্যুরো: চোখধাঁধানো আলো কিংবা পেলব মেকআপ নয়, বরং ঝলসে-কুঁচকে যাওয়া তামাটে চামড়াই এ বার তাঁর সঙ্গী। নেই মাস্কারা লাগানো চোখের পাতা কিংবা নিখুঁত করে আঁকা ভ্রূ-পল্লবও। তবে চোখের চাউনি বড় উজ্জ্বল, বড় দৃপ্ত। আর সারা মুখে লেগে রয়েছে পরিচিত চওড়া হাসি।

তবে এই হাসির পিছনেই রয়েছে অনেক যন্ত্রণার গল্প। রয়েছে অনেক লড়াইয়ের কাহিনী। কঠোর বাস্তবের নির্মম সত্যিটাই এ বার সেলুলয়েডে তুলে ধরবেন দীপিকা পাড়ুকোন। অভিনয় করবেন অ্যাসিড আক্রান্ত লক্ষ্মী আগরওয়ালের চরিত্রে। ‘ছপক’ নামের সেই ছবির পরিচালক মেঘনা গুলজার।

চেনা ছকের বাইরের গল্প পর্দায় তুলে ধরাই মেঘনার নেশা। বায়োপিক এর আগে বলিউডে বহু বার হয়েছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছেন ক্রীড়া ব্যাক্তিত্ব থেকে রাজনীতিবিদ। কিন্তু ট্রেন্ড ভেঙে এ বার অ্যাসিড আক্রান্তের বায়োপিক নিয়ে হাজির হয়েছেন মেঘনা। শুরু হয়েছে ‘ছপক’ ছবির শ্যুটিং। প্রকাশ পেয়েছে ফার্স্ট লুকও।

দীপিকা আগেই জানিয়েছিলেন, মেঘনার কাছে ছবির স্ক্রিপ্ট শুনে হ্যাঁ বলতে সময় নেননি তিনি। বলেছিলেন, লক্ষ্মীর জীবনের গল্প ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করেছিল তাঁকে। আর অ্যাসিড সারভাইভার লক্ষ্মীর চরিত্রে তাঁর ফার্স্ট লুক প্রকাশ পেতেই দীপিকা জানালেন, “এই চরিত্র আজীবন আমার হৃদয়ে থাকবে।” প্রসঙ্গত, ছবিতে দীপিকার চরিত্রের নাম মালতী। পরিচালক মেঘনার কথায়, “মালতী আশার প্রতীক, উৎসাহের প্রতীক।“

জোরকদমে চলছে ছবির প্রস্তুতি। মেঘনা নিজেই একটি ছবি শেয়ার করেছেন। যেখানে দেখা গিয়েছে, ছবির সব কলাকুশলীরা একসঙ্গে বসে মন দিয়ে স্ক্রিপ্ট পড়ছেন। রয়েছেন অভিনেতা বিক্রান্ত মাসে। ‘ছপক’ ছবিতে মালতী’র সঙ্গীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

২০০৫ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে অ্যাসিড অ্যাটাকের শিকার হন লক্ষ্মী। বয়সে প্রায় দ্বিগুণ, গুড্ডা নামের এক ব্যক্তি কুপ্রস্তাবে সাড়া না পেয়ে, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য লক্ষ্মীর মুখে অ্যাসিড ছুড়েছিলেন। কেবল মুখ নয়, বিকৃত হয়ে গিয়েছিল লক্ষ্মীর দেহের আরও অনেক অংশ। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কিশোরী শরীরে চলেছিল অসংখ্য কাটা-ছেঁড়া। হয়েছিল বহু জটিল অস্ত্রোপচার।

প্রথমটায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন লক্ষ্মী। আয়নায় নিজেকে দেখতেও ভয় পেতেন তিনি। তবে নিজের চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়ান তিনি। আইনের সাহায্যে শাস্তি দেন অপরাধীদের। খোলা বাজারে অ্যাসিড বিক্রি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের হাতে যেন কোনও ভাবেই অ্যাসিড না পৌঁছোয় সেই ক্ষেত্রেও বিপুল পরিবর্তন এনেছে লক্ষ্মীর এই ঘটনা। ভারতে ‘স্টপ অ্যাসিড অ্যাটাক’ ক্যাম্পেনের প্রধান মুখও এই লক্ষ্মীই। লড়াই করে জিতে নিয়েছেন সব প্রতিকূলতা। জিতেছেন সামাজিক ট্যাবুগুলোও। বিয়ে করেছেন ভালবেসে, জন্ম দিয়েছেন সন্তানের। হার না-মানার এক জ্বলন্ত উদাহরণ আজ তিনি। অনেক মানুষের আদর্শ।

এ বার এই আদর্শের চরিত্রেই অভিনয় করবেন দীপিকা। তাঁর সঙ্গী শরীর ভরা দগদগে ক্ষত। বলিউডের বেশির ভাগেরই আশা, এ ছবিতে সব কিছুকে ছাপিয়ে যাবেন দীপিকা। তৈরি করবেন নতুন মাইলস্টোন। ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি বড় পর্দায় মুক্তি পাবে মেঘনা গুলজারের এই ছবি। যে ছবির মূল গল্প বলবে লক্ষ্মীর কথা।

তবে লক্ষ্মী কিন্তু মোটেই একা নন। সারা দেশে অসংখ্য অ্যাসিড অ্যাটাক সারভাইভার বেঁচে আছেন বহু যন্ত্রণা নিয়ে। আইনি লড়াইয়ের জটিলতায় পথ হারিয়েছেন কেউ, কেউ আবার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সংস্থানই করে উঠতে পারেননি। সমাজের চোখ থেকে বাঁচতে অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছেন কেউ কেউ, কেউ কেউ শেষ করে দিয়েছেন জীবনও। তার মধ্যেই বারবার ছিটকে এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর রূপকথারা। তাঁদেরই এক জন মনীষা পৈলান।

এ রাজ্যের জয়নগরের বাসিন্দা মনীষা বছর দুয়েক আগে অ্যাসিডে ঝলসে যান তাঁর প্রতিবেশী এক যুবকের হাতে। শত লড়াই শেষে মনীষার মনের জোরের কাছে হার মেনেছে বাধারা। তিনি গলা উঁচু করে বলেছেন, ‘আমি মুখ ঢাকব না।’ তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, অ্যাসিড শুধু চামড়া পোড়াতে পারে, স্বপ্ন নয়। দীপিকার নতুন ছবি প্রসঙ্গে মনীষা বলছেন, “লক্ষ্মীর গল্প সিনেমার মধ্যে দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছবে, এর চেয়ে ভাল কিছু হয় না।” এই সমস্যা নিয়ে যে এত বড় কাজ হচ্ছে, এত মানুষ জানছেন, পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তা নিয়ে রীতিমতো আশাবাদী মনীষা।

মনীষা যেমন ছিলেন, যেমন আছেন।

তবে সেই সঙ্গেই তাঁর আশঙ্কা অন্য জায়গায়। বলছেন, “এত আলো, এত প্রচারে যেন চোখ ধাঁধিয়ে না যায় আমাদের। আমাদের লড়াইয়ের মূল দু’টো অস্ত্র আইন এবং চিকিৎসা– এ দু’টো যেন ভোঁতা হয়ে না যায়। আসল জয় সেই লড়াইয়ের পরেই আসবে, আসল উদযাপন সেই জয়ের পরেই আসবে। তার আগে নয়।” মনীষার আক্ষেপ, অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে লক্ষ্মী, বা তিনি নিজে, বা তাঁর মতো আরও অনেকের উপরেই বারবার আলো পড়েছে। আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন তাঁরা।

কিন্তু মনীষার দাবি, পরিচিতি যত সহজ হয়েছে, তত সহজ হয়নি আইনি পদ্ধতি বা চিকিৎসার পথ। সেইখানটায় একাই লড়তে হয় সব কিছুর পরে। “আমায় আজ অনেকে চেনে। কিন্তু তবু আমার শত লড়াইয়ের পরেও, আমার পাড়ায় আজও আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় অভিযুক্ত সেলিম। তাই একটা সময় পরে মনে হয়, আসল লড়াইটায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে।”– বলেন মনীষা।

Comments are closed.