করোনা পরবর্তী সময়ে কীভাবে বদলাতে পারে কৃষিব্যবস্থা

২৮

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দেবত্র দে

সেই কোন ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। শুনেছি সুজলা-সুফলা আমাদের এই ভুমি। তার কৃষিজাত সম্পদই নাকি ছিল বিদেশিদের বারবার আক্রমণের মূল কারণ।

এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এ দেশের কৃষিচিত্রে চোখ রাখতে দেখা যায়, মোট কৃষকদের ৮৬ ভাগই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষি। যদিও তাঁদের ৪৭ ভাগ জমির মালিকানা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে, মোট ৭১.২৩ লক্ষ কৃষক পরিবারের ৯৬ ভাগই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষি, যাঁদের গড় জমির পরিমাণ ০.৭৭ একর। দশ বছর আগে হওয়া আদমসুমারী অনুসারে এ রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে ৬২ ভাগ কর্মজীবি কৃষিকাজের সাথে যুক্ত, ( জিডিপির মাত্র ১৫ শতাংশ হলেও)।

এই পরিসংখ্যানই এটা অনুধাবন করার জন্য যথেষ্ট, যে অতীতে যাই গরিমা থাকুক না কেন, বর্তমানে বাংলায় কৃষিকাজ মোটেই আকর্ষনীয় নয়। এই লকডাউন পর্বে সারা দেশ থেকে বাংলামুখী অভিবাসী শ্রমিকের ঢল, যার সিংহভাগই ফিরছেন গ্রামবাংলা, তা এই রূঢ় বাস্তবেরই প্রতিফলন। অর্থাৎ কৃষিকাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবই গ্রামবাংলা থেকে এই বিপুল পরিমাণ অভিবাসনের মুল কারণ।

এখন করোনা পরবর্তী সময়ে এই শ্রমিককুল গ্রামে থিতু হলে, তাঁদের হাতে কাজ ও পেটে ভাত এই সময়ের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ তাঁরা অনন্যোপায় হয়েই এবার পারিবারিক কৃষিকাজে ফিরতে চাইবেন। কিন্তু তাঁদের সেই দক্ষতা ও ক্ষমতা তৈরি হয়নি এত বছরে। কৃষির সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন করে ভাবতেই হবে কৃষি নিয়ে। কৃষির ব্যাপক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে মনে রেখেই শুরু করতে হবে ভাবনা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও ভাগচাষিরাই আসলে এ রাজ্যে চাষাবাদের মূল কারিগর এবং তাঁদের পুরো লাভ-ক্ষতিও বাজারকেন্দ্রিক। বীজ, সার এবং কীটনাশক– যা আজকের দিনে অত্যাবশ্যকীয়, তার সঙ্গে সেচের জল যা কিনা কড়ি দিয়ে কিনতে হয়– সবটাই সেই বাজারের আবর্তে। এই স্বল্পজমির কৃষিজীবিদের (যারা ৯৬ শতাংশ) প্রয়োজনে ধার করতে হয় বাজার থেকেই চড়া সুদে( মাসে ১০%)।

এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, এই পদ্ধতিতে ভাগচাষিদের হাল সবচেয়ে খারাপ। অল্প সংখ্যক নথিভুক্ত বর্গাদার ছাড়া বর্তমানে রাজ্যে ভাগচাষ হয় পুরোটাই মৌখিক চুক্তিতে। এলাকাভিত্তিতে জমির চরিত্র অনুযায়ী জমির বাজারদর ঠিক হয়। বছরের শেষে বা শুরুতে ভাগচাষিকে জমির উৎপাদনশীলতা বাবদ সেই টাকাটা দিতে হয় জমির মালিককে। চাষের সব খরচ-সহ আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার মাসুল– সবটাই বইতে হয় ভাগচাষিদেরই।

এত প্রতিকূলতার পরও এই ভাগচাষিদের কিন্তু তাঁর চাষ করা জমির ওপর ন্যূনতম অধিকারও নেই। পাশাপাশি, সামাজিক ভাবে এই প্রান্তিক, ক্ষুদ্রচাষি ও ভাগচাষিরা মূলত নিম্নবর্ণের মানুষ। উন্নয়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ হলেও এঁরাই সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি নথিভুক্ত বর্গাদারই হন বা নথিহীন, ভাগচাষি মাত্রেই বিপদের প্রথম সারিতে।

সিঙ্গুর আন্দোলনের কথা মনে করলে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণের প্রতিরোধ কিন্তু এসেছিল এঁদের কাছ থেকেই। কারণ জমির মালিকদের বেশিরভাগেরই আর কৃষিকাজের সঙ্গে যোগ ছিল না, বছর গেলে ফসল বা টাকাটা পেলেই হত। কিন্তু রুটিরুজি হারিয়েছিলেন এই অংশের কৃষিজীবিরাই।

এই বাজার চালিত কৃষিকাজ দিনের শেষে শুধু অর্থনৈতিক নয়, এক মানবিক বৈকল্যও তৈরি করে। যা এই পরিবারগুলোকে বাধ্য করে বাড়ির সবল পুরুষদের অভিবাসী হতে। এই চিত্রনাট্যের পরিধি গোটা বাংলা জুড়েই। ভারত সরকারের তথ্যানুসারে দেশে কৃষি শ্রমিকের ৬০ ভাগই মহিলা, কারণ পুরুষেরা কাজের টানে গ্রাম ছাড়া হলে চাষাবাদের দায়িত্ব মহিলাদেরই নিতে হয়।

স্বাভাবিক মানসিকতা বলে, এই অভিবাসী শ্রমিককুল ফিরে আসার পরে খুব দ্রুত আর গ্রামছাড়া হতে চাইবেন না। এক তো যে নারকীয় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাঁদের হতে হল, এর পরে এখনই কেউ আর ফিরতে চাইবেন না অনিশ্চিত জীবনে। আর দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আগামীতে কতটা কাজের সুযোগ ঘটবে তাও অনিশ্চিৎ। ফলে এঁরা কাজ খুঁজবেন গ্রামে ও তার আশপাশের অঞ্চলে।

সেই জায়গা থেকেই, এঁদের একটা বড় অংশ হয়তো ১০০ দিনের কাজ চাইবেন, কিন্তু জবকার্ড-সহ নানা সরকারি বিধি টপকে তাতে কতজন সফল হবেন তাও এক বড় প্রশ্ন। আর যদিও বা কাজ মেলে, তা সারা দেশের হারে পরিবার-প্রতি বছরে গড়ে ৫০ দিন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই কৃষিকাজই হবে একমাত্র বিকল্প কর্মসংস্থান। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এত ক্ষুদ্র জোতের কৃষি কীভাবে এদের কাজ দেবে?

লকডাউন পরবর্তী সময়ে খারিফ মরসুমে বাড়তি সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে গ্রামে-গঞ্জে মানুষের হাতে টাকার অভাব। এদিকে সবুজ বিপ্লবে ধৌত কৃষির খরচ দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী। চাষিকে বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের জল সবই কিনতে হয় বাজার নির্ধারিত দামে। এই পরিস্থিতিতে চাষি বাধ্য হবেন বাজার থেকে টাকা কর্জ করতে, যা সে মেটাবে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে। এভাবেই বাজারের আবর্তে ঘুরপাক খায় আমাদের কৃষি। আর কে না জানে, বীজের বাজার থেকে ফসলের বাজার সবটাই পরস্পর সংযুক্ত বা interlocked।

বর্তমানে মহামারী ও তৎজনিত পরিকল্পনাহীন লাগাতার লকডাউনের ফলে শহর ও শহরতলির অসংগঠিত ক্ষেত্র, যা ৯২ ভাগ কর্মসংস্থান জোগায়, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোতেও ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই চলছে। ফলে শহরের মানুষের হাতেও নগদের আকাল। অভিবাসী শ্রমিকেরা ফিরে এলে গ্রামেই স্থানীয় ভাবে খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বাড়বে, বিপ্রতীপে এঁরা শহর ছেড়ে চলে আসায় এবং অসংখ্য মানুষ কাজ হারানোয় শহরে চাহিদা স্বাভাবিক ভাবেই কমবে। তাই আগামীতে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিপদে পড়তে পারেন কৃষকরা। সে সম্ভাবনা প্রবল। কারণ শহরের বাজারে চাহিদা কমে গেলে দামও পড়ে যায়। এর ইঙ্গিত যে একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না, তাও নয়। শহরতলির বাজারে বর্তমানে আনাজের দাম তলানিতে, যা অদূর ভবিষ্যতেও একই রকম থাকার সম্ভাবনা। তাই বাজার সদয় না হলে করোনা পরবর্তী সময়ে কৃষি ও কৃষকের সমূহ বিপদ।

এখন এত তত্ত্ব ও তথ্যের ভার আত্মস্থ করার পরে প্রশ্ন ওঠে একটাই। বিকল্প কী?

একটা কথা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়, বাজার-নির্ভরতা যত কমবে কৃষকরাও ততই হয়ে উঠবেন স্বাবলম্বী। এই পরিস্থিতিতে রাসায়নিক চাষ ছেড়ে যদি জৈব চাষে এগোনো যায়, তাতে দুটো সুবিধা মিলতে পারে। প্রথমত, চাষের খরচ খুবই কম হবে কারণ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ গ্রামেই পাওয়া যাবে। তাই নগদে টাকার অভাব তেমন প্রভাব ফেলবে না। আর দ্বিতীয়ত, এর তুলনামূলক শ্রমনিবিড়তা বেশি, ফলে অভিবাসী শ্রমিকের একটা অংশ পারিবারিক কৃষিকাজে ফিরে যেতে পারেন। পাশাপাশিই, জৈব ফসল তুলনায় কম উৎপাদিত হওয়ায় নিজেদের খরচের পরে বাড়তিটুকু বাজারজাত করাও তুলনামূলক ভাবে কম সমস্যাসংকুল হবে। কারণ আগামী দিনে করোনার সঙ্গে লড়াইতে খাঁটি খাবারের গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান।

এতে অবশ্য অন্যতর সমস্যাও আছে। কারণ গ্রামে বিচ্ছিন ভাবে জৈব চাষ সম্ভব নয়। পাশাপাশি জমিতে রাসায়নিক চাষ ও জৈব চাষ হলে জৈব চাষের ক্ষতি নিশ্চিত। ফলে গ্রামে গ্রামে কৃষকদের নিজেদেরই ঠিক করতে হবে তাঁরা বাজারের সর্বব্যাপী অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে জৈব খামারের পথে এগোবেন কিনা। যদি ধান, ডাল, সর্ষে-সহ প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের চাষ গ্রামের কৃষিজাত জমিতে ভাগ করে নিয়ে ফলানো যায়, তবে আগামীতে খাদ্য স্বয়ম্ভরতায় বাজার নির্ভরশীলতা আরও কমে আসবে। ভাগচাষিরাও জমির মালিকের পাওনা মেটাবেন ফসল দিয়ে, টাকায় নয়।

ইতিমধ্যেই মহামারীর সুযোগে খাদ্য মজুত সংক্রান্ত আইনে ব্যাপক পরিবর্তন করেছে কেন্দ্র। এতে বৃহৎ পুঁজির পথ সুগম হয়েছে, ফলে খাদ্যসামগ্রীর বাজারে স্বল্প পুঁজির চাষিরা কার্যত কূল খুঁজে পাবেন না। এই অবস্থায় জোটবদ্ধভাবে বাজারমুখীনতা না কমাতে পারলে করোনা পরবর্তী সময়ে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষি এবং তৎসহ ভূমিহীন ক্ষেত মজুররা বাজারের অসম প্রতিযোগীতায় আরও বেশী ঋণগ্রস্ত হবেন এবং আর্থিক ভাবে কোণঠাসা হবেন।

তাই করোনা পরবর্তী সময়ে কৃষি ও তার সঙ্গে সংযুক্ত লক্ষ লক্ষ পরিবারকে বাঁচাতে বাজারবিহীন বিকল্পের খোঁজ করতেই হবে। প্রশ্ন তুলতে হবে, কৃষকেরা কি সব প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে লড়ে চাষ করবেন শুধুই বাজারজাত পণ্যের জন্য? বাজারের জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে একটু মুক্তির নিশ্বাস তো তাঁরও প্রাপ্য! সময় ছাড়া আর কারও হাতে নেই এই পরিস্থিতি ও প্রশ্নের সঠিক উত্তরগুলি।

(লেখক বগুলার শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক। মতামত লেখকের নিজস্ব)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More