জমি ছোট, দেওয়াল তো বড়! দুনিয়াকে সবুজ করার স্বপ্ন দেখছেন যাদবপুরের প্রাক্তনী

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কংক্রিটের শহরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই গাছেদের। একফালি সবুজের জন্য প্রয়োজনীয় জমিটুকুর বড় অমিল।
তাতে কী? জমি ছোট, দেওয়াল তো বড়!

জয়ব্রত ভাদুড়ি

সেই বড় বড় দেওয়ালে কি লাগানো যেতে পারে গাছ? এই চিন্তা থেকেই ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেনিং’-এর শুরুয়াত। বিদেশে শুরু হলেও, এই কাজেই দেশ-বিদেশে অন্যতম সফল নাম এ রাজ্যের সংস্থা ‘ক্যাপাক্লাউড’। আর যার নেপথ্যে রয়েছেন এক বাঙালি যুবক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী জয়ব্রত ভাদুড়ি। আজ, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আরও এক বার খোঁজ নেওয়া যাক দেওয়াল ভরা গাছেদের কারিগর কী বলছেন।

ছোটবেলা থেকেই গাছের নেশা ছিল জয়ব্রতর। সবুজ ভালবাসতেন। চেষ্টা করতেন, কোনও খানে একটু সুযোগ পেলেই নতুন চারাগাছ বসিয়ে দেওয়ার। গাছেদের বেড়ে ওঠা দেখা যেন নেশা ছিল ছেলেটার। সেই ছেলেমানুষি নেশাকেই যে এক দিন পেশা করবেন, সে পেশা যে বিশ্বের দরবারে প্রশংসিত হবে, একটি নতুন ধারণার পথ খুলে দেবে, কখনও ভাবেননি জয়ব্রত। এখন মার্কিন কনস্যুলেট থেকে শুরু করে জামশেদপুরে টাটা স্টিলের দফতর, অথবা রাজারহাটের ইকো পার্ক— সর্বত্র দাপিয়ে দেওয়াল ভরাচ্ছে ক্যাপাক্লাউড। যারা ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেনিং’ অর্থাৎ দেওয়াল জুড়ে উল্লম্ব ভাবে গাছ লাগানোর পদ্ধতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এ ভাবেই ভরছে দেওয়াল।

উচ্চমাধ্যমিকের পরে জয়েন্টে ভাল ফল করে আর পাঁচ জন ছাত্রের মতোই পড়তে শুরু করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তুখোড় ছাত্র জয়ব্রত চাকরিও পান আন্তর্জাতিক সংস্থায়। কর্মসূত্রে যেতে হয় জামশেদপুর, দুবাই, সিঙ্গাপুরে। চাকরিতে মন বসেনি, নিজের মতো কিছু করতে চাওয়া জয়ব্রতর। তাই চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন দেশে। কিন্তু লাভের লাভ হয় সিঙ্গাপুরে গিয়ে। সেখানকার দেওয়াল জুড়ে বেড়ে ওঠা বাগান দেখে ঠিক করেন, এমনটাই করা যেতে পারে আজকের এই স্থানাভাবের যুগে। গাছ লাগানো হবে, ঘর সাজানো হবে, হবে পরিবেশ রক্ষার ছোট্ট একটা পদক্ষেপও।

ইকো পার্কের দেওয়াল সাজিয়েছে ক্যাপাক্লাউড

তবে এই কাজেও জয়ব্রতরা ছাপ রেখেছেন স্বকীয়তা ও প্রযুক্তির। ভেঙেছেন বাগান করার চিরাচরিত প্রথা। বাগান মানেই যে মাটি-জল-সার নিয়ে হাতে-পায়ে মাখামাখি করতে হবে, দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করতে হবে, বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাওয়া যাবে না— এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে নিয়ে এসেছেন আধুনিকতা আর প্রযুক্তির সম্পূর্ণ প্রয়োগ। জয়ব্রত জানাচ্ছেন, এই কাজে ব্যবহার করা হয় জৈব ফাইবার, যা মাটির মতো দেওয়ালের কোনও ক্ষতি করে না। গুল্ম জাতীয় ২০০ রকমের গাছ লাগানো সম্ভব এতে। সাধারণ মাটির চেয়ে যা অনেকটা বেশি উর্বরও। ফাইবারের সঙ্গে থাকবে সার। যা থেকে নিজের প্রয়োজন মতো খাদ্য নিয়ে নেবে গাছ নিজেই। অতিরিক্ত সার কখনোই ফাইবারে মিশে যাবে না। আর এই সবটাই নিয়ন্ত্রিত হবে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। শুধু তা-ই নয়, কেউ বাড়িতে না-থাকলেও রিমোটের সাহায্যেও জল-সার দিয়ে পরিচর্যা করা সম্ভব এই বাগানের!

সবুজেই শহরের আড্ডা

জয়ব্রত বলছেন, “একটা ওয়াইফাই কানেকশন ছাড়া আর কিছুই লাগবে না এই বাগানের দেখভাল করতে। তা-ও টুজি হলেই চলবে।” তাঁর দাবি, এই ইন্টারনেট সংযোগেই কাজ করবে গাছের সঙ্গে লাগানো সেন্সর। সেন্সরের আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সকে কাজে লাগিয়ে, গাছের পিছনে মেনটেন্যান্স কস্ট, পরিশ্রম, সময়— এ সবই প্রায় শূন্য করা হবে। “না কোনও মালির প্রয়োজন, না আলাদা করে সময়। সেন্সর নিজেই মাটি থেকে ডেটা সংগ্রহ করবে। তার পরে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স কাজে লাগিয়ে বৈদ্যুতিক ভালভকে নির্দেশ দেবে, জল দরকার নাকি সার। এর পর জল-সার জোগান হবে বৈদ্যুতিক ভালভের মধ্যে।”—বলছেন জয়ব্রত। এই ওয়াইফাই কানেকশন, সেন্সর, ভালভ সব কিছু মিলিয়েই একটা গোটা বাগান তৈরি করবে ক্যাপাক্লাউড।

অভিনব অন্দর সজ্জায় জবাব নেই এই বাগানের

কেউ দেওয়ালে বাগান করতে চাইলে, গাছের সঙ্গে এই সব মেনটেন্যান্স ডিভাইসগুলিও বিনামূল্যে দেওয়া হবে বলে জানাচ্ছেন জয়ব্রত। তাঁদের মাধ্যমে বাগান তৈরির খরচ, ৬৫০ টাকা প্রতি বর্গফুট। যা কি না আন্তর্জাতিক বাজারে এই কাজে চলতি খরচের প্রায় অর্ধেক। অন্য কোনও সংস্থার উপর নির্ভর না করে, বাগানের প্রতিটা উপাদান নিজেরা তৈরি করায় এতটা কম খরচে মানুষকে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানাচ্ছেন জয়ব্রত।

দেখুন ভিডিও।

বড় বেতনের চাকরি এক কথায় ছেড়ে দিয়ে এ রকম নতুন কাজে ঝাঁপানো সহজ ছিল না বাঙালি ছেলেটির জন্য। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশোনা করা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা বছর বত্রিশের জয়ব্রতর কথায়, “চাকরি ছেড়ে দিয়ে এ সব কাজ করব শুনে প্রথমে মেনে নেয়নি কেউই। এখন অবশ্য সকলেই বলেন, এই কাজটা চাকরির চেয়ে অনেক ভাল।” মৌড়ীগ্রামে একটি নতুন নার্সারি তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন জয়ব্রত৷ বিনিয়োগ করেছেন বড় অঙ্ক। কর্ম সংস্থানও হয়েছে অনেকের।

ব্যাঙ্গালোরের সবুজ দেওয়াল

গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লেখা এবং বলা হয়েছে বহু কথাই। শহরে প্রতিদিন বেড়ে চলা দূষণ রুখতে গাছ যে সবচেয়ে উল্লেখোগ্য উপাদান, তা জানে ছোট্ট শিশুরাও। প্রতিদিন বেড়ে চলা গ্লোবাল ওয়ার্মিং থেকে এ বিশ্বকে বাঁচাতে ভরসা গাছেরাই। কিন্তু মানুষের চাহিদার কাছে নিত্য খুন হওয়ার কারণে, ক্রমেই সবুজশূন্য হচ্ছে পৃথিবী। সমাধান খুঁজতে প্রতিনিয়ত চলছে চেষ্টা। সেই চেষ্টাতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জয়ব্রতর এই ক্যাপাক্লাউড।

জয়ব্রত স্বপ্ন দেখেন, বাড়ি-গাড়ি-কংক্রিটের মধ্যেও তৈরি হবে অরণ্য। সবুজ হয়ে যাবে বিশ্বের সমস্ত দেওয়াল।

আরও পড়ুন…

অন্য এক স্বচ্ছ-অভিযান! শরীর-মনের বাধা সরিয়ে সবুজের বাজারে বেচাকেনায় মেতেছে ওরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More