একে ক্যানসার, তায় করোনা পরপর দু’বার! নির্ভয় অস্ত্রোপচারে সাফল্য কলকাতায়

১,৬৩৬

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কোভিড পরিস্থিতিতে সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিপদ নিয়ে বহু আলোচনা দিকে দিকে। গত কয়েক মাসে বারবারই শোনা গেছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে থমকে গেছে জরুরি অস্ত্রোপচার, কারও বা অপারেশন পরবর্তী ফলো-আপের মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে চিকিৎসা। বহু কঠিন রোগে ভোগা মানুষ রোগপ্রতিরোধ শক্তি কম থাকার কারণে সাহসই পাননি হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেওয়ার।

এই সবের মধ্যেই এক সুন্দর আশার আলো জ্বেলেছে অ্যাপোলো হাসপাতালে অঙ্কোলজি বিভাগ। এমন এক পরিস্থিতিতে এমনই এক অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে সেখানে, যা নিঃসন্দেহে কলকাতা তথা পূর্ব ভারতের মেডিক্যাল ইতিহাসের এক মাইলফলক!

একে কোভিড, একবার নয়, পরপর দুবার! তার উপর স্তন ক্যানসারের প্রান্তিক স্টেজ ৬৩ বছরের প্রৌঢ়ার। সংক্রমণের ভয় যেমন তুঙ্গে, তেমনই সে সংক্রমণ শরীর কতটা প্রতিরোধ করতে পারবে তা জানা নেই। আবার সেই সঙ্গে অস্ত্রোপচার না সারলে কর্কট রোগের কামড় ক্রমেই চেপে চেপে বসবে শরীরে। এই পরিস্থিতিতে অঙ্কোসার্জেন চিকিৎসক শুভদীপ চক্রবর্তী সিদ্ধান্ত নেন, পরিস্থিতি হাতে না থাকলেও, রোগীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে সবচেয়ে ভাল চিকিৎসা কী হবে, তা এক ও একমাত্র চিকিৎসকদের হাতেই রয়েছে। সেটাই করতে হবে।

হাল ছেড়ে না দিয়ে, কোভিড আক্রান্ত রোগিণীকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তোলেন তাঁরা, তার পরেই সিদ্ধান্ত নেন অপারেশনের। ম্যাস্টেকটমি অর্থাৎ স্তন কেটে বাদ দেওয়ার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল তাঁর। ডক্টর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ এক টিমওয়ার্কের পরিচয় দেন একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সাফল্যও আসে কয়েক মাসে। সদ্য বাড়ি ফিরেছেন রাজপুরের বাসিন্দা কবিতা কর্মকার। আপাতত সুস্থ তিনি। ক্যানসারের ঝুঁকিমুক্ত তাঁর শরীর। দীর্ঘ এক বছরের যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে বড় সময়ের জন্য।

কিন্তু কবিতাদেবীর এই জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না। বিশেষ করে চিকিৎসার শেষ পর্বে এসে পরপর দুবার কোভিড-দৈত্যর মুখে পড়ে কার্যত পণ্ড হতে বসেছিল চিকিৎসার শেষ ধাপ। কিন্তু চিকিৎসকদের আন্তরিক চেষ্টা ও দক্ষতায় সমস্ত প্রতিকূলতা পার করে জয়ী হয়েছেন কবিতা।

২০১৯ সালে পুজোর ঠিক পরেই ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়েছিল কবিতার। ছেলে অরিন্দম কর্মকার জানালেন, কবিতাকে প্রথমে টাটা মেডিক্যাল হাসপাতালে ও তার পরে অ্যাপোলো হাসপাতালে দেখানো হয়। মেডিক্যাল অঙ্কোলজি বিভাগে ডক্টর পিএন মহাপাত্রের কাছে চিকিৎসা শুরু হয়, তার পরে চলতি বছরের গোড়া থেকে কেমোথেরাপি শুরু হয়ে যায় কবিতাদেবীর। এর পরেই এ বছরের জুলাই মাসে অঙ্কোসার্জেন শুভদীপ চক্রবর্তীর কাছে অস্ত্রোপচার হবে বলে চূড়ান্ত হয়। তখন অবশ্য কেউ জানত না, কোভিডের ঝড় এমন করে আছড়ে পড়বে এ দেশে এমনকি এ শহরেও!

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে এর পরেই। কবিতাদেবীর অস্ত্রোপচারের ঠিক কয়েক দিন আগে, জুলাই মাসের ৯ তারিখে কোভিড আক্রান্ত হন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপোলোর কোভিড ওয়ার্ডে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু হয় তাঁরা। প্রায় দিন কুড়ি করোনা সংক্রমণের সঙ্গে লড়াই করে সেরে ওঠেন তিনি। ক্যানসারের রোগীর কোভিড সংক্রমণ—এই বিষয়টিই যথেষ্ট ঝুঁকির ছিল। চিকিৎসকদের দক্ষতায় সে ঝুঁকি এড়ানো যায়। কোভিড সারিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি, নেগেটিভ আসে রিপোর্ট।

এর পরেই ফের ঠিক করা হয় অস্ত্রোপচারের তারিখ। কিন্তু বিস্ময় ও বিপদ আরও বাড়িয়ে, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে অস্ত্রোপচারের আগে পরীক্ষা করায় ফের রিপোর্ট আসে কোভিড পজিটিভ! একই রোগীর দুবার পরপর কোভিড, সেই সঙ্গে ক্যানসারের অ্যাডভান্সড স্টেজ—এই ধাক্কা হজম করা যে কারও পক্ষেই খুব সহজ ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। তবে দ্বিতীয় দফায় তেমন কোনও উপসর্গ ছিল না কবিতাদেবীর। ফের কোভিড ওয়ার্ডে ভর্তি করে রেখে চিকিৎসা হয় তাঁর। দিন দশের ভর্তি থাকার পরে ৭ অক্টোবর কোভিড রিপোর্ট নেগেটিভ আসে তাঁর।

এর পরে ঠিক ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন চিকিৎসক শুভদীপ চক্রবর্তী। ৯ অক্টোবর নির্ধারিত অস্ত্রোপচার করা হয় কবিতাদেবীর। ম্যাস্টেক্টমি করে বাদ দেওয়া হয় একটি স্তন। সেই সঙ্গে বসানো হয় কেমোপোর্ট, যাতে পরবর্তীকালে কেমোথেরাপি নিতে সুবিধা হয় কবিতাদেবীর।

চিকিৎসক শুভদীপ চক্রবর্তীর কথায়, “এ যেন শাঁখের করাত পরিস্থিতি ছিল। করোনা ও ক্যানসারের আক্রমণে মৃত্যুর ভয় কুরে খায় রোগীদের। তবে এটা এই মহামারী পরিস্থিতিতে ক্রমে ‘নিউ নরমাল’ হয়ে উঠতে চলেছে। কবিতা দেবীর মতো সাহসী রোগীরা আমাদের গর্ব। আমাদেরও দায়িত্ব, যথেষ্ট সহানুভূতি এবং দৃঢ়তার সঙ্গে সবরকম ভয়কে দূরে সরিয়ে, সবরকম নিরাপত্তা নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া। অ্যাপোলোর মতো বিশ্বমানের সুপারস্পেশ্যালিটি হসপিটাল বলেই এটি সম্ভব হয়েছে।”

কবিতার ছেলে অরিন্দম কর্মকারের কথায়, “মায়ের কোভিড হয়ে গিয়েছিল, এতে কারও কিছু করার ছিল না। কিন্তু প্রথম থেকে চিকিৎসকরা যেভাবে পাশে থেকেছেন, সাহস জুগিয়েছেন, তা বলে বোঝানো যায় না। বিশেষ করে ডক্টর চক্রবর্তী, একটা বারের জন্য ভেঙে পড়তে দেননি। উনি নিজেও ভয় পান না, হয়তো, আমাদেরও পেতে দেননি। সকলের মিলিত চেষ্টায় এ বাধা পার করে সফল হলাম আমরা।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More