রবিবার, ডিসেম্বর ১৫
TheWall
TheWall

শহরের বুকে অভিনব এক ক্যাফে চালাচ্ছে স্পেশ্যাল চাইল্ডরা! বলছে, ‘আমরা উড়তে পারি’

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

চোখ আটকে যায় ক্যাফেতে ঢোকার মুকেই। উজ্জ্বল সব রঙেদের লড়াই লেগেছে যেন। এলোমেলো তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে এক অপরূপ চিত্রবিচিত্র। কেউ বা কারা যেন নিজেদের প্রকাশ করার অবাধ চেষ্টা চালিয়েছে দেওয়াল জুড়ে। সেই সঙ্গে আর এক দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য গাছ লাগিয়ে বানানো হয়েছে সবুজ হ্যাঙ্গিং গার্ডেন।  ক্যাফের ভিতরে ঢোকার পরেও সেই রঙেরই ছোঁয়া স্পর্শ করে রইল চেয়ার, টেবিল, কাউন্টার, সর্বত্র উজ্জ্বল রঙের ছোঁয়া। মন ভাল হতে বাধ্য। আর সেই রঙিন ক্যাফের ভিতরে একমুখ হাসি আর অনেকখানি আন্তরিকতা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে মেঘনা, সালোনি, কোমল, প্রকৃতি, অভিশ্রীরা। খুবই ব্যস্ত সময়, অনেক কাস্টমার। সামলাতে হবে তো সব কিছু!
গত বছরের গোড়ার দিকে দক্ষিণ কলকাতার হাজরায়, ম্যাডক্স স্কোয়ারের কাছেই গড়ে ওঠে এই ক্যাফে, ‘আই ক্যান ফ্লাই’। শহরে তো কতই ক্যাফে আছে। এই ক্যাফে কেন আলাদা? কারণ এই ক্যাফেতে গেলেই যাদের আপনি প্রবল ব্যস্ততায় সব কিছু সামাল দিতে দেখবেন, তারা প্রত্যেকেই বিশেষ ভাবে সক্ষম একদল ছেলেমেয়ে। ওরা স্পেশ্যাল।ওদের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ হয়তো ওদের বয়সি আর পাঁচ জন ছেলেমেয়ের চেয়ে একটু কম, হয়তো শারীরিক ভাবেও ফুটে ওঠে ওদের ‘অন্য রকম’ আচরণ। কিন্তু তাই বলে কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই ওরা। বরং অনেক বেশি তৎপর, হাসিখুশি, আন্তরিক। তাই তো মঙ্গলবার থেকে রবিবার প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওরাই চালায় ‘আই ক্যান ফ্লাই’ ক্যাফে। হাসি মুখে অর্ডার নেয় খাদ্য-পানীয়ের, নিমেষে তৈরি করে ফেলে দুর্দান্ত সব ডিশ, নিখুঁত ভাবে পরিবেশন করে টেবিলে টেবিলে। তারা বুঝিয়ে দেয়, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ আর কাজ করার পরিবেশ পেলে তারাও উড়তে পারে। দে ক্যান ফ্লাই।
এই অভাবনীয় ক্যাফের ভাবনা যাঁধের মাথা থেকে বেরিয়েছে, তাঁরা হলেন মিনু বুধিয়া এবং তাঁর বড় মেয়ে প্রিয়ম বুধিয়া। মিনুর ছোট মেয়ে, অর্থাৎ প্রিয়মের বোন প্রাচী স্পেশ্যাল চাইল্ড হওয়ার কারণে তাঁরা মর্মে মর্মে বুঝেছিলেন, কত ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় স্পেশ্যাল চাইল্ড ও তার পরিবারকে। কত বাধা আসে, কত লড়াই করতে হয়। যে বাবনা সবচেয়ে বেশি কুরেকুরে খায়, তা হল মা-বাবার অবর্তমানে সন্তানকে কে দেখবে। কীভাবে তার দিন চলবে, কোথায় গেলে সে নিরাপদ থাকবে, এ সব ভেবেই রীতিমতো আতঙ্কে থাকে স্পেশ্যাল চাইল্ডের পরিবার।
তাই বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে বিশেষ ভাবে সক্ষম এই সব ছেলেমেয়েরা বড় হলে যাতে স্বাধীন ভাবে, নিরাপদে দিনযাপন করার মতো অবস্থায় পৌঁছতে পারে, সে ব্যাপারেই চিন্তাভাবনা করতে থাকেন মিনু। নানা রকম বিষয়ে স্পেশ্যাল চাইল্ডদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন তিনি। নানা রকম ভাবে সমাজের সামনের সারিতে তুলে আনার চেষ্টা করেন বাচ্চাদের। এই চেষ্টারই এক নতুন সংযোজন, ক্যাফে আই ক্যান ফ্লাই। তবে এই ক্যাফের আগেই মিনু তৈরি করেছিলেন ‘আই ক্যান ফ্লাই’ ফাউন্ডেশন। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি বিশেষ ছেলেমেয়েদের নানা রকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো সেখানে। “সেখান থেকেই ক্যাফের কাজ করার জন্য বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, সেই  প্রশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা শুরু করি ক্যাফে আই ক্যান ফ্লাই। এখানে আমার যে ছেলেমেয়েরা কাজ করছে, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের কাজে দক্ষ, হয়তো আর পাঁচটা ‘স্বাভাবিক’ মানুষের চেয়ে বেশিই দক্ষ।’’– বলছিলেন মিনু। মিনু জানালেন, বিশেষ ভাবে সক্ষম এই সব ছেলেমেয়েরা যাতে একটা নিরাপদ জায়গায় নিজের সম্মান আর আত্মবিশ্বাস বজায় রেখে কাজ করতে পারে, নিজেরা রোজগার করতে পারে, সেটা সুনিশ্চিত করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। আই ক্যান ফ্লাই ক্যাফে তারই ফসল।মিনুর বড় মেয়ে প্রিয়ম বলছিলেন, ‘‘অনেকেই মনে করেন স্পেশ্যাল চাইল্ডদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তারা কিছুই করতে পারবে না কখনও। অপরের দয়া এবং করুণা ছাড়া তাদের আর কিছুই পাওয়ার নেই। সেই ধারণাটাকেই মিথ্যে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম আমরা। দেখাতে চেয়েছিলাম, একটু যত্ন, যথেষ্ট সহানুভূতি, এবং সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে ওরা কারও চেয়ে কম যায় না। এখন তো পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অনেকটাই পাল্টাচ্ছে।’’
চল্লিশ জন মতো কাস্টমারের বসার ব্যবস্থা রয়েছে ক্যাফেতে। প্রায় সব সময়েই বেশ ভিড় থাকে। রয়েছে আরামদায়ক পরিবেশ, ওয়াইফাই, দ্রুত অর্ডার নেওয়া, সুষ্ঠু পরিবেশন, সুস্বাদু খাবার আর অনাবিল আন্তরিকতা। একটা আধুনিক কফিশপে যা যা পাওয়া যায়, সবই মিলবে এখানে। সব মিলিয়ে যেন কলকাতার গর্ব ক্যাফে আই ক্যান ফ্লাই।
‘‘আমাদের ক্যাফেতে প্রথমে অনেকেই আসেন কৌতূহল থেকে। কেউ কেউ হয়তো সহানুভূতির কারণেও আসেন। কিন্তু সেটা কেবল প্রথম বারের জন্যই। কারণ এখানকার খাবার, পরিবেশ, আমাদের কর্মীদের আচরণ এতই ভাল, যে তার পর থেকে মানুষ ভাল জায়গায় আসার মতো করেই আমাদের ক্যাফেতে আসেন। সময় কাটান। ফিরে গিয়ে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়দের আমাদের কথা বলেন। এটাই আমাদের সাফল্য। আমরা আর পাঁচটা ক্যাফের মতোই একটা ভাল ক্যাফে গড়ে তুলতে পেরেছি এই ছেলেমেয়েদের দিয়েই। কোনও আপস করতে হয়নি কাজের বা খাবারের গুণমান নিয়ে। আমরাও পারি।’’– মিনুর গলায় গর্ব যেন উপচে পড়ে।
আর যাদের সঙ্গে নিয়ে, যাদের ভরসায়, যাদের দক্ষতায় চলছে এত সুন্দর আই ক্যান ফ্লাই ক্যাফে, তারা কী বলছে? কাজের সময়ে ভারী ব্যস্ত তারা। মোটেই রাজি নয় কাজে ফাঁকি দিয়ে গল্প করতে। তাই কথা বলার বিশেষ সময় নেই কারও। সকলের হয়ে একমুখ হাসি নিয়ে ক্যাফের সবচেয়ে পুরনো কর্মী মেঘনা জবাব দিলেন, ‘‘খুব ভাল লাগে আমাদের এখানে কাজ করতে!’’

Comments are closed.