এভাবেও ভাল থাকা যায়…

জীবন যেখানে সংকটে সেখানে শখ তো বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। তবে মনখারাপের পৃথিবীতে একমাত্র আপনি আপনার ভাল লাগার জিনিসগুলিকে নিয়েই ভাল থাকতে পারেন।

৩১

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সায়ন্তন যশ

বিশ্বজুড়ে এখন একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে– করোনা! করোনা! করোনা! গোটা পৃথিবী এখন এই অতীব ক্ষুদ্র জিনিসটির কারণেই ত্রস্ত। আর এই ভাইরাসটির কারণে পৃথিবীর অবস্থা এখন কেমন, কিংবা ভবিষ্যতে কেমন হবে এসব বিষয়ে অনেক আলোচনা আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে আর পরেও হবে। কিন্তু সবমিলিয়ে এখন পরিস্থিতি এমনই যাতে কারও মন ভাল নেই। আতঙ্ক আর সতর্কতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন এখন প্রতিটি মানুষের মনে।

এমতাবস্থায় ভারতে চলছে গৃহবন্দি দশা, যাকে টেকনিক্যালি লকডাউন বলা হয়েছে। শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবা চালু রেখে বন্ধ গোটা দেশ। প্রশাসন চিৎকার করে বোঝাচ্ছে সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব কতখানি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু মানুষ বড্ড উদাসীন, যেন বুঝতে পারছেন না এই ক্ষুদ্র জিনিসটি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। যারা দিন আনেন দিন খান, তাদের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য– ‘বাড়ি থেকে না বের হলে রোজগার করব কী করে আর খাবই বা কী?’ একথা যতখানি সত্যি, তার চেয়েও বেশি সত্যি দেশবাসীর জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আপনি বাইরে বেরিয়ে আক্রান্ত হলে রোজগার করতে বেরোনোর প্রকৃত উদ্দেশ্যই তো ব্যর্থ হবে। সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে যাতে মানুষের খাদ্যের অভাব না হয়। পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হলেও তা মোকাবিলায় সরকার অবশ্যই আপনার পাশে থাকবে। তাই দেশকে বাঁচাতে, নিজেকে বাঁচাতে, নিজের আপনজনদের বাঁচাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই ভাল। এবার অনেকে বিরক্ত হয়েই বলবেন– ‘বাড়িতে কি এভাবে বসে থাকা যায়?’
হ্যাঁ, বসে থাকা যায়। আর শুধু বসে থাকা নয়, বরং ভালও থাকা যায়।
বিষয়টা হল, আপনি ভাল থাকতে চান কিনা। যদি চান তবে উপায় নিশ্চয়ই আছে। তার জন্য পারিবারিক অশান্তি কিংবা বধূ নির্যাতন ছেড়ে নিজেকে একটু ভাল রাখার চিন্তা করতে হবে। সংবাদ সংস্থা সূত্রে দাবি করা হয়েছে, লকডাউনের ফলে ঘরে অশান্তি, বধূ নির্যাতন, মানসিক অবসাদ ইত্যাদির মতো বেশ কিছু ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধির সংক্রমণ বৃদ্ধি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এমন খবর সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা কি সত্যিই পারি না নিজেদের ভাল রাখতে?

পড়ার চাপে সেই কোন ছোটবেলায় ছবি আঁকাটা ছাড়তে হয়েছিল কিংবা হারমোনিয়ামটা তুলে রেখেছিলেন চিলেকোঠায়। এই গৃহবন্দি পরিস্থিতিতে এতখানি অবসরে একবার রঙ-তুলি হাতে নিয়ে আঁচড় কাটুন সাদা ক্যানভাসে। হয়তো খুব সুন্দর কিছু হবে না। কিন্তু এতদিন পরে নিজের শখটাকে ফিরে পেলে আপনার মনের ক্যানভাস রঙিন হবেই। কিংবা যদি গানের কথাতেই আসি। হয়তো হারমোনিয়াম বা তানপুরা থেকে ধুলো ঝাড়তেই একটা দিন লাগবে। কিন্তু তারপর সেই হারমোনিয়ামের রিডে কিংবা তানপুরার তারে যখন সুরের ঝলকানি উঠবে, তখন নিশ্চয়ই আপনার অবসাদে ঘেরা বেসুরো জীবনের সুরটাও খুঁজে পাবেন। লিখতে চেয়েও লেখা হয়ে ওঠেনি যে লাইনগুলো, সেগুলোকে নিয়ে একবার ভাবতেই পারেন। সেই একঝলকের প্রেমিকাকে দেখে যে কবিতা লিখতে শুরু করেও শেষ করতে পারেননি কাজের চাপে, অথবা গল্পের ক্লাইমেক্সটা খুঁজে না পেয়ে বন্ধ করে রেখেছিলেন যে ডায়েরিটা, সেটা খুলে বসুন এই অবসরে। হয়তো একদিনে হবে না কিছুই। তবে আস্তে আস্তে সেই কবিতার ছন্দে কিংবা গল্পের ক্লাইমেক্সেই আপনি নিজের ভাল থাকাটুকু খুঁজে নিতে পারবেন। যে কালজয়ী উপন্যাসটা পড়তে গিয়ে বুকমার্ক লাগিয়েছিলেন অফিসের কাজের চাপে, সেটা থেকে বুকমার্ক সরানোর ব্যবস্থা করুন এই বন্দিদশাতেই। কাগজ কেটে কিংবা তথাকথিত অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে সুন্দর কিছু তৈরির শখ থাকলেও করার সময় পাননি কোনও এক কারণে, এখন তো অনেক সময়; করে দেখান আপনার সৃষ্টিশীল কাজ। এরকম কয়েকশো উপায় বলা যায় নিজেকে ভাল রাখার। গানবাজনা, গল্প-কবিতা, ছবি আঁকা, লেখালিখি ইত্যাদি প্রায় কিছু না কিছু শখ আমাদের প্রত্যেকের ছোটবেলাতেই থাকে। অনেকে সবকিছুর মধ্যেও বাঁচিয়ে রাখেন শখটাকে। তবে বেশিরভাগ জনই ইঁদুর দৌড়ের জীবনের কারণে গলা টিপে শেষ করেছেন নিজের আহ্লাদ। এই দীর্ঘ অবসরে সেগুলোকে যদি আবার ফিরিয়ে আনেন, তবে কোনও মানসিক ব্যাধিই আপনাকে অবসাদগ্রস্ত করতে পারবে না।

গৃহবন্দি ভারতে এখন দূষণের মাত্রা অনেক কম। সূর্য জ্বলজ্বল করছে সারাদিন। রাতের আকাশও চাঁদের আলো আর তারাদের ভিড়ে সেজে থাকছে। সেই ছেলেবেলার পর কতদিন চাঁদমামার দিকে তাকাননি মনে পড়ে? কতদিন মিথ্যে তারা গোনেননি আকাশে! হয়তো সবটাই ছেলেমানুষী। কিন্তু সেই ছেলেমানুষী জীবনটাই তো প্রকৃত সুখের ঠিকানা। অনেক দেশ-বিদেশে ঘুরে তো অনেক ছবিই ফ্রেমবন্দি করেছেন। এবার না হয় বন্ধ ঘরের জানালায় বসে খাঁ-খাঁ দুপুর দেখুন যতদূর দেখা যায়। সূর্য ওঠা বা ডোবার সময় আকাশ কেমন রঙ বদলায় তাই দেখুন দু’চোখ ভরে। হয়তো অনভিপ্রেত। তবে কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যে যে অবসর পেয়েছেন, উপভোগ করুন সেটুকুই। সকলেরই প্রয়োজন অন্তত কিছুদিনের বিশ্রাম এসব কিছুর জন্য। কিন্তু দশটা-পাঁচটার যাঁতাকলে সপ্তাহে কোনওদিনই তো ছুটি থাকে না এসব ছেলেমানুষীর জন্য।

সবশেষে একটা কথাই বলি, জীবন যেখানে সংকটে সেখানে শখ তো বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। তবে মনখারাপের পৃথিবীতে একমাত্র আপনি আপনার ভাল লাগার জিনিসগুলিকে নিয়েই ভাল থাকতে পারেন। বন্দি অবস্থাতে একমুহূর্তের জন্য হলেও সব দুশ্চিন্তা সরিয়ে রেখে বলতে পারেন– এভাবেও ভাল থাকা যায়।

(সায়ন্তন যশ বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালিখিতে যুক্ত।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More