শনিবার, জুলাই ২০

জীবনের আয়না, রবিশঙ্কর বলের আয়নাজীবন

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

 ‘আয়নাজীবন’, রবিশংকর বল, দে’জ পাবলিশিং,  ১৫০ টাকা

উৎস থেকে নির্বাসিত সবাই তো ভাবে
ফিরে যাওয়ার দিন আর মিলনের কথা।  

সুফি কবি মওলানা রুমি ‘মসনবি’-তে এই কথাগুলি লিখেছিলেন। তাঁর সমগ্র কাব্যজুড়ে ঘরে ফেরার সুর। সেই সুর আমরা আর একবার শুনলাম রবিশংকর বলের ‘আয়নাজীবন’ উপন্যাসে। পর্যটক ইবন বতুতার কথনে বর্ণিত ‘আয়নাজীবন’-এর আখ্যানের কেন্দ্রে আছে মওলানার জীবন। ইসলামি ধর্মবেত্তা ও পণ্ডিত জালালুদ্দিন বল্‌খি থেকে মওলানা রুমি হয়ে ওঠার আখ্যান। সাতশো বছর ধরে তাঁর মসনবি গজল ধীরে ধীরে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে—তারই আখ্যান শুনিয়েছেন ইবন বতুতা। পৃথিবীর পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মওলানা সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন তাই তুলে ধরেছেন এই আখ্যানে।

আখ্যান বললেও প্রথাগত আখ্যানের যে ধরন তার সঙ্গে একে মেলানো যায় না। নিটোল কোনও কাহিনি বা আখ্যান প্রতিফলিত হয়নি ‘আয়নাজীবনে’। একটা যাত্রার কথা বলা হয়েছে। ইবন বতুতার হাত ধরে অনন্ত যাত্রা করেন এই উপন্যাসের পাঠকও। সে যাত্রায় উদগ্র হয়ে থাকেন মওলানা রুমি।

কাহিনি কথনে অদ্ভুত এক মায়াজাল তৈরি করেছেন লেখক। সেই মায়ায় হারিয়ে যেতে হয় পাঠককে। উপন্যাস পাঠ আর নিজেকে পড়া একই সঙ্গে চলে। নিজেকে খুঁড়তে খুঁড়তে, নিজের স্মৃতিকে খুঁজতে খুঁজতে নিজের মধ্যে লীন হয়ে যায় পাঠক। আমাদের চেতনায় তখন ম্লান হয়ে যান লেখক রবিশংকর বল।

অজস্র কিস্‌সার ভিতর দিয়ে এগিয়েছে ঘটনাক্রম। আরব্য রজনীর মতো কিস্‌সার পর কিস্‌সা একই সূত্রে গাথা। লতা-পাতা-ফুল-সমেত—এ যেন কিস্‌সার এক বাগান। মওলানার প্রিয় মুরিদ হুশাম বলেছিলেন—“সারা দুনিয়া, দুনিয়ার বাইরে যা কিছু, সবই এক একটা কিস্‌সা। খোদা তাঁর কলম দিয়ে আমাদের সব কাহিনি লিখে গেছে।” তাই তো এই আখ্যানে কিস্‌সার ঘনঘটা। এক জায়গার কিস্‌সা আরেক জায়গায় পৌঁছে পাল্টে যায়। এ প্রসঙ্গে লেখক বলছেন—“ধরুন কোনিয়ার এক কিস্‌সা গিয়ে পৌঁছল দামাস্কাসে। তো সেখানে কিস্‌সার ঘরগেরস্থি তো আরেকরকম। কিস্‌সার নতুন বিবি হয়, নতুন ছেলেমেয়ে হয়। সে কি আর কোনিয়ার কিস্‌সা থাকে ? তবু চেনা যায়, কেন জানেন ? চোখ দেখে। এই আপনি যেখানেই যান, যতই বদলে যান, আপনার চোখের ভাষা তো বদলাবে না। কিস্‌সার চোখের ভাষাই বা বদলাবে কেন, শেখ ?”

সব পুরনো কিস্‌সাই আবার নতুন হয়ে ওঠে। রবিশংকরের কলমে মওলানার কাহিনিও নতুন হয়ে উঠেছে। নতুন ভাবে পরিবেশিত হয়েছে। তবুও তা রুমির কাহিনি বলে চিনে নিতে অসুবিধে হয় না। এমনিতে কিস্‌সার মধ্যে আলোছায়া থাকে, অন্তরাল থাকে। স্বভাবতই ‘আয়নাজীবনে’ও তার প্রভাব পড়েছে। মওলানা একজন সুফি সাধক, কবি। সাধকদের যাত্রাপথ তো ছায়াময়। কখনো-বা অবিশ্বাস্য ঘটনায় ভরা। সেই যাত্রায় উঠে আসা মিথ, কিংবদন্তী, গল্পগাথাও প্রহেলিকাময়। তবুও যাত্রার সঙ্গে এগুলি নিবিড়ভাবে সংযুক্ত।

কিস্‌সার সূত্রেই এসেছে মওলানার বাণী, কবিতা, কথা। এসেছে অনন্ত পথের যাত্রী রুমির ঘরে ফেরার আখ্যান। আমাদের সকল উচ্চারণই তো এক অর্থে ঘরে ফেরার তাড়না। স্মৃতির কাছে ফেরার আকুলতা। তারই সুর মূর্ত মওলানার মসনবির পাতায় পাতায়। সেখানে কান পাতলে যে বাশিঁর সুর ধ্বনিত হয় তা আসলে ঘরে ফেরার জন্য কান্না। বাশিঁ কাঁদে। যে বেণু-বন থেকে তাকে কেটে আনা হয়েছিল, সেখানে ফেরার জন্য কাঁদে। সেই কান্নাও অন্তহীন। কিস্‌সার সময় এক অন্তহীন প্রবাহ, যার শুরু নেই, অন্তিমও নেই। প্রবহমানতাকে বাঁধা যায় না। লেখক তথা ইবন বতুতা আখ্যানের শুরুতে বলেছেন—“মওলানাকে আমি যতদূর জেনেছি, বুঝেছি, তাতে মনে হয়েছে, সাহিত্যের ভাষায় তাঁকে ধরা যায় না। বাঁশির সুরকে কি কোনও ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব ?” তাকে অনুভব করতে হয়। এই উপন্যাসও অনুভবের।

লেখক বলেছেন প্রেম ছাড়া মওলানার জীবনের কোরককে ছোঁয়া যাবে না। প্রেমের সঙ্গে মওলানার কথোপকথন তুলে ধরেছেন লেখক। প্রেম বলেছে সে অনাদি অনন্ত জীবন। সে কেবল জীবন প্রসব করে। হৃদয়ের আগুনে আর অশ্রুভেজা চোখ, অশ্রুনদীর তীরে আগুনের বাড়িতে সে থাকে। তার পরেই প্রেম বলে—“আমিই রঞ্জন। সবার কপোল আমি জাফরান রঙে রাঙিয়ে দিই। …নন্দিনী আছে আমার সারা শরীর জুড়ে। …সে-শরীর আলোর মতো, শব্দের মতো। মানুষের চোখে দৃশ্যাতীত। আমি দ্রুতগতি বার্তাবাহক আর আশিক আমার অশ্ব। আমি টিউলিপের গাঢ় লাল। আমি বিলাপের মাধুর্য। আর কিছু শুনতে চাও ?”

রঞ্জন-নন্দিনী। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’-র প্রসঙ্গ চমৎকার দক্ষতায় এনেছেন লেখক। শুধু এখানে নয়, আরও দুয়েকটি ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের কথা এসেছে। প্রিয় শিষ্য হুশামের কপালে চুম্বনচিহ্ন এঁকে দিয়ে মওলানা বিড়বিড় করে বলেছেন—“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়”। মওলানার মুখে লেখক বসিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। দুই মরমী কবি-দার্শনিক একাকার হয়ে গেছেন।

কথক যার জীবন কথা আমাদের শুনিয়েছেন সেই মওলানাকে তিনি কখনো চোখে দেখেননি। অথচ তাঁর স্মৃতিই তিনি আমাদের শুনিয়েছেন। আর তা পেরেছেন শুধু মাত্র ভালোবাসার জোরে। মওলানাকে ভালোবাসার জোরে। সেই ভালোবাসা এত তীব্র যে ভালোবাসতে-বাসতে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছেন তিনি। তাই এক সময় থেকে আরেক সময় প্রবাহের শরিক হয়ে গেছেন কথক। চিরন্তন প্রবহমানতায় মিশে গেছে তাঁর কথা। তাঁর কথকতা।

রবিশংকর এই আখ্যানকে আজকের সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে মেলাতে চাননি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোনও কোনও বর্ণনায় সমসময়ের রাজনৈতিক বয়ান খুঁজে নেওয়া যায়। যেমন মওলানা একবার বলেছিলেন—“নবাব-সুলতানদের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করতে যেও না। এইসব ক্ষমতাধররা একসময় ড্রাগন হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে যারা কথা বলে, বন্ধুত্ব করে, তাদের সম্পদ গ্রহণ করে, তারা একসময় ড্রাগনের ইচ্ছায় তার মতোই কথা বলতে শুরু করে। তারা হয়ে ওঠে ড্রাগনদের মতের প্রচারক। ড্রাগনকে প্রশ্ন করার কোনও ক্ষমতাই তার থাকে না আর তখনই ধর্মসঙ্কটের সূচনা। যতই তুমি ড্রাগনদের দিকে যাবে, ততই মূল পথ থেকে সরে যাবে। পার্থিব বিষয়ে যতই আকৃষ্ট হবে, ভালবাসা তখনই তোমার হাত ছেড়ে চলে যাবে।” এ কথন এক অর্থে সাম্প্রতিক সময়ের চিহ্ন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সময় নির্বিশেষে এতো ক্ষমতার সর্বগ্রাসী আধিপত্যের কথা। আসলে প্রত্যেকে তাঁর সময়কে ছুঁতে পারেন এই আখ্যানের সূত্রে। ‘আয়নাজীবনে’র স্বাতন্ত্র্য এখানেও।

ঐতিহাসিক চরিত্র, ঐতিহাসিক স্থান, সাল-তারিখসহ ঐতিহাসিক সময়কাল বারবার এসেছে এই উপন্যাসে। তা সত্ত্বেও ইতিহাস তেমন গুরুত্ব পায়নি। লেখক ইতিহাস থেকে সরে এসেছেন বারবার। কখনো বা লেখক ইতিহাসকেও নিজের মতো করে গুলিয়ে দিয়েছেন। একটা ফ্যানটাসির জগত তৈরি হয়েছে। এমন কিছু শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন যা কোনোভাবেই এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মেলে না। যেমন ‘দরবেশলজ’ শব্দটির কথা বলা যেতে পারে। দরবেশদের থাকার জায়গা। রাত্রিবাসের জায়গা। ‘লজ’ শব্দটি যে আধুনিক কালের এবং তা লেখক সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। ন্যারেটিভের মধ্যেও এসেছে কিস্‌সার প্যাটার্ন। ইতিহাস এখানে কাহিনির একটা সাপোর্ট শুধু। ইতিহাসের থেকে মানুষ বড় হয়ে উঠেছে। মানুষই হয়ে উঠেছে ইতিহাস।

লক্ষ করবার মতো এই উপন্যাসের শৈলী, বর্ণনাভঙ্গি। বহু আখ্যানে মূল কাহিনির সঙ্গে অজস্র উপকাহিনি এসে যুক্ত হয়। মূল কাহিনির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে সেগুলি। সহজেই কাহিনিকার উপকাহিনি ছেড়ে ফিরে আসেন মূল কাহিনিতে। এখানেও অজস্র উপকাহিনি। কিন্তু সেগুলি মূল কাহিনির সঙ্গে প্রকটভাবে যুক্ত নয়। এই উপন্যাসে কাহিনি চলেছে কাহিনির মতো করে। আবার উপকাহিনিগুলিও চলেছে স্বয়ং সম্পূর্ণ উপকাহিনির মতো করে। আসলে সেই অর্থে কোনও কাহিনিই তো নেই। তাই হয়তো এরকম বয়ন।

লেখক/ প্রকাশক ‘আয়নাজীবন’কে উপন্যাস হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। একে উপন্যাসের সঠিক সংজ্ঞায় হয়তো চিনেও নেওয়া যাবে, তবে বেঁধে রাখা যাবে না। আমাদের এত বছরের উপন্যাস-পাঠের অভিজ্ঞতাকে ধাক্কা দেয় এই আখ্যান। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে মনে হয়। আসলে ‘আয়নাজীবনে’ বিষয় এবং বর্ণনাভঙ্গি একাকার হয়ে গেছে। সুফি গায়ক যেমন আকাশ ও মাটির পরিসরে চক্রাকারে ঘুর্ণিনৃত্যে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন—এই আখ্যানের বর্ণনাভঙ্গির মধ্যেও এসেছে সেই মেজাজ। মওলানাকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে ঘুরেছে কিস্‌সা, নানান রকম গল্প, সুফি অনুষঙ্গ। সেই মেজাজ ধরতে না পারলে একঘেয়ে মনে হবে। কিন্তু একটু সচেতন থাকলে দেখা যাবে একই প্রবহমানতার মধ্যেও স্বরের ভিন্নতা, বোধের ভিন্নতা কত তীব্র। ধ্রুপদী সঙ্গীতের আলাপের মতো। উপন্যাসটির বিশেষত্ব এখানেই। কাহিনি, চরিত্র, আঙ্গিক, শব্দচয়ন, বর্ণনাভঙ্গি সমস্ত দিক থেকে স্বাতন্ত্র্যের দাবি করে ‘আয়নাজীবন’।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Leave A Reply