শনিবার, এপ্রিল ২০

অলৌকিক মূর্ছনার স্পন্দন, নীহারুল ইসলামের পিরনানার জ্বিন

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

পিরনানার জ্বিন
নীহারুল ইসলাম
আবিষ্কার
১০০ টাকা
প্রচ্ছদ: দেবাশিস সাহা 

নীহারুল ইসলামের ‘পিরনানার জ্বিন’ নামকরণ থেকে স্পষ্ট উপন্যাসের বিষয়। কিন্তু শুধু জ্বিন নয়, জ্বিনকে কেন্দ্র করে বাংলার লোকায়ত মুসলিম মানসের নিবিড় চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক। সেই গ্রামীণ চিত্র আমরা দেখি অচেনার বিস্ময়ে। কারণ লেখক শুধু চোখে দেখা নয়, মন দিয়ে দেখা জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এখানে। গ্রাম-বাংলার জলা-জঙ্গলের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে থাকা আখ্যানকে এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। আখ্যানে দুটি সমান্তরাল কাহিনি আছে। বোকাহাবা ল্যালহার কাহিনি ও কিশোর আয়ানের কাহিনি।

আয়ানের অংশটিই উপন্যাসে একটু গুরুত্ব পেয়েছে। তা-তো পাবেই। কারণ আয়ান যে পিরবাড়ির ছেলে। সেই বাড়িতে ১৭০টা জ্বিন আছে। লম্বা দালান বাড়ির পূর্বপ্রান্তের নিরালা ঘরে পিরসাহেব থাকেন তাঁর জ্বিনদের নিয়ে। কাহিনি এগোলে আমরা দেখব আরও একটা জ্বিনকে তিনি ধরবেন। মোট ১৭১টা জ্বিন। এরা সবগুলি ভালো জ্বিন। শয়তান জ্বিন নয়। কারো অনিষ্ট করে না।

এই বাড়ির তরুণ জামিরুল জ্বিনের চর্চা করে। শয়তানজ্বিনদের বশ করবে বলে মাঠ-ঘাট, বন-বাদাড় ঘুরে বেড়ায়। আয়ান তাকে বলে একদিন সে পিরনানার থেকেও বড় পির হবে। বড় পির হোক না হোক, জামিরুল শয়তান জ্বিনদের বেয়াদপি বরদাস্ত করবে না। ‘জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস’ বইটি আছে তার সংগ্রহে। একদিন গোপনে আয়ান বিস্মিত হয়ে পড়েছে সে বই—“শয়তান জ্বিন পাঁচ প্রকারের। প্রথম প্রকারের নাম সাবরাদ। তার কাজ বিপদ-আপদে মানুষকে বিভ্রান্ত করা। দ্বিতীয় প্রকারের—আউর। তার কাজ মানুষকে ব্যাভিচারে জড়ানো। তৃতীয়—মাসুত। তার কাজ মিথ্যা সংবাদ রটানো। চতুর্থ—দাসিম। মানুষের সংসারে ঢুকে অশান্তি লাগানো তার কাজ। আর পঞ্চম হল জিলনাবুর—এর কাজ হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে শয়তানি পতাকা পুঁতে বেড়ানো।”

এহেন জামিরুলভাই একদিন আয়ানকে বলে—“জ্বিন-ফিন কিছু নাই। সব ফালতু কথা বুঝলি আয়ান। আমি আর এখুন ওই সবে বিশ্বাস রাখি না।” পিরবাড়ির সন্তান হয়ে জামিরুল একথা বলছে! কিশোর আয়ান আঁতকে ওঠে। তার সবই গুলিয়ে যায়। কোরআন শরিফে আল্লা বলেছেন—আদমের দু-হাজার বছর আগে জ্বিনকে ধোঁয়াহীন আগুন থেকে সৃষ্টি করেছিলেন। জ্বিনের ভয় পেলে সে ‘আয়াতুল কুরশি’ আওড়ায়।

জ্বিনের অস্তিত্ব নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছে আয়ান তথা লেখক। জ্বিনেরা পিরবাড়ি পাহারা দেয়। পিরনানা যা বলেন তারা তাই করে। “…তাহলে পিরনানি শয়তানজ্বিনের হাতে শ্বাসরোধ হয়ে মরেছিলেন কী করে? তারপর জামিরুলভায়ের ঘরে উলঙ্গ মানুষের ছবির বই! আব্বার সঙ্গে মায়ের প্রেম! তাদের লুকিয়ে বিয়ে করা! আচমকা আব্বার কাছে মায়ের পালিয়ে যাওয়া। পিরনানা এসব আগাম জানতে পারেননি কেন?”

ল্যালহার কাহিনিতেও দেখি পিরসাহেবের প্রতি অবিশ্বাস স্পষ্ট। মোহোর কুড়িয়ে পেয়ে পরে জ্বিনের মোহোর বলে তা ফেরত দিতে এসে জ্বিন ভেবে যার সঙ্গে কথা বলে তিনি স্বয়ং পিরসাহেব। জ্ঞান হারানোর পরে পিরসাহেবের কাছে নিয়ে আসা হয় তাকে। পিরসাহেব জ্ঞান ফেরার পর জিজ্ঞেস করেন জ্বিন কেমন দেখতে ছিল। ল্যালহা স্পষ্ট করে বলে—“একেবারে আপনার মুতুন হুজুর।”

আলোচ্য উপন্যাসে জ্বিন প্রসঙ্গ এভাবেই এসেছে। জ্বিন এবং জ্বিনের মালিক পিরসাহেব বহু ক্ষেত্রে একাকার হয়ে গেছেন। জ্বিনের প্রতি সন্দেহ প্রকৃত প্রস্তাবে পিরসাহেবের প্রতিও। পিরসাহেব বুঝতে পারেন এমন কিছু কাণ্ড ঘটে যায়, যার অলৌকিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন না তিনি। বা তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যাকে সকলে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করছে না। এখানে ফরিদ সেখ নামে একটি চরিত্রকে এনেছেন লেখক। পিরনানার ভাগ্নে তিনি। শিক্ষিত মানুষ। দেশ-দুনিয়া ঘুরে বেড়ান। যদিও তাঁকে কাফের ভাবে অনেকেই। তিনি পিরনানার কথার প্রতিবাদ করেন সবার সামনে। মালদায় বাস দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে পিরনানার বক্তব্যকে তিনি খারিজ করে দিয়ে বলেন—“কী যে সব বলেন মামা! ঘটনা ঘটেছে ভোর রাতে। তখন গভীর ঘুমের সময়। অসবাই গভীর ঘুমে মগ্ন। ড্রাইভার বেচারা জেগে থাকবে তা কী করে হয়? বেচারার চোখ জুড়ে এসেছিল। সে তার স্টিয়ারিং ঠিক রাখতে পারেনি। সেই সুযোগে বাসটা ব্রিজের রেলিং ভেঙে একেবারে নদীতে। আর আপনি বলছেন শয়তানের কারসাজি।”

এহেন ফরিদ সেখও পিরনানার কথায় বলেন শয়তানে বিশ্বাসের কথা। পাশাপাশি সবকিছুর যুক্তিসঙ্গত ব্যাখায়ও বিশ্বাস করছেন। মনে রাখতে হবে নীহারুল এই আখ্যানে আধুনিক সময়কেই ধরেছেন। আধুনিকতার সঙ্গে, যুক্তিবাদিতার সঙ্গে রহস্যময়তা, কৌতূহলের কোনও বিরোধ নেই।

পিরনানার বিচার আধুনিক নবীন কিশোর আয়ানের পছন্দ হয় না। আয়ানকে তিনি যে সহ্য করতে পারেন না, তা আয়ান বুঝতে পারে। আখ্যানের শেষে দেখব জ্বিনের প্রতি সন্দেহ আয়ানের শেষ পর্যন্ত যায় না। তার ভাবনায়—“আমি অনুভব করছি জ্বিনের ভয়টা আবার আমার মনে জায়গা নিচ্ছে অদ্ভুত কৌশলে। আমার মন আবার বলতে শুরু করেছে জ্বিন বলে হয়তো সত্যি কিছু আছে। পিরনানার জ্বিন। তারা আমাদের দেখে। কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পাই না। আমি আমার গলায় ঝোলানো তাবিজ হাতড়াই। হাতে বাঁধা মাদুলি খুঁজি। পাশে আব্বাস শুয়ে থাকে অথচ কথা বলতে ইচ্ছা করে না। সন্ধেবেলা আঙিনায় পড়তে বসে আর আসমানের দিকে তাকাই না। কে জানে আমার প্রিয় গ্রহ-নক্ষত্ররা সব কেমন আছে! আমি হাসছি না বলে হয়তো তারাও আর ঝকমক করছে!”

আয়ান এভাবে কত কিছু ভাবে সারাক্ষণ। একা একা কথা বলে। বিভূতিভূষণের অপুর মতো অবিস্মরণীয় কিশোর। নীহারুল ইসলামের সমগ্র রচনার মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল চরিত্র আয়ান। আয়ানের মধ্যে আমরা প্রত্যেকে আমাদের শৈশব-কৈশোরকে খুঁজে পাই। লেখক তাঁর অনুভূতি দিয়ে অতি নিষ্ঠার সঙ্গে তাকে গড়ে তুলেছেন। পিরবাড়ির মধ্যে থেকেও প্রকৃতির নিজস্ব সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছে সে। সবার প্রতি বড় মায়া তার। সব কিছুকে সে বিস্ময়মুগ্ধ চোখে দেখে। মন, বুদ্ধি, হৃদয় দিয়ে আস্বাদ করে। সবার মধ্যে থেকেও সে আলাদা। কবিতার মতো, প্রিয় স্মৃতির মতো আয়ান পাঠকের হৃদয়ে মহার্ঘ সঞ্চয় হয়ে থাকে। লেখক নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতাকে আত্মমুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রতিভাত করেছেন আয়ান চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে।

আয়ানের মতো চরিত্রের কাছে ম্লান হয়ে গেছে ল্যালহা। যদিও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। বস্তুত, ল্যালহার সংক্ষিপ্ত অংশটি মূল আখ্যানে কিছুটা প্রক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। দুটি কাহিনি যেন আলাদা।

অদ্ভুত এক রহস্যময়তা আখ্যানের সঙ্গে লীন হয়ে আছে। গ্রামবাংলার যাপনচর্চায় কত রকমের রহস্য। লেখক মুনশিয়ানার সঙ্গে সেই রহস্যময়তাকে শুধু আখ্যানে নয়, চরিত্রনির্মাণেও ব্যবহার করেছেন। এই কারণেই উপন্যাসটি এতো আকর্ষণীয়। ভূত-প্রেত-জ্বিন-পরি… কেউ বানায় না। জীবনের অপার রহস্য থেকে জন্ম হয় এসব অলৌকিক ভাবনার। রহস্যের জল-হাওয়ায় তারা বেঁচে থাকে।

অনেক সময় দেখা যায় অলৌকিক প্রসঙ্গ, রহস্যময়তা কাহিনিকে বিশৃঙ্খল করে। এখানে তা হয়নি। বরং নীহারুল চমৎকার এক শৃঙ্খলার ভিতর দিয়ে আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। উপন্যাসের সেই অর্থে কোনও সমাপ্তি নির্দেশক অনুষঙ্গ নেই। এই আখ্যান অপার—অন্তহীন। যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন নানান রকম বিশ্বাস, ভয় তাকে জড়িয়ে থাকবে।

এই উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের মনে পড়বে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের কথা। সেখানেও জ্বিনের কথা ছিল। ছিল অলৌকিকতাও। কিন্তু দুটি যে আখ্যান সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র তা বলাই বাহুল্য।

নীহারুল ইসলাম তাঁর অন্যান্য লেখার মতো এখানেও লোকায়ত সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। বর্ণনায়, চরিত্রদের ভাবনায় লোকায়ত ডায়ালেক্টকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার পদ্মা-গঙ্গা মধ্যবর্তী অঞ্চল লেখকের অস্তিত্বে মিশে আছে। তাঁর সত্তায় লীন হয়ে আছে সীমান্ত-অঞ্চলের পল্লী-জীবন। তাই আলাদা করে তাঁকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়নি। পৃথক কোনও পরিশ্রম বা চেষ্টাও করতে হয়নি। তাঁর স্বাভাবিক অনুভবের প্রকাশেই মূর্ত হয়ে উঠেছে। উপন্যাসের পরতে পরতে তারই আশ্চর্য স্পন্দন ধ্বনিত। এক অলৌকিক মূর্ছনা সেই স্পন্দনকে অন্য একটি মাত্রায় উন্নীত করেছে এই উপন্যাসে।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Shares

Leave A Reply