রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

বুক রিভিউ মহানদীর মহান আখ্যান

মহানদী 

অনিতা অগ্নিহোত্রী

দেজ পাবলিশিং

মূল্য ৩০০ টাকা 

 

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

প্রাচীনকাল থেকে মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। জলের বহমানতার টানে কত কত মানুষ এসে বসত গড়েছে নদীর তীরে। সভ্যতার সঙ্গে নদীর সংযোগ বড় গভীর। এক অর্থে মনুষ্য সভ্যতার ইতিহাস, নদীর প্রবহমানতার ইতিহাস। নদীকে বিষয় করে বাংলায় কম উপন্যাস লেখা হয়নি। নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসের ধারায় নতুন একটি সংযোজন অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘মহানদী’ (২০১৫)। নদী-নির্ভর বাংলা উপন্যাসের পরিধি অনেকটা ব্যাপ্ত হল ‘মহানদী’র সূত্রে। বাংলার বাইরের বহমান কোনও নদী নিয়ে বাংলায় এরকম উপন্যাস সম্ভবত আগে কখনও লেখা হয়নি। শুধু এই কারণেই ‘মহানদী’ এবং তার রচয়িতা অনিতা অগ্নিহোত্রী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাঙালি পাঠকের কাছে।

উপন্যাসের বিষয়-পটভূমি ইত্যাদি বলতে আমাদের যে প্রথাগত ধারণা তার সঙ্গে ‘মহানদী’র আখ্যানকে মেলানো যায় না। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘মহানদী’-তে বিষয়-কাহিনি-আখ্যান এসব কোনও কিছুই নেই। আছে শুধু মহানদী-ই। আছে তার নিরলস বয়ে চলা। এই প্রবহমানতাই উপন্যাস। নদী এগিয়ে চলে, উপন্যাস এগিয়ে চলে, পাঠক এগিয়ে চলে, লেখকও এগিয়ে চলেন। এই সমস্ত চলা যেন একই তলে চলে। যেমন তালে নদী চলে তেমনি করে চলে এই লেখাও।

ভারতের অন্যতম দীর্ঘ ও বৃহৎ এই নদী ছত্তিশগড়ের ধম্‌তরি জেলার সিহাওয়া পর্বতের পাদদেশ থেকে বেরিয়ে ছত্তিশগড়ের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওড়িশায় প্রবেশ করেছে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার সম্বলপুরে মহানদীর বাঁধ বেঁধে তৈরি করা হয়েছে হীরাকুদ জলভাণ্ডার। এরপর সুবর্ণপুর ও বৌদ্ধ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে মহানদী টিকরপাড়ার গভীর অরণ্যসংকুল গিরিখাতের মাঝখানে এসে পড়েছে। এখান থেকে নয়াগড় হয়ে কটক জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে মহানদী জগৎসিংহপুরের কাছে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। হাজার কিলোমিটারের বেশি যাত্রাপথে আছে পাহাড়-পর্বত-মালভূমি-গিরিখাত-অরণ্য-সমতলভূমি-উপনদী-শাখানদী-মোহানা-অজস্র জনপদ-গ্রাম-শহর-বন্দর-জনহীন প্রান্তর ইত্যাদি। আর এই সবই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে মহানদীর জঙ্গম আখ্যানের পটভূমি। এহেন সুবৃহৎ ব্যাপ্ত পটভূমিতে আখ্যায়িত হয়েছে নদী সন্নিহিত অঞ্চলের মানুষজনদের যাপন, মিথ, কিংবদন্তী, লোককথা, লোকপুরাণ, মানুষের মুখে মুখে গড়ে ওঠা জনজীবনের ইতিহাস।

জলাধার এবং সেই সূত্রে নদী কত কত গ্রামকে নদীতে পরিণত করে দেয়। একটি এলাকার ইতিহাস-ভূগোল-সংস্কৃতি ধ্বংস করে দেয়। নদী যেমন বহু ইতিহাসকে মুছে ফেলে, তেমনি তাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। আসলে নদী বয়ে চলে ইতিহাস নিয়ে। যে সকল অঞ্চলের উপর দিয়ে মহানদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে সেই সব অঞ্চলের মিথ-কিংবদন্তী-লোককথা-কৃষ্টি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি-রাজনীতি-ঐতিহ্য… জনজীবনের প্রতিটি স্মৃতি-অনুস্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে মোহানার দিকে। সমুদ্রের বাতিঘরে গিয়ে যাত্রা শেষ হয়েছে। এই যাত্রাকালে নতুন নতুন ইতিহাস তৈরি করতে করতে এগিয়েছে মহানদী। সেই ইতিহাস-ই বিভিন্ন পর্বের ছোট ছোট এলোমেলো কাহিনিগুলিকে ছুঁয়ে আছে।

প্রবহমানতা, জঙ্গমতাই ‘মহানদী’ উপন্যাসের মূল সুর। গ্রন্থনার মধ্যেও আছে এই জঙ্গমতা। পর্বের কাহিনিগুলির সূত্রে নদী এগোয়নি। নদীর সূত্রে এসেছে কাহিনিগুলি। প্রতিটি পর্বের কাহিনিগুলিও হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে। বা মহাসমুদ্রে যাত্রা করেছে। নদীর স্রোতধারার মধ্যে যে রহস্যময়তা থাকে তার উৎসার বিভিন্ন পর্বে উৎকীর্ণ। কোনও কোনও কাহিনি মোড়া আছে রহস্যময়তায়। সেই রহস্যময়তা জীবনের রহস্যময়তা। মহানদীর রহস্যময়তা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তি চরিত্র যতটা না গুরুত্ব পেয়েছে তার থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জনপদগুলির সামগ্রিক যাপন। মহানদী যেমন ‘মহানদী’ উপন্যাসের মেরুদণ্ড। উপন্যাসের সমস্ত জনপদ এবং মানুষজনদেরও মেরুদণ্ড।

সমগ্র উপন্যাসে প্রচুর ঐতিহাসিক তথ্য, ঘটনা, সাল তারিখের উল্লেখ করেছেন লেখক। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রাবন্ধিকের রচনাও উদ্ধৃত করেছেন। কখনো কখনো পাঠকের মনে হতে পারে এটা কোনও গবেষণা গ্রন্থ। আবার কখনও-বা মনে হয় ইতিহাসের কোনও বই। এই উপন্যাসের ঐতিহাসিকতার একটি মহৎ ঐশ্বর্য আঞ্চলিক ইতিহাস। মহানদীর প্রবহমানতার সূত্রেই এসেছে এলাকার আঞ্চলিক ইতিহাস। লেখক অসাধরণ মুনশিয়ানায় আঞ্চলিক ইতিহাস-চর্চার সঙ্গে মিশিয়েছেন লোকপুরাণ ও লোকগল্পগুলিকে। ইতিহাস-চর্চিত অজস্র আখ্যান ‘মহানদী’ উপন্যাসটিকে মহাকাব্যিক ব্যাঞ্জনা দান করেছে। বইয়ের বিভিন্ন অংশে এসেছে নিখুঁত ভৌগোলিক তথ্য। বিভিন্ন সরকারি তথ্য এসেছে। খবরের কাগজের রিপোর্টও। রিপোর্টাজের মতো করে লেখা হয়েছে উপন্যাসের বিভিন্ন অংশ।

বিশ্বাসযোগ্য ও প্রামাণ্য করার জন্য গবেষণা-ঋদ্ধ বিষয়গুলির ব্যবহার করেছেন লেখক। সাহিত্য-শিল্প হয়তো বাস্তবের হুবহু ছবি নয়। কিন্তু তাকে বিশ্বাস্য ও সম্ভাব্য করে তুলতে হয়। নৃতত্ত্ব-ভূগোল-ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ, তথ্য সালতারিখসহ তুলে ধরে অনিতা ছুঁতে চেয়েছেন আখ্যানের বাস্তবতাকে। মহানদী যেমন বাস্তব, তেমনি এই উপন্যাসও দাঁড়িয়ে আছে বাস্তবের মাটিতে। আর এই বিষয়গুলি সবই কোনও না কোনও ভাবে লগ্ন হয়ে আছে মহানদীর সঙ্গে। ফলে উপন্যাসটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কিছু কম নয়। এযেন এক অর্থে মহানদীর ডিরেক্টরি। মহানদীর অ্যালবাম। মহানদীর ডকুমেন্টারি। মহানদীর দলিল। কিন্তু এই ঐতিহাসিকতা বা তথ্য-নিষ্ঠ গবেষণায় শেষ হয় না এই উপন্যাস। তথ্যনিষ্ঠার ভিতর দিয়ে সভ্যতার সামগ্রিকতাকে ধরতে চেয়েছেন লেখক। অন্য এক জীবনবোধের কথা বলেছেন। বাঙালি পাঠকের কাছে অচেনা-অজানা এক জীবনের আখ্যান, জীবনবোধের আখ্যান অভিনব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন এই উপন্যাসে। শেষ পর্যন্ত লেখকের জীবনানুভূতির সামগ্রিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে মহাকাব্যোপম উপন্যাস ‘মহানদী’।

সমস্ত দিক থেকে একটি নতুন ধরনের উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন অনিতা অগ্নিহোত্রী। আর সেই কাজে পুরোপুরি সফলও হয়েছেন। বাংলা উপন্যাসের আঙ্গিক-চেতনার প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে অনিতা অগ্নিহোত্রী কলম ধরেছেন। পাঠককে প্রথাগত বাংলা উপন্যাস পাঠের বাইরে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। আমাদের চেনা ভূগোলের বাইরে শুধু নয়, চেনা কাহিনি-নির্মাণের বাইরেও। বিষয় (যদিও প্রকৃত প্রস্তাবে কোনও বিষয় এই উপন্যাসে নেই)-পটভূমি-আঙ্গিক সমস্ত দিক থেকেই পাঠক প্রতিটি মুহুর্তে আবিষ্কার করতে করতে চলে। আবিষ্কারের আনন্দ এবং সাহিত্যপাঠের আনন্দ একাকার হয়ে যায়। সেই আনন্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে মহানদীর বহমান সুর। উপন্যাস শেষ করার পরও সেই সুরের ধারা অস্তিত্বে প্রবাহিত হতে থাকে। আমাদের উপন্যাস-পাঠের অভিজ্ঞতায় একটি মহার্ঘ সঞ্চয় হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকে ‘মহানদী’।

(বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।)

Leave A Reply