বৃহস্পতিবার, জুন ২০

কলকাতার অন্য এক ইতিবৃত্ত জয়ন্ত দে’র নতজানু

নতজানু, জয়ন্ত দে, মিত্র ও ঘোষ, ৪০০ টাকা

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

বাংলা কথা সাহিত্যের তথা আখ্যান সাহিত্যের জন্ম হয়েছে কলকাতায়। প্রথম যুগে কলকাতা সাহিত্যে উঠে এসেছিল নানান নকশাধর্মী রচনায়। বাংলায় প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র কলকাতাকে কেন্দ্র করে। এরপর বাংলা উপন্যাস কলকাতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। রবীন্দ্র-পরবর্তী ঔপন্যাসিকেরা কম বেশি সকলেই পটভূমি হিসেবে কলকাতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশ শতকের শেষ প্রান্তে, শহর থেকে নগর হয়ে ওঠা কলকাতা, কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল, নাগরিক সভ্যতার জটিলতা-যান্ত্রিকতা বাংলা ছোটোগল্পে যতটা উঠে এসেছে ততটা উঠে আসেনি উপন্যাসে। এই বদলে যাওয়া কলকাতাকে বিষয় করে যে অল্প কয়েকটি উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য একটি নাম জয়ন্ত দে-র ‘নতজানু’।

শুধু পটভূমি নয়, কলকাতা এখানে বিষয় হয়ে উঠেছে। এই আখ্যান যেন কলকাতারই একটি ঐতিহাসিক দর্পন। কলকাতার একটি বিশেষ অঞ্চল— কালীঘাটকে কেন্দ্র করে বিন্যস্ত হয়েছে আখ্যান। কলকাতার বাস্তবতাকে অন্য মাত্রায় তুলে ধরেছেন লেখক। একাধারে স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্নভাঙার কলকাতা।

এক উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের ভিতর দিয়ে ঘটনা ও চরিত্র এগিয়েছে। ভয়ংকর এক সময়। নকশালবাড়ি আন্দোলন, খুনোখুনির রাজনীতি তখন। হালদার পরিবারের বালক মুকুট বড় হয়ে উঠেছে এই অদ্ভুত গোলমেলে পরিবেশে। গোলমেলে সময়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুকুট বেড়ে উঠেছে। আর উপন্যাসও এগিয়েছে সেই সময়ের সূত্রে। মুকুটের চোখ দিয়ে সময়টাকে দেখেছি আমরা। কালীঘাটের বিচিত্র পরিবেশের মতো মুকুটের পরিবারেও কত বৈচিত্র্য। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যেও ভিন্ন এক জগত। নিষিদ্ধ জগতের হাওয়াও ঘা দিয়ে যায় তার যাপনে।

কালীঘাটের ছোট ছোট ছেলেরাও জানে নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধিসন্ধি। তারা জানে খারাপ পাড়ার মানে। সেখানে আছে তাদের বন্ধুরা। তাদের কারও বাবা নেই। বাবা থাকলেও সেটা অরিজিনাল বাবা নয়, পাতানো। বিয়ে না করেও বর হয়, বউ হয়, সব হয়। কিশোর পিন্টু পতিতা পল্লীর জুঁই-র জন্য পাগল। সে মুকুটকে বলেছে জুঁই তার সঙ্গে প্রেম না করলে বড় হয়ে চাকরি বাকরি করে ওকে পয়সা দিয়ে কিনে রাখবে। “ওর কাছে আমি একা যাব। আমি একা ওর বাবু হব।” বাবু হওয়ার মানে সে জানে। নথ ভাঙার মানে তারা জানে। নথভাঙা উপলক্ষে নিমন্ত্রণ পায়। একটা মেয়েকে চোখের সামনে খানকি হয়ে যেতে দেখে তারা। বন্ধু থেকে খানকি হয়ে যাচ্ছে। এবার মেয়েটি আর তাদের সঙ্গে খেলবে না। গলিতে দাঁড়াবে। খানকি হওয়ার আগে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায় সকলকে। মুকুটদের মিছরি এসে নিমন্ত্রণ করে বলে—“হাবুলের মেজদি বড় হয়ে গেছে। ওর মা কাল বিকেল বেলা তোদের নেমন্তন্ন করেছে।” লাইনের মেয়ে না হয়েও শামলী মাসির মতো কেউ কেউ থাকে ওখানে। দরিদ্র শ্যামলী মাসি সন্ধেবেলা ঘরভাড়া দেয়। শ্যামলী মাসির ছেলে-মেয়ে ফিটন-মিছরি তখন বাড়িতে ঢুকতে পারে না। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। একবার তো সারারাত্রি ঢুকতে পারেনি। বাড়ির বাইরে শুয়ে ছিল।

উপন্যাসে একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে রাজনীতি। রাজনীতির একটা চাপা উত্তেজনা উপন্যাসে স্পন্দিত। মন্দিরের পরিচালনা নিয়ে রাজনীতি, হকার্স ইউনিয়ন নিয়ে রাজনীতি, হকার্সদের বসার জন্য জায়গা নিয়ে রাজনীতি, এলাকা দখলের রাজনীতি সবই আছে। আমরা চাই বা নাই সব জায়গায় রাজনীতি ঢুকে গেছে তখন থেকে। আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও এই রাজনৈতিক নেতাদের কাজকর্মকে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। রাজনীতির সেই ট্র্যাডিশান সমান ভাবে চলছে।

আজকের কলকাতা থেকে বহু দূরে এই আখ্যানের সময়। কলকাতা তখনও আধুনিক হয়নি। চিনের চাউমিন তখনও আমাদের চাউমিন হয়ে ওঠেনি। তাই জাহাজে চাকরি করা প্রতাপ সাহা তার ছেলেকে চাউমিন খাওয়াতে চাইলে কেঁচো ভেবে ঘেন্নায় বমি করে। অন্যেরা পর্যন্ত বিরক্ত হয় এই ব্যবহারে— “নিজের পেটের ছেলের সঙ্গে কেউ এ ব্যবহারটা করে?… কেউ নিজের ছেলেকে ধরে কেঁচো খাওয়াতে পারে? কী কাণ্ড! কী কাণ্ড!” মোমো খেয়ে মুকুটদের মনে হয় মাংসের পিঠে। আবার বিনে পয়সায় ব্রয়লারের মাংস পেয়েও মাংসাশী যতন তা নিতে চাই না। ভাগ্নে মুকুটকে সে বলে মুরগির মাংস হলে অন্য কারও বাড়িতে নিয়ে যেতাম। বলতাম রান্না করে দিতে কিংবা গোলাঘরের পাশে নারানকে দিয়ে রান্না করাতাম। কিন্তু এ তো মুরগি নয়, অন্য কোনও জীব! দেখিসনি কেমন ব্যাঙের মতো থুম মেরে বসে ছিল। হাত বাড়িয়ে ধরল। একবার কঁকর কঁক ছাড়া একটা ঝটকাও দিল না। এ মুরগি হতে পারে না। আমি খেতে গেলেই বমি করে ফেলব।” কচ্ছপ বিক্রি তখনও নিষিদ্ধ হয়ে যায়নি। ক্যালকুলেটর তখনও দেখেনি অধিকাংশ মানুষ। চেতলায় ব্রিজ হয়নি। চেতলার হাটে যেতে হয় নৌকো করে।

কালীঘাট মানে শুধু কালীমন্দির নয়, কালীঘাট মানে পতিতাপল্লী, মাদার টেরেজার নির্মলহৃদয়, হকার্স কর্ণার, আদি গঙ্গা, কালী গঙ্গা, শ্মশান, পটুয়া পাড়া সব। মুকুটের মনে হয় কালীঘাট অঞ্চলটা যেন মুঘল সাম্রাজ্য! কত বড়! সেই পটুয়া পাড়া থেকে শুরু হয়ে পর পর কত কিছু দিয়ে সাজানো। আর সব কিছুই উপন্যাসে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। কলকাতার একটি প্রাচীন জনপদ তার খুঁটিনাটিসহ বিষয় হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসে। মুকুট টুলটুলকে বলেছিল—“কালীঘাট ছাড়াতে হবে। চারদিকে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। গঙ্গার জল কেমন কালো হয়ে গেছে। পাড়ের মাটিও কালো। বিশ্রী গন্ধ! দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার আর ভালো লাগে না এখানে। এই বাড়ি, এই কালীঘাট!” কলকাতার ভিতরের আরও এক কলকাতা বয়ে চলেছে কর্দামাক্ত আদিগঙ্গার কালো জলের মতো। সেই বহমান কলকাতার যাপন এই উপন্যাসের সম্পদ। এর শুরু নেই। শেষও নেই। আবহমানকাল ধরে শুধু বয়ে চলা আছে।

মহানগরের চোখ ধাঁধানো আলোর নীচের অন্ধকার জগত জয়ন্তের যাদু কলমে অন্য মাত্রা পেয়ে গেছে। এই শহরটা সম্পর্কে একজন ছড়া কেটে বলেছিলেন—“জাল জুয়াচুরি মিথ্যে কথা/ এই তিন নিয়ে কলকাতা।” ‘নতজানু’-তে কলকাতার এই তিনটি বৈশিষ্ট্য চমৎকার ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দুঃস্বপ্নের নগরী, মিছিল নগরী, স্মৃতির নগরী, মৃত নগরী, প্রাসাদ নগরী… এই সমস্ত বিশেষণে বিশেষিত কলকাতার চালচিত্র কালীঘাট-কেন্দ্রিক এই আখ্যানে মূর্ত।

‘নতজানু’-তে সেই অর্থে কোনও নিটোল কাহিনি নেই। আছে শুধু সময়। সময়ের বদলে যাওয়া। সময়ের প্রতিচ্ছবি। সময়ের একটার পর একটা পর্দা সরে যায় চোখের সামনে থেকে। আর আমরা আমাদের শৈশব-কৈশোরের ছবিগুলো এক এক করে দেখি মুগ্ধ বিস্ময়ে। সময় এবং কলকাতাকে একটি সর্ব শক্তিমান চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন লেখক। কলকাতার ক্রম পরিবর্তনের সাক্ষী এই আখ্যান। লেখকের লেখনীর গুণে নির্দিষ্ট সময়ের নিগড়ে তা আর আটকে থাকে না। সমসাময়িক ঘটনাও শিল্পের গুণে চিরকালীন হয়ে ওঠে। আর তা হতে পারে জয়ন্ত সময়ের কথা বলতে গিয়ে আসলে মানুষের কথা বলেছেন বলে। লেখকের পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশনের গুণে আশ্চর্য এক মহানগরের আখ্যান হয়ে উঠেছে ‘নতজানু’।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Leave A Reply