বুধবার, জানুয়ারি ২৯
TheWall
TheWall

ছন্দভাস্কর্য ও আধুনিকতায় নতুন কবিতার স্পন্দন  গান লেখে লালনদুহিতা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

গান লেখে লালনদুহিতা

বেবী সাউ

প্রকাশক- আবহমান

প্র্চছদ রানা দাস

মূল্য -৫০ টাকা

 

উৎপল চক্রবর্তী

জীবনের প্রবাহ অবিরাম নির্ঝরের  মতো। আবার তার স্বপ্নভঙ্গেরও মতো। কখনও জীবন সুন্দর ভুবন। কখনও মৃত্যু শ্যামসুধা। তাই কবিরা বিষাদের, বিচ্ছেদের ছবি যেমন আঁকবেন তেমনি আঁকবেন প্রেমেরও ।
কিন্তু কেমন সে প্রেম? কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ গান লেখে লালন দুহিতা’। নামটি শোনা মাত্র মনে আসে লালন ফকিরের  দর্শন। তাঁর চোখে প্রেম অপার্থিব। শরীরকে অতিক্রম করে তা মানবাত্মার মিলনাকাঙ্ক্ষী। তাই লালন দুহিতা যে সেই প্রেমের স্পর্শ পেতে চাইবেন তা বলা বাহুল্য। কিন্তু বর্তমান সমাজে কি সেই প্রেম বিদ্যমান? কবির কী পরিলক্ষণ?

১.’মানুষ চেয়েছে দেহ, প্রেমহীন বিষাক্ত চুম্বন।’
২.’গোপনে পুষেছে লোভ,প্রেম নেই’।
৩.’ শ্রাবণ ঝরেছে বহু, ভিজছেন একা রাধিকারা।’
৪’ মেয়েটি বিবাহ ভাবে, পুরুষেরা পোষা মৃতদেহ।’
৫.’পুরুষ পাখি সে যেন কতকিছু রংঢং জানে’।
৬.’পুরুষ পাখিটি বোঝে মেয়েজন্ম প্রেমের কাঙাল’।
৭.’অস্পষ্ট এ মেয়েজন্ম ঘাতকের হত্যার সংযমে’।

প্রেমহীন চুম্বন মানেই তা ক্ষতিকর। বিষাক্ত। কবির ভাবনায় অব্যর্থরূপে ধরা দেয় সেই বিষে ভরা পৃথিবীর ছবি। কিন্তু সব পুরুষই কি তাই? শুধুই সম্মোহন? না কি এ কোনও কাব্যিক অতিরজ্ঞন, যা বাস্তবের মর্মসত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়?

তাই বোধহয় কবি যেন অধিকাংশ সময়ে একলা মেয়ের পক্ষ নেন:
‘ কাজল পরে না মেয়ে, চোখ তার শ্রাবণের মতো।’
কিংবা,
‘ শ্রাবণ ঝরেছে বহু, ভিজছেন একা রাধিকারা।’
একলা মেয়ের রাতজাগা কালো চোখের বর্ণনার  মাধ্যমে  লোলুপ পুরুষের প্রেমহীন শরীরসর্বস্ব অসারতার কথা যেমন প্রকট হয়েছে তেমনি মুখর তার অন্তরব্যপ্ত মৌন বিষাদ বা মানব প্রেমের অন্তর্ঘাত।
বেবীর কবিতার বিশেষ দিক কৃষ্ণ-রাধার  প্রেমের চিত্রকল্পের মোড়কে পরিবেশিত আজকের সমাজের মেকি প্রেম । কৃষ্ণের বংশীর ধ্বনির মতো মনকাড়া  প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রেমিক আসে। বিবাহ করে। সাক্ষী থাকে জড় রেজিস্ট্রি অফিস। মগ্ন রাধিকা প্রেম যমুনায় ডুবে বেঁচে থাকেন অপার আনন্দ সাগরে। আর আধুনিক দুষ্টু প্রেমিক রাধাকে ডুবিয়ে দেয় বাস্তবের যমুনা জলে।
‘কানহা মানেই চলে যাওয়া’।

বর্তমান পুরুষতান্ত্রিকতায় নারী এখনও অসহায়, প্রকৃত প্রেম খুঁজে খুঁজে বেড়ায়।
বেবির ১৬ নং সনেটের দ্বিতীয় চতুষ্টকের শেষ লাইনে আছে সেই অসহয়তার এক হৃদয়বিদারক অশ্রুপূর্ণ হাহাকার:
‘ভালোবাসা চায় মেয়ে দু- বেলার ভাতের বন্ধনে’।
কবির ৫৪নং সনেটের তৃতীয় চতুষ্টকের শেষ লাইনেও বিদ্ধৃত দেখি এই যন্ত্রণার আরেক প্রতিচ্ছবি:
‘সন্তান প্রসব শোক অন্যদিকে লোভ পুরুষের’।
৩৩নং সনেটের কাপলেটে যেন সেই বিষণ্ণতার ক্লাইম্যাক্স:
‘নির্লিপ্ত চোখের জল, মৃত নদী বরাবর ক্ষেত’।
লালন ফকিরের গানকেই যেন এগিয়ে নিয়ে চলেন কবি। লালনের মায়াসংসারের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কবিতায়।
প্রথম কবিতার দ্বিতীয় চতুষ্টকে তাঁর অকপট বক্তব্য:
‘এই জন্ম, এই মৃত্যু শ্মশানের পেতে রাখা চিতা’।
অথবা ওই কবিতারই কাপলেটের শেষ লাইনে স্পষ্ট উচ্চারণ :
‘মায়ামৃত্যু মায়াজন্ম গান লেখে লালন দুহিতা’।
অথবা ৩২ পৃষ্ঠার শেষ পঙক্তি:
ফকির লালন গাও, গাও এই জন্মমৃত্যুশোক।
তাহলে এই অসার সংসারের গল্প শোনাচ্ছেন লালন কন্যা।

কিন্তু  একথাও অনস্বীকার্য যে বেবীর কবিতা বহুমাত্রিক।
কোনও কোনও কবিতার একেকটি কোয়াটরেন একেকটি কবিতা। পুরুষ সম্বন্ধে তাঁর কিছু কিছু বক্তব্য  তাঁর পূর্বোক্ত  একমাত্রিক ভাবনাকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়:
‘প্রেমিক পুরুষ সে তো ভুল নেই?’
‘প্রেমিক পুরুষ কানহা,বেসেছিল অন্ত্যহীন ভালো’।
তাঁর কবিতায় গভীর জীবন বোধের  বর্ণালীতে পরিব্যাপ্ত।
তাই হয়তো  তিনি কোথাও লালনকে  বিষাদ বালকের প্রতীক রূপে দেখেছেন।  যে লালনের গানে আধ্যাত্মিক প্রেমের জোয়ার, যে কৃষ্ণের বাঁশি পরস্ত্রীর (এঁটো রান্নাঘরে)  মনে  বেজে ওঠে তা তো শরীরী প্রেম নয়।
লালন কন্যার লালন আসলে কে? কী ছিল তার প্রেমের উৎস? ‘কবির বসনধারী’ সে কি এক ‘বিষাদ বালক? কেন সেই বিষাদ? তাহলে কি কবি বলতে চেয়েছেন প্রেমের কপটতা পাহাড়ের মতো প্রাচীন?
এই সব হাজারো প্রশ্নের বহুতর উত্তরে জারিত বেবীর কাব্য ভাবনা।

তাঁর কবিতার বিষাদঘন আবহের আড়ালে এই ‘বিষাদ পাথারে’, এই প্রাণহীন মানব শহরের প্রাচীর ফুঁড়ে মাঝে মাঝে স্ফূরিত হয় আশাবাদ-
‘ধাতব নগরী এই, চারপাশে সশস্ত্র পাহারা/ তবুও গাইছে কেউ গোলামের বিশুদ্ধ খেয়াল’।
বিশুদ্ধ খেয়াল গান, ধ্রূপদী আলাপ বা সুস্থ সংস্কৃতির গোলাপি সৌরভ ছেড়ে মানুষ আজ কৃত্রিমতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। এ কথা যেমন ঠিক তেমনি ঠিক কেউ কেউ সেই পুরাতন ও চিরন্তন গৌরবকে একা কুম্ভের মতো রক্ষা করে বহন করে নিয়ে চলেছে:
‘তুমি যে দূরের এক, পাহাড়ের মত ধ্যানঋষি/ কান্নাকে থামাতে জানো, সমুদ্র জেনেছে নীলবাঁশি’।
কবিতা বা মনকাড়া গানের উৎস কী?  প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কবি সে উত্তর যেন বার বার ধ্বনিত করছেন কাব্যের আড়ালে।
যতটা না আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি বোধহয় দু:খ থেকে, অন্তরের প্রদাহ বা  ক্ষত থেকে লেখা হয় কবিতা।
চারদিকে রাস্তায় কলুশতা ও অপ্রেমের পেরেক পোঁতা। তার উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে মরমীর রক্তক্ষরণ হবেই। কবিরা বলে উঠবেন বেবির মত চুম্বনেও আয়ুহীন গভীর ক্ষত(২২ নং সনেট) আর ছদ্মবেশী বন্ধুর গোপন তরবারির আঘাতের কথা( ব্রুটাসের শাণিত ফলক; ২৩ নং সনেট)।দেশজুড়ে ভ্রূণহত্যা এক ভয়ংকরতম ব্যাধি। কবির কোনও কোনও কবিতায় সেই ব্যাধির অশ্রুপূর্ণ উচ্চারণ :

‘কৃষিক্ষেতে পড়ে থাকে শিরিষ গন্ধের মৃত ধান।’ (২৪ নং সনেট)
২.’পুরুষ জেগেছে রোদে, কৃষিক্ষেতেই সর্ষের ভ্রূণ ‘।

কখনও গুরু গম্ভীর তদ্ভব শব্দের সঙ্গে আধুনিক বাংলা ও ইংরেজি শব্দের মিলন বেবীর  কাব্যসৌন্দর্যের অন্য আর এক দিক:
১. প্রেমিক পুরুষ কান্হা, গার্লফ্রেন্ড আই মাসকারা।(৪৫ নং)
২. স্লামডগ পোষ মানে, পাঁজরের হাড়ে রক্ত ক্ষত।(৫৭ নং)
৩.ছেলেটিও রাস্তা আঁকে,সাদা নীলের কম্বিনেশন।(৪৪নং)
৪.ব্রেইলে শব্দের ভার, সাদা কালো রঙের আলোক। (৪৪নং)
৫. বিক্ষোভ শহরে নামে, দরজাতে মানিপ্ল্যান্ট পোতা।(৩৮নং)
৬. অসম প্রেমের গল্প পুরোহিত জানে হারপুন।(৩৭নং)
৭.প্যাকিংবাক্সে জমা তৃষ্ণা ঘাম নিবিড় ক্ষুধার।(৫৭নং)

তাঁর কবিতায় ছড়াছিটানো অসংখ্য অনবদ্য চিত্রকল্প। বাঁধা গতের বাইরে গিয়ে তারা নি:সন্দেহে পাঠককে আলোড়িত ও মোহিত করে।
‘শকুন আসলে শোক’, ‘গমশীষ রাতের পালঙ্ক’, ‘শ্রাবণ টুরিস্ট’, ‘নীলপদ্ম যোনিক্ষেত’, ‘ব্রজমেঘ’-সহ
অসংখ্য সুন্দর ইমেজে পূর্ণ ‘লালন দুহিতা’। এদের মধ্যে শিবকালির নিম্নোক্ত পরিচিত্রটি মনোমুগ্ধকর :
‘প্রেমিক পেতেছে বুক পাঁজরে তার আলতার ক্ষত।’
মাত্রকয়েকটি মুদ্রণ প্রমাদ বাদ দিলে আবহমানের পক্ষ থেকে কবি হিন্দোল ভট্টাচার্যের সুনিপুণ সম্পাদনা এককথায় অনন্যসাধারণ। কাব্যের ছলে কবির অকপট ঋণ স্বীকার অনবদ্য:
‘হাত ধরে ছন্দ শেখা, নতজানু হে আবহমান’।
মাত্র কয়েকটি কবিতায় অন্ত্যমিলে আরেকটু দৃষ্টি দিলে হয়তো ভালো হতো। তবে অধিকাংশ কবিতাতেই নিখুঁত ১৮ মাত্রার ছন্দ ভাস্কর্য কবিতার অন্যতম সম্পদ।

কবি ও লেখক উৎপল চক্রবর্তী ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। সাহিত্য বিষয়ক লেখালেখির পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি এই দুটি ভাষাতেই তিনি কবিতা, প্রবন্ধ ও ছোটগল্প লেখেন। তাঁর লেখা দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে । প্রথম কাব্যগ্রন্থ,’ উড়ন্ত ডলফিন’ আনন্দ( সিগনেট)। 

Share.

Leave A Reply