বইমেলার চারটি বই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

গৌতমকুমার দে

দ্য ওয়াল ওয়েব পোর্টালে বিভিন্ন সময়ে বেরিয়েছে নানান রকমের ধারাবাহিক। তাদের মধ্যে কয়েকটি পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়েছে বই আকারে। এমন চারটি বই হাতে এল এ বারের ৪৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়।
মৃত্তিকা মাইতির উপন্যাস ‘পাখিঘর’। মেয়েদের হোমকে নিয়ে এই উপন্যাস যেন পাঠকের রুচির গালে এক থাপ্পড়স্বরূপ। ঔপন্যাসিকের মর্মভেদী ও উচ্চকণ্ঠ শব্দ ব্যবহারের ক্ষমতা মূর্ত করে তোলে হোমের বাসিন্দাদের রোজনামচা। পাশাপাশি, উঠে আসে হোমকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা অনিয়ম-বেনিয়মের নীল জগৎ। প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত-অপমানিত হোম-মাদার পরমা নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে হোমের মেয়েদের দুঃখকষ্টের মাঝে। ক্রমে বেদনা-বিধুর বিষাদ-প্রতিমা পরমার জীবনকে আঁকড়ে থেকে মুক্তি পেতে চাওয়ার প্রয়াসে নিজের অজান্তে জড়িয়ে যান পাঠকও। গদ্যের এই সম্মোহন বড় নির্মল প্রাপ্তি এই উপন্যাস পাঠের ক্ষেত্রে। মেয়েদের জগতেদর নানান মুহূর্তে খুঁটিনাটি বর্ণনাতেও সফল ঔপন্যাসিক। আত্মঘাত, ক্রোধ, আবেগ, অপমানবোধ, করুণা, প্রার্থনা, ইচ্ছা প্রভৃতি ছোট ছোট Note হয়ে মণিমানিক্যের মতন জেগে আছে গোটা উপন্যাসের শরীরে। এ এক আশ্চর্য জীবনকথা।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ফ্রান্সের তরুণ লেখকরা যেমন ‘নিও নভেল রেভোলিউশন’ শুরু করেছিলেন, আজকের নবীন ঔপন্যাসিক মৃত্তিকাদের প্রশ্নের মুখে অদূর ভবিষ্যতে দাঁড়াতে হতে পারে আজকের তথাকথিত বাজার-সফল কোনও কোনও ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিককে। ঠিক যেমন ফরাসি লেখককুল তাঁদের নিজস্ব বিচারসভায় টেনে এনেছিলেন তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের।
যেন এক উদ্বিগ্ন-আত্মার পদচারণা গোটা উপন্যাস জুড়ে। যাকে প্রেরণা যুগিয়েছে নিরন্তর– চূড়ান্তভাবে বাঁচার ধারণা। অপসৃয়মান টুকরো টুকরো ইমেজগুলোর অনুরণন জেগে থাকে, উজ্জ্বল অর্থময় হয়ে ওঠে পাঠান্তে। সাহিত্যিক অরিন্দম বসুর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ পরশপাথর প্রকাশন-এর এই বইটির অলংকারস্বরূপ।

ব্লগ-এ লেখা গ্রন্থাকারে বেরচ্ছে এখন। অংশুমান করের ‘WALL লিখন’ও সেই ধারার একটি বই। সব মিলিয়ে ২৩টি লেখা। সামান্য অতিসামান্য আপাতদৃষ্টিতে যা মূল্যহীন, তুচ্ছপ্রায় সে সবের মধ্যেও যে আছে মহত্বের ছোঁয়া, তারই সন্ধান দেয় পেশায় ইংরেজির অধ্যাপক অংশুমানের লেখাগুলো। কোনও কোনওটার দীপ্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে ব্লগ-লেখকের দার্নিক লেখনীর ছোঁয়ায়। যেমন– ‘দেখিস নে কি শুকনো-পাতা ঝরা-ফুলের খেলা রে…’ কিংবা ‘সাদা কাগজের একটা পাখি আজ অন্ধ রাত্তিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে…’। বিচিত্র মানুষ-সঙ্গ, নানাবিধ অভিজ্ঞতা, নির্ভার উদার মানসিকতা রয়েছে লেখাগুলোর ভরকেন্দ্রে। যাকে ঘিরে আবর্তিত লেখকের ভাল লাগা, ঘোর, দেখার দৃষ্টি– সব মিলিয়ে তুচ্ছের মহতী উদযাপন। আগাগোড়া যাকে ঘিরে রয়েছে এক স্মৃতির বলয়। মূলত ব্যক্তিগত গদ্য, কিন্তু লেখনীগুণে তা ব্যক্তিগত সীমানা ভেঙে হয়ে ওঠে সর্বজনীন। যেখানে পাঠকও নিজেকে তার অংশীদার ভেবে নেন। এখানেই ব্লগ রাইটারের সাফল্য। বলতে দ্বিধা নেই, ‘ওয়ার্ডরোবের মাথায় এখনও তাঁর চশমা’ জাতীয় লেখা মনে পড়ায় উমবের্তো একোকে।
রঞ্জন দত্তর প্রচ্ছদ যথাযথ। বইটির প্রকাশক: দে’জ পাবলিশিং।

‘মেঘমল্লারে হত্যার গান’ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তর লেখা গোয়েন্দা কাহিনি। একটানে পড়ে ফেলার মতই। গোয়েন্দা কাহিনিতে গোয়েন্দাকে যেমন বিস্তর দৌড়োদৌড়ি ও পরিশ্রম করতে দেখা যায়, এখানে ঠিক তার উল্টো। গোয়েন্দা রঞ্জনী সমস্যার সমাধান করে পুরোটাই মাথা খাটিয়ে। যুক্তির সিঁড়িভাঙা অঙ্কে, নিপুণ পর্যবেক্ষণ ও ধুরন্ধর অনুমানশক্তির ভিত্তিতে। ফাইলের নামকরণটিও (যথা মেঘমল্লার) কাহিনির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
বইটির উৎসর্গপত্রটি চমকপ্রদ। বন্ধুর প্রতি লেখকের কৃতজ্ঞতার আন্তরিক নিদর্শন। ব্লার্বে লেখকের পরিচিতিটুকুও চলতি ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী। প্রচ্ছদ অত্যন্ত কাঁচা বললেও কম বলা হয়। প্রকাশক: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি.।

প্রতিষ্ঠিত কবি একরাম আলির ছাত্রজীবন এবং তার পরেও কিছুদিন (সাকুল্যে ১৯৭৪-৭৮) কেটেছিল কলকাতার মেসে। তাঁর ‘হ্যারিসন রোড’ বইটি একাধারে যেমন মেসবাড়ির স্মৃতি-আলেখ্য, তেমনই তৎকালীন বাংলা সাহিত্যজগতের মরমী ছবি– এক দরদী ও কবিতা-অন্তঃপ্রাণ কবির কলমে। বস্তুত, এই মেসবাড়ি ছিল কবির কবিতাচর্চার আঁতুরঘর। তাঁর বিভিন্ন রচনায় রয়েছে তৎকালীন খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকদের স্মৃতি, বিদ্রোহী তরুণ কবিদের তর্ক-বিতর্কর খবর, অন্ধার প্রেসরুমে সযত্নে লালিত দুর্বার স্বপ্নের প্রসবগাথা, সাহিত্য পরিসরের পরিধি বরাবর কিংবা বৃত্তের মধ্যে থাকা না-লেখক মানুষের চমৎকার চরিত্র-চিত্রণ– এমন নানা মণিমঞ্জুষায় ভরা বইটি। এক ভবিষ্যৎ কবির সলতে পাকানোর সাক্ষী এই বই।
আগাগোড়া নির্মেদ গদ্যে লেখা। প্রত্যেকটি রচনাই অত্যন্ত স্বাদু। তবে, তার মধ্যে আলাদা করে বলতেই হয় ‘ইয়ামাশিরো’, ‘এইট-বি’, ‘বকুলবাগান’, ‘গোলদিঘি’, ‘প্রস্থানপর্ব’, ‘গোধূলিসন্ধির নৃত্য’র কথা। কাব্যময় সুরেলা গদ্য আর শুখেন্দু সরকারের পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর প্রচ্ছদ সহ অলংকরণস্নিগ্ধ বইটি পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য দে’জ পাবলিশিংয়ের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More