শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

ওঁরা সকলে প্রান্তিক বোন, ফোঁটা-উৎসবেই নারীত্বের উদযাপন

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

সার দিয়ে বসে আছেন ওঁরা। সামনে জ্বলছে প্রদীপ, থালায় রাখা ধান-দুব্বো। পাশেই সাজানো মিষ্টি। ওঁদের কপালে ফোঁটা দিচ্ছেন এক দল বোন। বিড়বিড় করছেন কী যেন এক মন্ত্রও। পুরোটাই যেন ভাইফোঁটার পরিচিত ছবি। কিন্তু এই ছবির সবটা পরিচিত নয়। কারণ এই উৎসবে ভাই নেই। সকলেই বোন। তাও আবার সমাজের দুই বিচ্ছিন্ন প্রান্তে তাঁদের অবস্থান।

এ উৎসবের নাম: বোনফোঁটা।
স্থান: সোনাগাছি।
কাল: বৃহস্পতিবার সকাল।
পাত্রী: যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডার মহিলারা।

ভাইফোঁটার আগে এভাবেই উদযাপিত হল বোনফোঁটা। হাসি-আনন্দ-ঠাট্টায় পরস্পরের শুভায়ু রক্ষার দায়িত্ব ভাগ করে নিলেন একদল প্রান্তিক বোন, এ শহরেরই বুকে। আর জানিয়ে দিলেন, সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের শর্তে বাঁচতে শিখছেন তাঁরা। জানিয়ে দিলেন, সমাজ তাঁদের যতই প্রান্তিক করুক, সামাজিক রীতির হাত ধরেই মূল স্রোতে ফেরার লড়াই জারি রাখবেন তাঁরা। 

এই আবহেই বৃহস্পতিবার সোনাগাছিতে মানবী ফাউন্ডেশন ও দুর্বার মহিলা সমন্বয় সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আযোজিত হল বোনফোঁটা উৎসব। ট্রান্সজেন্ডার মহিলারা এবং মহিলা যৌনকর্মীরা পরস্পরের কপালে এঁকে দিলেন শুভচিহ্ন। অঙ্গীকার করলেন, নারীত্বের এই উদযাপন জারি থাকবে জীবন ভর। সেই নারীত্ব, যে নারীত্ব এখনও সমাজের চোখে সম্মানিত তো নয়-ই, সহজও নয় অনেক ক্ষেত্রেই।

ট্রান্সজেন্ডার বোনেরা।

মানবী ফাউন্ডেশনের কর্ণধার মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, “আমি নিজে আজ রূপান্তরিত। পরিপূর্ণ নারী। কিন্তু রূপান্তরকামী থেকে রূপান্তরিত হওয়ার এই যাত্রাপথটা তো মোটেই সহজ ছিল না। এবং আজ যে আমি নারী হয়েছি, এই নারীত্ব আমায় খুব কষ্ট করে ছুঁতে হয়েছে। লড়াই করতে হয়েছে। এটা আমার অর্জন, আমার প্রাপ্তি।”

মানবী জানান, তিনি এবং তাঁর মতোই এই অর্জিত বা অর্জন করতে চাওয়া নারীত্বের সঙ্গেই অন্য এক প্রান্তিক নারীত্বকে বাঁধতে চেয়েছেন তিনি। তাঁরা যৌনকর্মী। সমাজের চোখে ‘নিষিদ্ধ’ পেশার সঙ্গে যুক্ত। ‘টাকার জন্য শরীর বিক্রি করা’র তকমা সাঁটা তাঁদের গায়ে। যদিও সে শরীর কিনছে কারা, সে প্রশ্ন আজও ওঠে না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। মানবীর কথায়, “ওঁরা নারী। কিন্তু ওঁদের নারীত্ব আজও সম্মান পায় না সমাজের চোখে। সুসভ্য সমাজ নিষিদ্ধ গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে ওঁদের গায়ে। যে গন্ধের আকর্ষণে সুখের আস্বাদন করা যায় গোপনে, কিন্তু যে নারীত্বকে প্রকাশ্যে স্বীকারই করা যায় না এখনও।”

এই দুই প্রান্তিক নারীত্ব পরস্পরের হাত ধরে জীবন উদযাপন করল আজ। দুর্বার সংগঠনের সম্পাদক কাজল বসু বলছিলেন, “মানবীর এই উদ্যোগ অত্যন্ত অভিনব এবং প্রশংসনীয়। এ ভাবে যদি সমাজের সমস্ত প্রান্তেরা হাত ধরতে পারে, তা হলে বৈষম্য ভাঙবেই। সাম্য আসবেই। তারই সূচনা এই ধরনের অনুষ্ঠান। এখন তো আইন আরও বেশি উন্মুক্ত হয়েছে। তবে আইন তো আর মনের তালা খুলতে পারে না! তাই উদাহরণ তৈরি করতে হবে বারবার।”

সমাজতত্ত্ববিদদের একাংশের ব্যাখ্যা, আনন্দ-উপহার-উল্লাসের আবহে ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান বছরের বছর পালিত হয়ে এলেও, এটি ভীষণ ভাবে একটি পুরুষতান্ত্রিক রীতি। কারণ বোনকে রক্ষা করার শর্তে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনার এই অনুষ্ঠান এক দিকে যেমন মনে করিয়ে দেয় বোনেদের সুরক্ষার জন্য তাদের নিজের চেষ্টা নয়, ভাইয়ের ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তেমনই এটাও বুঝিয়ে দেয়, দীর্ঘ আয়ু কেবল ভাইদের জন্যই আকাঙ্ক্ষা করা যায়। বোনেদের আয়ু নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই এই রীতির। যেমন মাথাব্যথা নেই বোনের রক্ষা কেন ভাইকেই করতে হবে সেই প্রশ্ন নিয়ে।

“সমাজের এই পিতৃতান্ত্রিক রীতির মুখে এটাই আমাদের জবাব। বিদ্রোহে বা প্রতিবাদে নয়, উদযাপনে। নারীত্ব তথা আরও বড় মানবিকতার উদযাপনে। আমাদের প্রান্তিকতা ঘোচানোর উদযাপন। সাম্যের উদযাপন”– বলছিলেন মানবী ফাউন্ডেশনের এক সদস্য। সেই সূত্র ধরেই মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, “আমরা যারা ‘অপাংক্তেয়’, তারা জোট বেঁধে এই মানবিকতারই বার্তা দিতে চাই। যে মানবিকতা লিঙ্গ-পেশা নির্বিশেষে মানুষকে সম্মান করতে শিখবে।”

এই বোনফোঁটা অনুষ্ঠানের উদ্দেশে একটি মন্ত্র তথা ছড়াও লিখেছেন মানবী নিজেই।

সুন্দর বন সুন্দর বন সোনাগাছির বোন,
বুকের মাঝে বেজে ওঠে ‘বাবু’র টেলিফোন।
‘ভাই’-এর ফোঁটা, 
‘বোন’-এর খোঁটা উল্টো ইতিহাস,
সোনাগাছির
বোনেরা আজ পরান খুলে হাস।
আয়ু চাই না, বায়ু চাই না, খদ্দের চাই বোন!
সারা জীবন ধরা থাক তোর অনন্ত যৌবন।

মানবীর ব্যাখ্যা, “শেষ লাইন দু’টো নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে জানি। কিন্তু যে প্রান্তিক অবস্থানে থেকে আমাদের যৌনকর্মী বোনেরা লড়াই করছেন, সেই অবস্থানে যৌবনটাই ওঁদের আয়ু। ওঁদের পেশার স্বার্থে জরুরি এই যৌবন, জরুরি ‘খদ্দের’ও। যৌবন ফুরোলেই বেঁচে থাকা আরও কঠিন! তাই সেই পেশাকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান করাটাও সাম্যের প্রথম ধাপ।”

এই সাম্য থেকেই বঞ্চিত ট্রান্সজেন্ডার মানুষগুলিও। শুধু বঞ্চনা নয়, যন্ত্রণাও। এই যন্ত্রণারাই একসঙ্গে হাত ধরছে ‘বোনফোঁটা’র অনুষ্ঠানে। এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক রূপান্তরকামীর কথায়, “আমাদের অর্জিত নারীত্ব যেন স্বীকৃতি খুঁজল, সামাজিক ভাবে ‘অস্বীকৃত’ নারীদের কল্যাণ কামনা করে।” আর এক যৌনকর্মী বলছেন, “সম্মানের আশা করি না আর। তবে আনন্দের লোভ এখনও মরেনি। খুব ভাল লাগে, বিশেষ দিনগুলো এরকম করে সেলিব্রেট করতে পারলে। সাধারণ দাদা-ভাইয়েরা তো বোন হিসেবে আমাদের মেনে নেয় না, তাই যাঁরা ভাবছেন আমাদের কথা, তাঁরাই আমাদের কাছের জন।”

মূলস্রোতের অবহেলা যেন অনেকটাই অগ্রাহ্য করা যায়, দুই শ্রেণির প্রান্তিকের এই আনন্দ-উদযাপনে।

Shares

Comments are closed.