বুধবার, নভেম্বর ১৩

অকথা-কুকথা – ১

শমীক ঘোষ

পড়লেন। রেগে গেলেন। কুকথা বলে দিলেন।

নাঃ! হচ্ছে না। লজিকে গোলমাল। যে কবির নামই জানেন না উনি, তাঁর কবিতা পড়বেন কী করে? মানে একটা কবিতা পড়লেই তো জেনে যেতেন উনি কবি। কিন্তু সেকথা তো বলেননি।

অবশ্য অন্য কিছুও হতে পারে। উনি শঙ্খ ঘোষের কাব্যকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলছেন কবিতা হয়নি। কিন্তু সে কথা বলার অধিকার তো ওঁর আছে।

যে কেউ বলে দিতে পারেই ওটা কবিতা হয়নি। তাতে সবার এত রেগে যাওয়া কী?

এই যাঁরা টেলিভিশনে বাইট দিচ্ছেন, ফেসবুক দাগিয়ে দিচ্ছেন, এদের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে দেখলে হয়। বলুন তো কবিতা কাকে বলে? আর কবিই বা কী জিনিস? নিউটনের সূত্রের মতো করে বলুন। ভারতের সংবিধানের মতো করে বিধান দিন। কবিতা কাকে বলে।

কেউ পারবেন না। তাহলে যে জিনিসটা কী আসলে সেটাই কেউ প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিতে পারে না সেই জিনিস নিয়ে অনুব্রত যা ইচ্ছে তাই বলতেই পারেন।

তাছাড়া অনুব্রত রাজনীতিবিদ। সবাই জানে রাজনীতিবিদরাই আমাদের সবার প্রভু। ফলে রাজনীতিবিদরা যা খুশি বলতেই পারেন। যা বলবেন সেটাই ঠিক। সত্যি সংবিধানই তো বলে আইনপ্রণেতা হবেন রাজনীতিবিদরাই।

আর দেশের আইনই তো ঠিক করে কে ঠিক কে ভুল।

এই যে মোদি বললেন, ভগত সিং এর সঙ্গে দেখা করতে নাকি যাননি নেহরু। বিপ্লব দেব বললেন রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইজ ফিরিয়ে দিয়েছেন। বলতেই পারেন। কেন না ওঁরা রাজনীতি করেন। যা বলবেন সেটাই আদেশ। সেটাই ঠিক।

তাছাড়া দেখুন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক সবসময়েই ছিল।

মুখ্যমন্ত্রী কবিতা লেখেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও কবি। অটল বিহারী বাজপেয়ীও কবি।

মাও কবিতা লিখতেন। হিটলার, মুসোলিনি, কিম টু সাং, কিম টু জাং, চাওসেস্কু, সালাজার, অগাস্তো পিনোচে, আয়াতোল্লা খোমেনি, পল পট, এনভার হোজা, ফ্র্যাংকো…

এমনকি ওসামা বিন লাদেনও কবিতা পড়তেন।

লিস্টে বেশির ভাগ লোকেরই স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা ছিল। না না কারো নাম নিইনি কিন্তু নির্দিষ্ট করে। ফলে রেগে যাবেন না।

আমার অবশ্য একটা ধারণা আছে । কবি আর কবিতা সম্পাদকরাও আসলে স্বৈরাচারী। একে বলবে কবি, ওকে বলবে কবি নয়। এটাকে বলবে কবিতা হল। ওটাকে বলবে কবিতা নয়। কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা নেই।

এই যে দেখুন শ্রীজাত ফেসবুকে কবিতা লেখেন। উনি কবি। সবাই জানে।

আমাদের বুবাইদাও কবিতা লেখে ফেসবুকে। অন্তেমিল থাকে বেশ। পড়তেও বেশ। ভারি ভারি লাগে। মানে বোঝা যায় না। সব থেকে বড় কথা হল বুবাইদাও ফেসবুকে লাইক পায়। শ্রীজাতর থেকে একটু কম হলেও পায়।

বুবাইদাকে অমন রোজ মিডিয়া কোট করলে, আর টেলিভিশনে দেখালে ওর লাইকও যে বেশি হত না এমন কে বলতে পারে? তাহলে বুবাইদা কবি নন কেন?

এই যে আপনারা সম্পাদকরা বুবাইদার কবিতা ছাপেন না। বলেন কবিতা হয়নি ব্যাখ্যা দেন নাকি?

অনুব্রত মণ্ডল জনতার প্রতিনিধি। জনতার কথা ওঁকেই ভাবতে হবে। তাছাড়া নিজের অক্সিজেনে কম পড়লে অসুবিধা নেই। কিন্তু দলের অক্সিজেন কম পড়লে ওঁকেই ছুটে যেতে হবে।

তাই উনি সুকৌশলে আসল প্রশ্নটাই বলে ফেললেন। কে কবি আর কে কবি নয় তাঁর ব্যাখ্যা করবে কে? অত্যন্ত দার্শনিক, নিগূঢ় প্রশ্ন।

সবাই কি রবীন্দ্রনাথ? যে ফি ২৫ বৈশাখ দলে দলে লোক রবীন্দ্রনাথের স্ট্যাচুর সঙ্গে নিজের সেলফি তুলতে রবীন্দ্রসদন আর জোড়াসাঁকোয় ছুটে যাবে?

হু হু বাওয়া অনুব্রত ঠিক জায়গায় ঢিল মেরেছেন। তাই আপনাদের এত রাগ।

ছবি : শ্রাবণী খাঁ

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

(শমীক ঘোষ দ্য ওয়ালের কর্মী। এছাড়াও গদ্য লেখেন। নিজেকে বোদ্ধা ও আঁতেল মনে করেন। সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার ও ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর মাথা একদম ঘুরে গিয়েছে)  

Leave A Reply