সোমবার, নভেম্বর ১৮

গোমড়াথেরিয়াম – ১

খাদ্যাখাদ্য

সন্দীপ বিশ্বাস

রবিবারের দুপুর । পাঁঠার পাতলা ঝোল আর ভাত খেয়ে উঠেছি সবে । গিন্নির রান্নার হাতটা বরাবরই বড় ভালো, কিন্তু আজ যেন একটু বেশীই ভালো লাগলো আমাদের । আসলে আমার কোলেস্টেরল ধরা পড়ার পর থেকে জীবন থেকে পাঁঠাটা মুছে গেছে প্রায় । অথচ ওটাই বোধহয় আমার মেয়ে আর আমার সবচেয়ে প্রিয় । হোলির শুভদিন উপলক্ষ্যে অনেকটা জোর করেই আজ রান্না হয়েছে বেশ অনেকদিন পর । মেয়ের পছন্দ কষা … ওর ভাষায় “কালো মাংস” । আমার আবার পাতলা ঝোলটাই বেশী ভালো লাগে । সব মিলিয়ে মনে বেশ একটা ফুরফুরে ভাব । পরশুরাম আবার পড়ছি কয়েকদিন যাবৎ – সোফায় লম্বা হয়ে “লম্বকর্ণ” খুলে হাসছি নিজের মনেই । ওরাও অন্যান্য ঘরে ঘুমোচ্ছে বোধহয় ।

হঠাৎ দরজায় একটা ঠক-ঠক শব্দ । কে আবার এখন এলো জ্বালাতে ! পড়ে থাকি চুপচাপ । কিন্তু আবার ঠক-ঠক । উঠি বাধ্য হয়ে । দরজার আইহোলে চোখ রেখে দেখি বাইরেটা । কোত্থাও কেউ নেই । ফিরে এসে শুতে যাব, আবার সেই আওয়াজ । ভারী বিরক্ত লাগে । লাফ মেরে যাই – একটু জোরেই খুলি দরজাটা । দেখি … পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট ছাগলছানা ! তার গায়ের রং একদম হলুদ, মানে যাকে বোধহয় বলে “লেমন ইয়েলো” । কিছুদিন আগে পর্যন্ত টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন দেখাতো – কিসের মনে নেই – শাহরুখ একটা ছাগলের সঙ্গে নাচানাচি করছে – ঠিক যেন সেইরকম । দরজায় টোকা সেই মারছিল । খোলা দরজা দিয়ে গটগট ক’রে ঘরে ঢুকে পড়ে সে, আর পরিষ্কার শুনি যেন ব’লে ওঠে – “মা” । তারপর বিশুদ্ধ বাংলায় বলে – “আমার মা তোমার পেটে, তাই এখন থেকে তুমিই আমার মা, তোমার কাছেই থাকবো” । বিস্ময়ে চোখ গোল গোল হয়ে যায় আমার … এ আবার কি ? তখন কি আর বুঝেছি যে এই সবে শুরু !

ছানাটি চোখের ইঙ্গিত করে – দেখি তার গলায় একটা প্ল্যাকার্ড ঝোলানো, তাতে বাংলা হরফে কি সব লেখা আছে । নীচু হয়ে পড়ে দেখি – আজকের তারিখ, আমাদের বাড়ির ঠিকানা, আর সব শেষে বড় হরফে লেখা … “পাতলা ঝোল” । হাঁ ক’রে চেয়ে আছি, ছানা ব’লে ওঠে – অনেকটা আশ্বাসের ভঙ্গিতে – “বাকিরাও আসছে” । সে আবার কি ? দরজা দিয়ে তাকিয়ে দেখি – বাইরে বেশ লম্বা একটা লাইন পড়ে গেছে – নানান রঙের ছাগশিশু দাঁড়িয়ে সেখানে । বারোতলায় আমাদের ফ্ল্যাট, দুটো লিফটেরই দরজা খোলা, তার থেকে পিলপিল ক’রে বেরোচ্ছে আরো অনেকে । শোভাযাত্রা ক’রে একে একে ঘরে ঢুকে পড়ে সবাই । দ্বিতীয় ছাগলটার প্ল্যাকার্ডে দেখি লেখা আছে আমার জন্মদিনের তারিখ – এই বছরের – আর বড় হরফে “পাতলা ঝোল ” । মনে পড়ে যায় যে এর আগে ঐদিনই শেষ পাঁঠা খেয়েছি, এবং সেদিন অন্যান্য নানারকম ভালো ভালো পদের সাথে আমার প্রিয় এই পদটাও ছিল বটে । ছাগলছানাগুলো সবাই হলুদ নয়, টকটকে লালও বেশ অনেকগুলো আছে । আর শুধু কি ছাগল ? সবুজ রঙের কয়েকটা ভেড়াও দেখি আছে তাদের মধ্যে । প্রবাসে থাকি, সুপারমার্কেট থেকে পাঁঠা কিনি আমরা – রান্না করার সময় গিন্নি মাঝে-মাঝে বকবক করে বটে যে পাঁঠা নয়, ভেড়ার মাংস দিয়েছে । এখন বুঝি যে কথাটা ঠিকই বলতো সে । কতরকমের লেখা যে দেখি … যেমন, “গোলবাড়ি – কষা”, বা “লাজিজ – চাঁপ”, কিম্বা “প্যারাডাইস – বিরিয়ানী” । প্রথমে খেয়াল করি নি – লাইনের শেষের দিকে দেখি কয়েকটা গোবৎস এবং শূকরছানাও রয়েছে । শুয়োরগুলো নীল, আর বাছুরদের রং … ভগবানের দিব্যি … গেরুয়া বলেই মনে হয় আমার । খেয়াল হয় যে জীবনের প্রথম দিকে নিষিদ্ধ মাংস ভক্ষণ করতাম আমি – নেহাতই কৌতূহলবশে । যেমন, বাছুরদের মধ্যে যে সবার শেষে তার গলায় দেখি লেখা আছে – “নিজাম, কলকাতা – রোল” । মনে পড়ে যে সেই আমার প্রথম গরু খাওয়া, কলেজে পড়ার সময় … বিফ রোল । একটা লেখা দেখে কিন্তু রেগে যাই একটু, মনে হয় এ ঘোর অন্যায় ! হংকং-এ থাকার সময় ভাষার গন্ডগোলে অক্স-টাং সুপ্ খেয়ে ফেলেছিলাম একবার, কিন্তু সে তো নিতান্তই ভুল ক’রে ! সত্যি বলতে কি, এই বাছুরটার চোখগুলো যেন একটু ছোটমতো মনে হয় আমার ! গলার ট্যাগ পড়ে পড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি এক সময় । ততক্ষণে আনুমানিক শতাধিক ছাগলছানা ও দশটি ভেড়ার ছানা, চারটি বাছুর, এবং ঠিক সাতটি বাচ্চা শুয়োর ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতর । দরজাটাও কে যেন বন্ধ করে দেয় ভিতর থেকে ।

প্রত্যেকে এক এক করে নিজেদের কথা ব্যক্ত করে – সাদা বাংলায় । বক্তব্য সেই একই, তাদের কেউ না কেউ নাকি আমার পেটে গিয়েছে কোনো না কোনো সময় – তারা অনাথ, তাই আমার সাথেই এখন থেকে থাকবে । তাদের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব এখন থেকে নাকি আমার । যে যার কাছে বড় হচ্ছিল সেই সম্বোধনেই ডাকে আমায় – “মা” ডাকই বেশী শুনি, কিছু “বাবা”-ও আছে । একটি ভেড়ার বাচ্চা আবার “রামকাকা” বলে সম্বোধন করে – উচ্চারণের দোষেই বোধহয়, শোনায় ঠিক যেন “র‍্যাম-কাকা” । আন্দাজ করি যে এই শাবকটি আর কেউ না থাকায় তার শ্রদ্ধেয় রামকাকার কাছেই ভেড়া হয়ে উঠছিল, তিনি পেটস্থ হওয়ায় এখন আমার দায়িত্ব শূন্যস্থান পূর্ণ করার ! দুই হাতে মাথা চেপে ধরে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি সবার দিকে ।

হঠাৎ একটা চিন্তা মনে আসে … জিজ্ঞেস করি – “তোমাদের পরম প্রিয় মা-বাবা-কাকারা তো একা আমার পেটেই যায় নি, আরো অনেকেই এজন্যে দায়ী । তাহলে আমাকেই ধরেছো কেন তোমরা” ? প্রথম আসা ছাগশিশুটি, সেই বোধহয় নেতা এদের – আমাকে বোঝায় কারণটা … “কম্পিটিটিভ পরীক্ষা তো জীবনে বেশ কিছু দিয়েছো জানি (কোনো কিছুতেই বিস্ময় জাগে না আর) । পার্সেন্টাইল ব্যাপারটা বোঝো নিশ্চয়ই ? প্রত্যেকের অনাথ হওয়ার পেছনে যাদের হাত আছে তাদের আলাদা আলাদা লিস্ট বানিয়েছি আমরা । তারপর সেই লিস্টগুলোর সকলের বয়সের আন্দাজে বুদ্ধির একটা পরিমাপ করা হয়েছে । যাদের বুদ্ধি অনাথ শিশুটির সবচেয়ে কাছাকাছি তারা ওপরে, এইভাবে ফাইনাল তালিকা পাওয়া গেছে । যার তালিকায় যে একশো পার্সেন্টাইল, তার কাছেই যাচ্ছে সে” । চমৎকৃত হয়ে যাই । একটা বাচ্চা ছাগল রীতিমতো অঙ্ক শেখাচ্ছে ! এতগুলো লোকের তুলনায় আমার বুদ্ধি যে সবচেয়ে বেশী ছাগুলে (বা গো-সুলভ, বা ভেড়াটে, অথবা শূকরবৎ) জেনে ভালো লাগে না মোটেই । সেইসঙ্গে একটা হিসাব মাথায় খেলে যায় … এপর্যন্ত জীবনে নিশ্চয়ই সহস্রাধিকবার পাঁঠা খেয়েছি, কিন্তু এখানে এসেছে মাত্র শ’খানেক – তার মানে বাকি সব ক্ষেত্রে কম বুদ্ধির দৌড়ে একশো পেতে হয় নি আমায় ! আনন্দ পাই একটু । আবার প্রশ্ন করি – “কিন্তু কখনোই বুদ্ধির পরিমাপ একাধিক লোকের কি সমান সমান হয় নি ? মানে ‘টাই’ কি হয় নি কখনোই” ? “হয়েছে তো । সেক্ষেত্রে নিয়মটা সোজা । টাই হওয়া লোকেদের মধ্যে যার চেহারা অনাথের সাথে সবচেয়ে বেশী মেলে তাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে” । এই ব’লে সেই নেতা শিশুটি সবার সাথে আলোচনা করে । হিসেব-টিসেব ক’রে জানায় যে বারোটা ছাগলের কেসে তুমি টাই-ব্রেকারে জিতেছো । সাথে আশ্বাস দেয় … “সব ডেটা আছে আমাদের কাছে । তুমি চাইলেই তোমাকে দেখাতে বাধ্য আমরা – সে অধিকার তোমার আছে” । স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকি । আমার মুখশ্রী যে ছাগলের সাথে এত মেলে তা আমার গিন্নিও কখনো বলে নি । দাম্পত্য কলহের চরম মুহূর্তেও না ! কিছুটা মিল নিজেই লক্ষ্য করেছি অনেক সময়, কিন্তু তাই বলে এতখানি ?

সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে তারা । সোফা বিছানা এ-ঘর ও-ঘর বাদ যায় না কিছুই । নানান রঙের মেলা বসে যায়, যেন বাড়ির ভেতরেই হোলিখেলা চলছে । যত্রতত্র নেদে বেড়ায় মাঝে মাঝেই । দুর্গন্ধে ভরে ওঠে চতুর্দিক । গোবৎসরা সোজা হাজির হয় ব্যালকনিগুলোয় – গিন্নির বহু যত্নে লালিত-পালিত বিভিন্নরকমের গাছ দেখতে না দেখতে পেটে যায় তাদের । বাকিরা সারা জায়গা ঘুরে বেড়ায় খাবারের সন্ধানে । রান্নাঘরের কাউন্টারের ওপর যা কিছু ছিলো সাফ হয়ে যায় মুহূর্তেই । ফ্রীজটাও খুলে ফেলে কারা যেন … লন্ডভন্ড হয়ে যায় সব কিছু । একদিকে বেশ কিছু দুধের প্যাকেট রাখা ছিলো, ফাটিয়ে চোঁ চোঁ করে মেরে দেয় কেউ কেউ । মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখি গোটাকয় লাল-হলুদ ছাগল ভাগাভাগি করে জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির বইটা খুব মন দিয়ে খাচ্ছে । বেশ দামী বই – এই সেদিনই আনানো হলো … হায় হায় ! অন্য ঘরে রবীন্দ্র রচনাবলীরও একই দশা । প্রথম খন্ড থেকে শুরু করে পনেরোর মধ্যে সাড়ে তেরোয় পৌঁছে গেছে আরো কিছু ছাগল । বাড়িভর্তি প্রচুর বই আমাদের – কিছুই প্রায় বাকি নেই আর ! এর মধ্যে সেই চৈনিক বাছুরটা দেখি ড্রেসারের বড় আয়নাতে বিভিন্ন দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে নিজের মুখ দেখছে । বোধহয় কেউ তাকে বলেছে … দেখার চেষ্টা করছে সত্যিই তার চোখ ছোট কি না ! চিৎকার করে থামতে বলি সকলকে, কিন্তু পাত্তাই দেয় না কেউ । রেগে চেঁচিয়ে গলা ফাটাই, লাফাই ঝাঁপাই – কোনো লাভই হয় না ।

হতাশ হয়ে বসে পড়ি সোফায় – এক শুয়োরের বাচ্চাকে ঠেলে সরিয়ে । মাথা ঘামাতে থাকি । আজ কি শুধু চারপেয়েরাই এসেছে, না কি মুরগী মাছ এরাও এসে পড়বে যে কোনো সময় ? তাহলে তো আরেক কেত্তন ! ওদিকে বাড়িতে খাওয়ার মতো আর কিছু না পেয়ে একে একে আমার কাছে এসে হাজির হয় সবাই … মা বাবা রামকাকা ইত্যাদি বলতে বলতে । সোফায় উঠে সোজা আমার কোলে উঠে পড়ে কয়েকজন । সকলেরই একটাই কথা – “খিদে পেয়েছে, খেতে দাও” । দু-একটা নিতান্ত অবোধ ছাগশিশু রীতিমতো ঢিসাতে থাকে আমায় … দুধের সন্ধানে ! আমার সারা গা চাটতে থাকে কেউ কেউ । কি যে করবো ভেবে পাই না কিছুতেই । হঠাৎ মনে হয় – স্বপ্ন দেখছি না তো ? নানারকম উদ্ভট স্বপ্ন দেখার বাতিক আছে আমার, হয়তো সেরকমই কিছু ঘটছে এখন ! নিজের গালে ঠাটিয়ে একটা চড় মেরে পরীক্ষা করতে যাই, কিন্তু হাতগুলো জোগাড় করতে পারি না কিছুতেই … কেউ না কেউ বসে আছে সেগুলোর ওপর ।

ডাইনিং টেবিলটা চোখে পড়ে হঠাৎ । তার ওপর আজকের রান্নার অবশিষ্টাংশ – একটা কাঁচের বাটিতে ঢাকা দেওয়া । এতক্ষণ ওটার ওপর কারোর চোখ পড়ে নি, বোধহয় একটু উঁচুতে বলেই – কিন্তু এখন দেখি বেশ কয়েকটা ছাগল টেবিলে উঠে ঢাকা সরিয়ে গম্ভীরভাবে নিরীক্ষণ করছে । তারপর কী রাগ তাদের ! সকলে মিলে গুঁতো মেরে বাটিটা ফ্যালে টেবিল থেকে – ঝনঝন কাঁচ ভাঙ্গার শব্দে চমকে উঠি আমি । আর দেখি পাশের ঘর থেকে গিন্নি ছুটে এসে বেদম বকছে আমায় – “এত কষ্ট করে খেটেখুটে রান্না করা, সব পড়ে গেলো ! একটু তো ঠিকমতো রাখবে বাটিটা ! তোমাকে নিয়ে আর পারি না” ! মেয়েও দেখি মাকে সমর্থন জানাচ্ছে নীরবে । আর ছাগল-টাগল গরু-টরু কোত্থাও কিচ্ছু নেই !

স্রেফ ঘাস-পাতা খেয়েই বাকি জীবনটা কাটাবো ঠিক করেছি । অনেক হয়েছে !

(ব্যাঙ্গালোর নিবাসী, পেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।)

Leave A Reply