ব্লগ: গোমড়াথেরিয়াম – গন্ধবিচার

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সন্দীপ বিশ্বাস

    দিনকয়েক আগে টাইমস অব ইন্ডিয়ায় একটা ছোট্ট খবর হঠাৎ চোখে পড়েছিল। অ্যামস্টারডাম থেকে একটি প্লেন ওড়ে – গন্তব্য স্পেনের এক দ্বীপ। যাত্রীরা সব ছুটির মেজাজে। একটু পর থেকে একটা ভয়াবহ দুর্গন্ধ সবার নাকে আসতে শুরু করে। উৎস সন্ধান ক’রে দেখা যায় যে তা আসছে এক সহযাত্রীর গা থেকে! বহুদিন চান না করলে গায়ে যেরকম গন্ধ হয় সেইরকম। এবং তার তেজ এতটাই যে অনেকেই নাকি বমি করে ফেলে, এমনকি অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যায় কেউ কেউ! প্লেনের কর্মীরা লোকটিকে বাথরুমে বন্ধ ক’রে রাখতে সচেষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত যাত্রাপথ বদল ক’রে পর্তুগালের কোনো এক জায়গায় অবতরণ করে তারা … গন্ধগোকুল লোকটিকে সেখানে নামিয়ে তারপর সঠিক গন্তব্যের দিকে রওনা দেয় সবাই। খবরটা পড়ে মজা পেলাম বেশ। সেইসাথে চিন্তা হলো – একটা লোকের গায়ে কতখানি গন্ধ হলে এরকম হতে পারে? বমি অবধি বুঝলাম, অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটা একটু বাড়াবাড়ি বলেই মনে হলো আমার! সাহেবী আদিখ্যেতা হবে হয়তো! তবে এরকম দুর্ধর্ষ দুর্গন্ধ একজন মানুষ জোগাড় করলো কি ভাবে সেটাও চিন্তার বিষয়! এতখানি প্রতিভাবান তো নজরে আসে না চট করে!

    আমরা তখন বিএসসি পড়ি । যাদবপুরের এক প্রফেসরের কাছে ফিজিক্স বুঝতে যেতাম সপ্তাহে এক-দুদিন, কয়েকজন বন্ধু মিলে। ভদ্রলোক ছিলেন অগাধ পন্ডিত… কোনোদিন কোনো প্রবলেমে আটকাতে দেখিনি তাঁকে, তা সে যত দুরূহই হোক। আর বোঝাতেনও খুব ভালো।  শুধু একটাই অসুবিধা ছিল – তিনি পড়াতে বসতেন খালি গায়ে, এবং তাঁর গায়ে ছিল উৎকট গন্ধ। প্রথম কয়েকবার ঠকার পর আমরা চালাক হয়ে গিয়েছিলাম। পড়তে বসার আগে হাওয়ার গতিপথ দেখে নিয়ে সেইমতো বসতাম, যাতে ওঁর দিক থেকে আমাদের দিকে হাওয়া না আসে। তাঁর বাড়ির দোতলা-তিনতলা তখন নির্মীয়মান, শুধুমাত্র খাঁচাটা উঠেছে… বেশির ভাগ সময় সেটাই ছিল পড়ার জায়গা। পাখা নেই, তাই মোটামুটি সরলরেখা বরাবর হাওয়া চলাচল করতো, আর সেটাই ছিল বাঁচোয়া! ভদ্রলোক গত হয়েছেন অনেকদিন… তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। ওপরের খবরটা পড়ে কেন জানি না প্রথমেই ওনার কথা মনে পড়ে গেলো !

    বাস-ট্রাম-ট্রেন বা নন-এসি মেট্রো-র দমবন্ধকরা ভিড়ে যারা নিত্য যাতায়াত করেন তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন দুর্গন্ধ কাকে বলে। কলকাতার ছাত্রজীবন মনে আছে… প্রচন্ড ভিড় বাসে লটারির টিকিট জেতার মতো একটা সিট হঠাৎ পেয়ে গেছি ঊর্ধতন চোদ্দ পুরুষের পুণ্যের ফলে, মনে বেশ একটা ফুরফুরে ভাব– জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখছি, মনে হচ্ছে সবাই প্রজা আমার… হঠাৎ হাতের ওপর জলের ফোঁটা ! তাকিয়ে দেখি সামনে যে লোকটি ভিড়ের গুঁতোয় প্যারাবোলার আকার নিয়ে ওপরের রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার গা থেকে টপটপ ক’রে ঘাম ঝরে পড়ছে, এবং নিউটনদাদুর নিয়ম না মেনে উপায় নেই বলেই যেন… সেই কটু-গন্ধালো স্বেদবিন্দুগুলি ঝরে পড়ছে আমারই ওপর ! লোকটির দেহের খুব সামান্য অংশই বোধহয় বাসের সংস্পর্শে আছে – এরকম দুঃখী মানুষকে বকা দেব এতটা হৃদয়হীন আমি নই… তাই নিঃশব্দে ধারাস্নান সারতে সারতে এগিয়ে চলি গন্তব্যের দিকে  মাদ্রাজে থাকার সময়ও এইধরণের অভিজ্ঞতা কম হয়নি, বিশেষতঃ সেখানের গরম তো আরও সাংঘাতিক! আর, বললে কেউ বিশ্বাস করবে কি না জানি না… এইসব ক্ষেত্রে ওখানে একটা তীব্র টোকো গন্ধ যোগ হতো অন্য সবকিছুর সঙ্গে … অন্ততঃ আমি তো পেতাম । আমার দৃঢ় বিশ্বাস – মহাগুরু সুকুমারবাবু ওই বিশেষ শহরটির কথা ভেবেই তাঁর সেই বিখ্যাত পংক্তিগুলি লিখেছিলেন… “আকাশের গায়ে নাকি টক টক গন্ধ”! দক্ষিণ ভারতের আর একটা অসুবিধা হলো মহিলাদের মাথায় গোঁজা সাদা রঙের ফুলের মালা। সকালে যা সুগন্ধ, বেলা বাড়ার সাথে সাথে পচে উঠে তা পরিবর্তিত হয় বিকট গন্ধে … কাজেই সন্ধে নাগাদ ভিড়ের মধ্যে এরকম দু-এক পিস স্যাম্পল থাকলেই যথেষ্ট! যাকে বলে প্রাণঘাতী!

    এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেলো… জীবনের এতগুলো বছর দক্ষিণ ভারতে কাটালাম, কিন্তু এদের খানা আজ পর্যন্ত সুবিধা করতে পারলাম না। ব্যাঙ্গালোরের হস্টেলে এসে প্রথম পরিচয়। তার আগে কলকাতায় থাকতে ধোসা-টোসা দিব্যি খেতাম – মোটামুটি ভালোবেসেই – তবে পরে বুঝেছি যে সেগুলো ছিল বাঙালী ভার্সান, অথেন্টিক নয় মোটেই। সেই পরিচয় প্রণয়ে রূপান্তরিত হয়নি এত বছরেও। আর হবার আশাও রাখি না। বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য অনেক বেড়েছে… এখন যদি দায়ে পড়ে কোথাও ঐসব খেতে হয় তাহলে অনর্থক ঘ্যানঘ্যান না ক’রে প্রথমেই বেশ কয়েকটা লম্বা শ্বাস নিই, আর তারপর খুব দরদ দিয়ে “সুন্দর বটে তব” গানটির সুরে মনে মনে গেয়ে ফেলি …

    সম্বরো মেখে খাও ভাত কয়খানি, ডাঁটায় মূলায় খচিত।

    টোকো গন্ধে মাছি মরে নয়খানি, মশলা-তেঁতুলে রচিত !

    অম্বলটা পরে হয় ভবিতব্যের মতো, কিন্তু এর ফলে ভাত ক’খানি গলা দিয়ে নেমে যায় কোনোক্রমে।

    অন্য রকম গন্ধের কথাও শুনেছি এক বন্ধুর কাছে। তার বাবা বেশ কিছুদিন রোগভোগের পর দেহরক্ষা করেছেন। হয়তো বন্ধুটি তার বাড়ির লোকজনের সাথে বসে গল্প-সল্প করছে – মা, দিদিরা, জামাইবাবুরা ইত্যাদি… হঠাৎ একটা গন্ধ ! তার বাবা বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন, ওষুধ-বিষুধ এবং ক্যাথিটার ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে সেই ঘরে ঢুকলেই একটা অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া যেত তখন। ঠিক সেই গন্ধটা নাকে এসে লাগে … এবং একসঙ্গে সব্বার। বেশ খানিকক্ষণ ভেসে বেড়ায় সেটা, তারপর মিলিয়ে যায় আস্তে আস্তে ! বন্ধুটির মুখেই শোনা– তার বাবা চলে যাওয়ার পর একাধিকবার এই ঘটনা ঘটেছে, এবং অনেকেই সাক্ষী তার। কী ব্যাখ্যা জানা নেই আমার ।

    এক-একটা বিশেষ গন্ধ জীবনের এক-একটা অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার ধারণা সবাই একমত হবেন এব্যাপারে। খুব ছোটবেলায় মা’র গায়ের গন্ধ – পাউডার ক্রিম ইত্যাদি মেশানো একটা মৃদু সুগন্ধ – তা ছিল আদরের, আবদারের। বাবার গায়ের মাইসোর স্যান্ডেল সাবান ছাপিয়ে আসা হালকা ঘামের গন্ধ – ভরসা ও নির্ভরতার । রবিবারের দুপুরে স্নান ক’রে বেরিয়েই রান্নাঘর থেকে আসা পাঁঠার ঝোলের গন্ধ, অথবা খুব ক্ষিদের সময় গরম ভাতের গন্ধ… তুলনাহীন! প্রচন্ড দাবদাহের মধ্যে আকাশ কালো ক’রে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার ভেজা গন্ধ। হাল্কা অন্ধকারে ফুরফুরে হাওয়ায় প্রিয়জনের সাথে ছোট্ট ঝুলবারান্দায় বসে বেলফুলের গন্ধ। সব কিছুর মধ্যে আমার কাছে সেরা একটাই। আমার মেয়ে যখন খুব ছোট্টটি ছিল, বিছানায় শুয়ে হাত-পা ছুঁড়তো – যখন আমি তাকে আদর করার জন্য কোলে নিতাম, জাপটে ধরতাম বুকের মধ্যে… বেবি পাউডার আর বেবি ফুড, অল্প বমি, আর সর্বোপরি শিশুর গায়ের নিজস্ব যে সুবাস… সব কিছুর সংমিশ্রনে যে স্বর্গীয় গন্ধ পেতাম তা আজও গেঁথে আছে মনের মধ্যে !

    (ব্যাঙ্গালোর নিবাসী, পেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More