বুধবার, নভেম্বর ১৩

ছাতিমতলা – ১ জন্মদিনের কবি

আবীর মুখোপাধ্যায়

বাঙালির রোজনামচায় এখনও পঁচিশে কথাটা কানে ঠেকলেই, মন ভেসে চলে শান্তিনিকেতন।

‘বিচিত্র রুপের সমাবেশে’ গাঁথা রবীন্দ্রের জন্মদিনে। বৈশাখ এলে, অজয়ে হাঁটু জল থাকুক না থাকুক কবির জন্মদিন নিয়ে ফি বছর সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে পোস্ট-রি-পোস্ট, কমেন্ট-শেয়ার। কিন্তু এ বছর, কবিপক্ষজুড়ে দাপাচ্ছে অন্য এক পঁচিশের মিম! শান্তিনিকেতনের বৈশাখি হাওয়ায় ইনবক্সে ইনবক্সে ঘুরছে চলতি মাসেরই পঁচিশ তারিখ। বিশ্বভারতীর সমাবর্তন সংবাদ। মিম জানাচ্ছে— রবীন্দ্রনাথ নয়, সে দিনের ‘চাঁদের হাট’-এর অতিথি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেখ হাসিনা, অমিতাভ বচ্চন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!

রবিবার রাত্তিরে ট্যুরিস্ট লজ মোড়ে নাইন বাই নাইন রেস্তোরাঁয় দীয়া আর ওর ভাইয়ের সঙ্গে ডিনার সারতে সারতে ঠিক পাশের টেবিল থেকে এমনতরো মিম-প্রসঙ্গ কানে আসছিল। পুরাকালের পেশাগত স্বভাব যেমন, উৎকর্ণ হই। শুনি,

‘সো লাকি বস, পাঁচ বছর পর সমাবর্তন। এখানে পড়তে আসার সেরা উপহার।’

‘ছাতিমপাতাও হয়তো জুটবে না আমাদের সময়।’

‘এ বার তো মোদী, হাসিনা, বিগ বি…! জহরবেদীতে একেবারে চাঁদের হাট!’

‘বিগ বি আসছে, ফা…! কনফার্ম?’

‘কোন জগতে থাকিস রে, মিম দেখিসনি তুই!’

‘মিম!’

‘দাঁড়া এক্ষুনি পাঠাচ্ছি।’

যুগলের মিম চালাচালির ফাঁকে বলে রাখি, এ ছবিই এখন শান্তিনিকেতনের সবখানে।

গত শনিবারের এক সাংবাদিক বৈঠকে বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য সবুজকলি সেন সমাবর্তনের কথা ঘোষণা করার পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবমহলে ‘চাঁদে পাওয়া কোকিল’-এর মতো ডাকাডাকি, এমন খুশির হাওয়া। এবং ‘চাঁদের হাট’ নিয়ে জোর চর্চা রতনপল্লির রজনীঠেক থেকে ফলপট্টির সুবোধ-এ। কবির জন্মদিনের ঠিক প্রাক মুহূর্তে এমন হাওয়ার উজানে আমার কেবলই মনে পড়ে যাচ্ছে, নিজের জন্মদিন নিয়ে তাঁর প্রথম অনুভব। উৎসব-উপহার!

সে বার রবীন্দ্রনাথ ২৫ পূর্ণ করে ২৬-এ পা দিয়েছেন। তখনও ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রের জন্মদিন পালন করা হয় না। কবি নিজেও সে নিয়ে কোনও আগ্রহ দেখাননি। সে বার যে কী হল তাঁর!

শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লিখলেন, ‘আজ আমার জন্মদিন, পঁচিশে বৈশাখ, পঁচিশ বৎসর পূর্ব্বে এই পঁচিশ বৈশাখে আমি ধরণীকে বাধিত করতে অবতীর্ণ হয়েছিলুম, জীবনে এমন আরও অনেকগুলো পঁচিশে বৈশাখ আসে এই আশীর্ব্বাদ করুন। জীবন অতি সুখের।’

ঠিক পরের বছরই প্রথম পালিত হল তাঁর জন্মদিন।

কেমন ছিল কবির প্রথম জন্মদিনের অনুষ্ঠান?

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালিত হল— বিলেত ফেরত জ্ঞানদানন্দিনীর দেখানো পথে— কবির ন’দিদি স্বর্ণকুমারীদেবীর মেয়ে সরলার উদ্যোগে। সরলাদেবী লিখছেন, ‘রবিমামার প্রথম জন্মদিন উৎসব আমি করাই।… অতি নিঃশব্দে তাঁর ঘরে তাঁর বিছানার কাছে গিয়ে বাড়ির বকুল ফুলের নিজের হাতে গাঁথা মালা ও বাজার থেকে আনান বেলফুলের মালার সঙ্গে অন্যান্য ফুল ও একজোড়া ধূতি-চাদর তাঁর পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করে তাঁকে জাগিয়ে দিলুম। ‘রবির জন্মদিন’ বলে একটি সাড়া পড়ে গেল।’ সেই প্রথম কবির জন্মদিন পালন!

প্রথম বারের কথা কবি নিজেও লিখেছিলেন।

চিঠিতে বন্ধু শ্রীশবাবুকে লিখছেন, ‘দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে, কেবল বয়স বাড়ছে। দু বৎসর আগে পঁচিশ ছিলুম, এইবার সাতাশে পড়েছি— এই ঘটনাটাই কেবল মাঝে মাঝে মনে পড়ছে, আর কোনো ঘটনা তো দেখছি নে। কিন্তু সাতাশ হওয়াই কি কম কথা! কুড়ির কোঠার মধ্যাহ্ন পেরিয়ে ত্রিশের অভিমুখে অগ্রসর হওয়া। ত্রিশ, অর্থাৎ ঝুনো অবস্থা। অর্থাৎ যে অবস্থায় লোকে সহজেই রসের অপেক্ষা শস্যের প্রত্যাশা করে— কিন্তু শস্যের সম্ভাবনা কই? এখনো মাথা নাড়া দিলে মাথার মধ্যে রস থল থল করে— কই, তত্ত্বজ্ঞান কই?’

সে বার জন্মদিনে উপহার প্রাপ্তিও কম নয়।

সরলাদেবীর দাদা জ্যোৎস্নানাথ রবিমামাকে দিয়েছিলেন একটি কাব্যগ্রন্থ। The Poems of Heine. কবি নিজেই গ্রন্থটির পাতায় লিখি রাখেন, ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ ২৫ বৈশাখ/ জন্মদিনের/ উপহার/ ১৮৮৭/ জ্যোৎস্নার/ কাছ হইতে/ ৪৯ পার্ক স্ট্রীট।’

সেই প্রথম জন্মদিন থেকে তাঁর ৮১তম জন্মদিন— প্রতিবার বিচিত্র উপহার, অনুভব, ভালবাসা-বেদনায় গাঁথা রবীন্দ্রের জীবন। কখনও বলছেন, ‘কতো পঁচিশে বৈশাখ চলে গিয়েছে, তারা অন্য তারিখের চেয়ে নিজেকে কিছুমাত্র বড়ো করে আমার কাছে প্রকাশ করেনি।’ পঞ্চাশে বললেন, ‘আজ আমার জন্মদিনে তোমরা যে উৎসব করছ, তার মধ্যে যদি সেই কথাটি থাকে, তোমরা যদি আমাকে আপন করে পেয়ে থাক, আজ প্র ভাতে সেই পাওয়ার আনন্দকেই যদি তোমাদের প্রকাশ করার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তা হলেই এই উৎসব সার্থক। তোমাদের জীবনের সঙ্গে আমার জীবন যদি বিশেষভাবে মিলে থাকে, আমাদের পরস্পরের মধ্যে যদি কোনো গভীরতর সম্বন্ধ স্থাপিত হয়ে থাকে, তবেই যথার্থভাবে এই উৎসবের প্রয়োজন আছে, তার মূল্য আছে।’

কবি যেবার ৭৬ বছরে পা দিলেন, শান্তিনিকেতনে ২৫ বৈশাখ গরমের ছুটির মধ্যে পড়ে যাওয়ায় নববর্ষের দিনই তাঁর জন্মদিন পালন করা শুরু হল। পরে নববর্ষ এবং পঁচিশে— দু’দিনই। শ্রদ্ধায়, উপহারে যেমন কেটেছে তাঁর জন্মদিন, ‘শনিবারের চিঠি’র ‘শ্রীশ্রী ঠাকুরপূজা’-র মতো কার্টুনও কবিকে সইতে হয়েছে!

কবির ’৭১-এ সেনেট হলে ছাত্রছাত্রীরা জন্মোৎসবে বিশ্বভারতীকে একটি টাকার তোড়া দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। টাকা সংগ্রহের জন্য তাঁরা ‘জয়ন্তী কেতন’ বিক্রির ব্যবস্থা করে। এটি ছিল আদতে একটি সাদা কার্ড। যার বাঁ-পাশে কবির ছবি। এবং ডানদিকে কবির হাতে লেখায় ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়…।’ এই কার্ডই কবির হাতে ধরিয়ে কার্টুন ছেপেছিল ‘শনিবারের চিঠি।’ তাতে কবিকে পাল্কিতে বসিয়ে হাতে জয়ন্তী কেতন ধরানো হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘বিশ্বভারতী দিবস’, ‘শেষ পারানির কড়ি।’ সম্ভবত, সে বারই… ভানুদাদা তাঁর প্রিয় রাণুকে লিখেছিলেন, ‘এখানে জন্মোৎসবের একটা হাঙ্গামা আছে। ভালো লাগচেনা।’

পঁচিশের মিম ঘুরতে ঘুরতে একটু আগেই আমার সেলফোনেও ইনবক্স হল।

জুতসই রিপ্লাই দিতেই হল। সেও কবির কাছে ধার করা কথায়। ‘বহু জন্মদিনে গাঁথা আমার জীবনে/ দেখিলাম আপনারে বিচিত্র রুপের সমাবেশে।’

সূত্র : জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ, কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত

(আবীর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮১ সালে। ছেলেবেলা কেটেছে অজয়ের স্রোত ছোঁয়ানো বীরভূমের বেজড়া গ্রামে। স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে। সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। কাজ করেছেন অন্য সংবাদপত্রেও। পদ্য-গদ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘প্রতিদিন’, ‘উনিশ কুড়ি’, ‘সুখী গৃহকোণ’, ‘নতুন কৃত্তিবাস’-সহ নানা পত্র-পত্রিকায়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মুখ ঢাকো করতলে’, ২০১৬-তে গদ্যগ্রন্থ ’১৫ মেমারি লেন’। এ ২০১৬ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’ । ১০১৮-তে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘পৌষমেলা : স্মৃতির সফর’। এখন ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য তিনি। শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব নিখিল বইওয়ালা বুক ক্যাফে।)

 

 

 

Leave A Reply